❒ মিরপুরে শ্রমিক–পুলিশ সংঘর্ষ
ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রাজধানীর মিরপুরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে মিরপুর–১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেন আন্দোলনকারীরা। তিনটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দৌয়া হয়। এ ঘটনার তিন ঘণ্টা পর েখুলে দেওয়া হয় মেট্রো স্টেশন ও স্বাভাবিক হয় যান চলাচল। এদিকে পোশাকশ্রমিকদের চলমান বিক্ষোভে করণীয় নির্ধারণ করতে জরুরি বৈঠকে বসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অর্থ, স্বরাষ্ট্র ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ ৬-৭ জন মন্ত্রী ও উপদেষ্টা মাহদী আমিনের অংশগ্রহণে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
আজ রোববার বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত এই সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে এবং লাঠিপেটা করে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
সকাল আটটার দিকে কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা মিরপুর–১০ নম্বর মোড়ের সড়ক অবরোধ করেন। এতে ওই এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে পুলিশ তাঁদের সরাতে গেলে বেলা সোয়া ১১টার দিকে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। আধা ঘণ্টা উভয় পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরে যেতে বারবার অনুরোধ করে পুলিশ। একপর্যায়ে শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করেন। তখন পুলিশ লাঠিপেটা করে শ্রমিকদের ধাওয়া দেয়। এ সময় জলকামান থেকে পানি ছোড়া হয় এবং ব্যবহার করা হয় সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল। এতে শ্রমিকেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। পরে তাঁরা আবার সংগঠিত হয়ে বিভিন্ন দিক থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মিরপুর–১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এতে মেট্রোরেলের পানির লাইন পুড়ে যায়। স্টেশনের পূর্ব পাশের একটি গেট এখনো বন্ধ রয়েছে।
মেট্রোরেল স্টেশনের নিরাপত্তাকর্মী খালিদ হাসান বলেন, আন্দোলনকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের জেরে মিরপুর–১০, মিরপুর–১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশন দুপুর ১২টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়।
পল্লবী থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. হানিফ বলেন, বেলা একটার দিকে আন্দোলনকারীরা সড়ক ছেড়ে দেন। পরে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
এর আগে মিরপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলাম বলেন, মিরপুরের কয়েকটি স্থান থেকে পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা সকালে জড়ো হয়ে মিরপুর–১০ নম্বর মোড় অবরোধ করেন। এরপর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়।
একই দাবিতে গতকাল শনিবারও মিরপুরে সড়ক অবরোধ করেছিলেন পোশাকশ্রমিকেরা। সেদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত মিরপুর–১০, ১১ ও ১২ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় যান চলাচল বন্ধ ছিল।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী দুদিন আগেই প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিলেও শ্রমিক প্রতিনিধির নাম তৈরিতে বিলম্ব হওয়ায় প্রক্রিয়াটি কিছুটা ধীরগতির হয়।
এর আগে একই দিন দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে সরকারিভাবে পোশাকশ্রমিকদের জন্য একটি নতুন ‘মজুরি বোর্ড’ গঠনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। বোর্ডের চেয়ারম্যান শেখ আশফাকুর রহমানকে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধি এবং স্বাধীন সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরুর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, শ্রমিকদের মূল দাবি মেনে বোর্ড গঠন করা হয়েছে এবং শ্রমিকদের রাস্তা ছেড়ে অবিলম্বে কলকারখানায় ও নিজ নিজ কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও কয়েকটি কারখানায় অহেতুক ছুটি ঘোষণা এবং শ্রমিক উসকে দেওয়ার নেপথ্যে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র দেখছে সরকার। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শ্রমমন্ত্রী অভিযোগ করেন, বিশেষ একটি নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্র সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক শ্রমিক সেজে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে কয়েকটি রাজনৈতিক দল শ্রমিকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এছাড়াও রাজধানীতে পোশাকশ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনের আড়ালে নাশকতা ও ভাঙচুরে জড়িত থাকার অভিযোগে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ১১ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবির মিরপুর বিভাগের অভিযানে মিরপুর-১০ ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
রোববার (১ নভেম্বর) দুপুরে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন ডিবির মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান। তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকেরা আন্দোলন করছেন। তবে আন্দোলনের মধ্যে সহিংসতা, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সাধারণ শ্রমিকদের ব্যবহার করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা নাশকতার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে শ্রমিক লীগের একজন নেতা, আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য এবং যুবলীগের একজন কর্মী রয়েছেন। তারা হলেন মো. কামাল গাজী (৩২), মো. ওলিউল্লাহ অনিক (২০), আলিফ হোসেন ইমন (২৬), মো. নাহিদ হাসান (১৮), আরিফ আকন্দ (২৯), জায়েদ করিম রিয়াজ (২৪), মো. রমজান সরকার (১৮), মোয়াজ্জেম শাহরিয়া নিয়াজ, জুবায়েদ ইসলাম জিসান (২২) এবং মো. মাহিম মোল্লা (১৯)।
পুলিশের তথ্য বলছে, কামাল গাজী শ্রমিক লীগের সহসাধারণ সম্পাদক। শ্রমিক আন্দোলনে মিছিল ও ভাঙচুরের জন্য লোক সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ওলিউল্লাহ অনিককে আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য ও পিকেটার হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার অন্যদের মধ্যে রমজান সরকার যুবলীগের সক্রিয় কর্মী। বাকি ব্যক্তিদের আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বাড়ি পটুয়াখালী, কুষ্টিয়া, মুন্সীগঞ্জ, পঞ্চগড়, গাইবান্ধা, কক্সবাজার, পাবনা, সাভার ও মাদারীপুরে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তাদের বেশির ভাগই রাজধানীর মিরপুর, পল্লবী, রূপনগর, কাফরুল ও উত্তরা এলাকায় বসবাস করতেন।
এদিকে শ্রমিক আন্দোলনে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাদের অংশগ্রহণের বিষয়টিও সামনে এসেছে। তাদের একজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজবুল ইসলাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার প্রকাশিত বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিওতে তাকে শ্রমিক আন্দোলনে অংশ নিতে এবং বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা গেছে।
ডিবির মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান জানান, নাশকতার চেষ্টায় প্রায় শতাধিক নেতাকর্মী সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের অভিযান চলছে।