❒ বড় গল্প
মুনীর মুসান্না
হিজলডাঙ্গায় গুলশান আরা নামে কেউ নেই। অন্তত এই নামে তাকে কেউ চেনে না। ছোটবেলায় সে কথা বলতে পারত না বলে পাড়ার ছেলেমেয়েরা তার নাম দিয়েছিল গুঙি। সেই নামই একসময় তার আসল নামটাকে আড়াল করে দিয়েছে। এখন কেউ তাকে গুলশান আরা বলে ডাকলে সে হয়তো বুঝতেই পারবে না, তাকে ডাকা হচ্ছে।
অথচ কথা বলতে না পারলেও মেয়েটির চোখ দুটি সব সময় কথা বলে। ভ্রু কুঁচকে, ঠোঁট নেড়ে, হাতের আঙুলের ইশারায় কত কিছু যে মেয়েটি বোঝাতে চায়!
কাছের মানুষেরা তার ইশারা কিছুটা বোঝে, দূরের মানুষেরা বোঝার চেষ্টাও করে না। পরিচিত শব্দের বাইরে মানুষের ভাবের আদান-প্রদান সহজ নয়।
হিজলডাঙ্গার মানুষ তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে, কখনো মায়া দেখায়, কখনো বিরক্ত হয়। খুব কম মানুষই ভাবে, এই মেয়েটিও তাদের মতো সবকিছু দেখে, বোঝে আর অনুভব করে।
হিজলডাঙ্গায় গুলশান আরা একা নয়। একজন হাসান আলীও আছে। অবশ্য নিজের নামে এখন তাকে কেউ তেমন চেনে না; সবাই ডাকে হাচেন কালা। প্রায় কিছুই শুনতে পায় না সে। খুব কাছে গিয়ে জোরে চিৎকার করলে কখনো কখনো কিছুটা শুনতে পায়। মানুষ তাকে বোকা ভাবে। বাজারে কেউ পেছনে দাঁড়িয়ে তাকে নিয়ে ঠাট্টা করলে সে হয়তো বুঝতেই পারে না। কিন্তু দিনের পর দিন মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে অন্য এক ভাষা শিখেছে, রাগ, ভয়, লোভ আর মিথ্যে হাসির ভাষা। মুখে যে কথা বলা হয়, মানুষের মুখ সব সময় সে কথার সঙ্গে মেলে না; হাচেন কালা সেটা বুঝতে শিখেছে আপন বুদ্ধিতে।
আর এখানে আছে আর একজন, সে হচ্ছে খয়বার কানা। জন্ম থেকেই তার দু'চোখ অন্ধ। বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে, মেঠোপথ ধরে, নদীর ঘাট পেরিয়ে সে অনায়াসে চলাফেরা করে। কোন বাড়ির উঠানে গরু বাঁধা, কোন ঘাটে কখন নৌকা ভেড়ে, কোন পথে কারা যাতায়াত করে, শুনতে শুনতে এসব তার অজানা নয়। মানুষের পায়ের শব্দ, কণ্ঠস্বর আর চলাফেরার পরিচিত ছন্দ থেকে সে অনেক কিছু বুঝে নেয়। রাতের নদীতে কোন নৌকা মাছ নিয়ে আসে, আর কোন নৌকার আসা-যাওয়ায় অস্বাভাবিক নীরবতা, সেটুকুও তার কানে ধরা পড়ে। অথচ কোনো ঘটনার সাক্ষী দিতে গেলে তার কথা কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। চোখে দেখেনি যে, সে আবার কী দেখবে?

তিনজনের তিন রকম সীমাবদ্ধতা। অথচ গুলশান আরা, হাচেন কালা আর খয়বার, তিনজনই এমন কিছু বোঝে, যা হিজলডাঙ্গার চোখ-কানওয়ালা মানুষ বুঝতে চায় না। অভাবটা হয়তো তাদের শরীরে নয়, অভাবটা সত্য দেখার, শোনার আর স্বীকার করার সাহসে। তাই এই তিনজনের প্রত্যেকেই এমন কিছু বোঝে, যা হিজলডাঙ্গার অনেক চোখ-কানওয়ালা মানুষ বুঝতে চায় না।
হিজলডাঙ্গার বাজারে বজলু চেয়ারম্যানের লোকজনের আনাগোনা লেগেই থাকে। শীত এলে তিনি কম্বল বিলি করেন, বন্যায় ত্রাণ দেন, মসজিদে অনুদান পাঠান। কাজ না থাকলে সাহায্যের আশায় তার বাড়ির সামনে ভিড় জমে। অথচ বাজারের দোকানে দোকানে যে চাঁদা ওঠে, তার ভাগও যে পৌঁছায় তাঁর ঘরে!
সে খবর সবাই জানে, কিন্তু মুখ খোলে না কেউ। সবাই আরও জানে, এখানকার দাপুটে জয়নাল মেম্বার সালিশ করে আসলে বিবাদ মেটান না, জিইয়ে রাখেন।
এটা তার শয়তানি কৌশল। জমি নিয়ে দুই পক্ষের ঝগড়া বাধলে তিনি দুজনকেই আশ্বাস দেন। মামলা চলে, খরচ বাড়ে, তাঁর কাছে দুই পক্ষের যাতায়াতও বাড়ে। তখন মোক্ষম যুক্তির জোরে সমস্যা তিনি জিইয়ে রাখেন।
সাগর খন্দকারের নজর সরকারি খাসজমিতে, বিশ্বজিৎ ওঝার নজর সালিশের পাল্লা কোন দিকে ভারী হবে, সেদিকে। সদরুল চৌধুরী মানবাধিকারের ব্যানার নিয়ে ঘোরেন; ছবি তোলেন, বক্তৃতা দেন। জিল্লু আর কামরুলের কারবার নিয়ে বাজারে নানা কথা চালু আছে। তার কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা সবাই জানে। সবাই সবাইকে চেনে, তবু না-চেনার ভান করে। এতক্ষণ হিজলডাঙ্গার যাদের কথা বললাম, দিনের বেলা তাদের মধ্যে মতের প্রচুর অমিল দেখা যায়। কেউ কারও বিরুদ্ধে কথা বলেন, কেউ আবার প্রকাশ্যে মুখ দেখাদেখি বন্ধ রাখেন। কিন্তু রাতের বেলা বজলু চেয়ারম্যানের বৈঠকখানায় এরা একসঙ্গে বসেন। সেখানে মতের অমিল থাকে না। কে টাকা দেবে, কে লোক জোগাড় করবে, কে ভয় দেখাবে, আর কে মানুষের সামনে ভালো মানুষের মুখোশ পরে থাকবে, এ তল্লাটে সবই গোপনে পালাক্রমে ঠিক হয়ে যায়।
হিজলডাঙ্গার মানুষের চোখের সামনেই এভাবে একটা অদৃশ্য জাল বোনা হয়েছে। যে জালের সুতো দেখা যায় না, কিন্তু কেউ একবার সেখানে আটকে গেলে আর সহজে বেরিয়ে আসতে পারে না।
হিজলডাঙ্গায় চুরি, ডাকাতি নতুন কিছু নয়। কারও গোয়াল থেকে গরু উধাও হয়, কারও পুকুরের মাছ রাতারাতি তুলে নেওয়া হয়। বাজারের দোকানে চাঁদা না দিলে দোকানদারের ছেলেকে পথে আটকে হুমকি দেওয়া হয়। মেয়েদের কলেজে যাওয়া আসার পথেও ছেলেদের উৎপাত বাড়ে।
জমি নিয়ে বিরোধ বাধলে সালিশ বসে। সালিশ ব্যর্থ হলে শুরু হয় মামলা। মামলা বছরের পর বছর চলে। একসময় জমির চেয়ে মামলার খরচ বড় হয়ে দাঁড়ায়। কেউ জমি বিক্রি করে, কেউ টিকতে না পেরে ভিটেমাটি ছেড়ে শহরে চলে যায়। আরও কত ঘটনা এখানে নিত্যদিনে ঘটে।
সবার তো আর গন্ডারের মতো চামড়া থাকে না! যাদের থাকে, তারা মুখ বুজে সব সহ্য করতে শেখে।
এত কিছুর মধ্যেও হিজলডাঙ্গা একেবারে নির্জীব হয়ে যায়নি। কিছু মানুষ এখনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে চায়।
শফিক মাস্টার তাদের একজন। হিজলডাঙ্গা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক। ছাত্রদের শুধু বইয়ের পাঠ পড়ান না, তিনি মানুষ হওয়ার পাঠও দিতে চান। তাঁর বন্ধু আবু তাহের বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। নাসিরুদ্দিন কলেজের শিক্ষক, শরীফ সাহেব শিক্ষিত ও সমাজে সম্মানিত মানুষ। মুফতি জমিরউদ্দীন স্থানীয় মসজিদের ইমাম, আব্বাস হুজুর স্থানীয় একটি মাদ্রাসার প্রধান। এসব সমাজের বিবেক বলে পরিচিত মানুষগুলো একদিন বিকেলে শফিক মাস্টারের বাড়িতে তাদের বৈঠক বসে। চায়ের কাপের উষ্ণতার পাশে এলাকার নানা ঘটনার কথা উঠল। গরু চুরি, দোকানে চাঁদাবাজি, জমি দখল, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, সবকিছু নিয়েই ক্ষোভ জমে আছে সবার মনে। কথা বলার সুযোগ পেয়ে একে একে সবাই তা তুলে ধরল।
শফিক মাস্টার বললেন, এভাবে আর কত দিন চলবে? আমরা সবাই আলাদা আলাদা করে ক্ষোভ প্রকাশ করি। কিন্তু অন্যায় ঠেকাতে একসঙ্গে দাঁড়াই না।
আবু তাহের মাথা নাড়লেন, কথা তো ঠিক।
তবে শুধু কথা বললে হবে না, মাস্টার। একটা উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।
ব্যবস্থাটা কী? শফিক মাস্টার জানতে চাইলেন।
চেয়ারম্যান, মেম্বার নির্বাচনে সৎ লোক দাঁড় করাতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে, এদের মাধ্যমে সমাজ বদলানো সম্ভব। কথাটা শুনে ঘরে যেন নতুন হাওয়া লাগল। সবাই একমত হলেন, অন্তত মুখে। কিন্তু প্রার্থী বাছাইয়ের প্রশ্ন উঠতেই সেই হাওয়া হঠাৎ থেমে গেল।
আবু তাহের বললেন, আমি নির্বাচনের খরচে সাহায্য করতে রাজি আছি। কিন্তু চেয়ারম্যানের দায়িত্ব অন্য কাউকে নিতে হবে।
শফিক মাস্টার তাঁর দিকে তাকালেন।
অন্য কেউটা কে?
আবু তাহের চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। কোনো উত্তর দিলেন না। নাসিরুদ্দিন বললেন, আমাকে বলবেন না। কলেজের চাকরিটা নিয়ে ঝামেলা হোক, সেটা চাই না।
শরীফ সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, যোগ্য লোককে বাদ দিয়ে শুধু সৎ হলেই তো হবে না।
যোগ্য লোকটা কে, শরীফ সাহেব? শফিক মাস্টার জানতে চাইলেন। সেটা সকলে মিলে আলোচনা করে ঠিক করতে হবে।
আমরা এভাবে আর কত দিন আলোচনা করব? মনোনয়ন জমা দেওয়ার আর ক'দিন বাকি?
মুফতি জমিরউদ্দীন ধীর গলায় বললেন, আমরা একজনের নামে একমত হতে পারছি না, অথচ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবাই একমত!
আব্বাস হুজুরও বিভিন্ন শর্তের কথা তুললেন। তাঁর মতে, প্রার্থী ঠিক করার আগে স্থানীয় আলেম-ওলামাদের সঙ্গে বিশেষ আলোচনা করা দরকার।

আলোচনা চলতে থাকে। একজনের প্রস্তাবে আরেকজন আপত্তি তুললেন। কে কতটা গ্রহণযোগ্য, কার সামাজিক মর্যাদা বেশি, কার ব্যবসার ক্ষতি হতে পারে, কার চাকরিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে, সব হিসাব সামনে চলে এল। শেষ পর্যন্ত সেদিন কোনো সিদ্ধান্ত হলো না। বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে। তাঁর মনে হলো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আগে তাঁরা নিজেদের স্বার্থের দেয়ালটাই ভাঙতে পারলেন না!
বৈঠক শেষে বের হতে গিয়ে একজন আক্ষেপ নিয়ে বললেন, আমরা আর কী করতে পারতাম, মাস্টার?
শফিক মাস্টার মুখ তুলে তাকালেন।
আমরা কী করতে পারতাম, সেটাই তো ঠিক করতে পারিনি।
এভাবে কোনো সমাধানের মুখ দেখলো না সেই বৈঠকের আলোচনায়।
অথচ সেদিন বজলু চেয়ারম্যানের বাড়ির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় লাগল না। বৈঠকখানায় বসে বজলু চেয়ারম্যান বললেন, এবারও আমি দাঁড়াব।
কী বলেন আপনারা?
জয়নাল মেম্বার হেসে বললেন, আপনি দাঁড়াবেন, না জিতবেন?
জেতার ব্যবস্থা তোমরা করবে।
কামরুল বলল, টাকার চিন্তা করবেন না।
জিল্লু চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল, আর কেউ বেশি কথা বললে?
বজলু চেয়ারম্যান পান চিবোতে চিবোতে বললেন, ভোটের আগে সবাইকে কথা বলতে দাও। ভোটের দিন কে কোথায় দাঁড়াবে, সেটা তোমরা বুঝিয়ে দেবে।
সাগর খন্দকার হিসাবের খাতা খুলে বসলেন। কোন ওয়ার্ডে কার প্রভাব, কোথায় কত টাকা খরচ করতে হবে, কার সঙ্গে কথা বলা দরকার, সব হিসাব হতে লাগল।
সদরুল চৌধুরী বললেন, মানুষের কাছে কিন্তু ভালো বার্তা দিতে হবে। উন্নয়ন, অধিকার, শান্তি, এই কথাগুলো সামনে রাখতে হবে।
বিশ্বজিৎ ওঝা মৃদু হেসে বললেন, মানুষ যা শুনতে চায়, তা-ই বলবেন। মানুষ যা ভুলে যায়, সেটা মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই!
পুরনো এক ইঙ্গিত বুঝতে পেরে ঘরের মধ্যে হাসির শব্দ উঠল। হিজলডাঙ্গার ভালো মানুষগুলো যেখানে একজন প্রার্থী বাছাই করতে পারলেন না, সেখানে অন্যায়ের কারবারিরা নিজেদের ভাগ-বাঁটোয়ারা ঠিক করে ফেললেন এক বৈঠকেই!
হেমন্তের শুরু হয়েছে। হিজলডাঙ্গা জুড়ে কিছু দিনের মধ্যে ফসলের উৎসবও শুরু হবে। প্রতি বছরের মতো পাড়ায় পাড়ায় খেলার পাল্লা চলার কথা। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে শফিক মাস্টার স্কুলে ছাত্রদের আচরণে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ করছিলেন। কয়েকজন ক্লাসে ঝিমিয়ে থাকে, চোখ লাল হয়ে থাকে। পড়া জিজ্ঞেস করলে মাথা নিচু করে। আগে যারা খেলাধুলা করত, তাদের কেউ কেউ এখন স্কুল ছুটির পর নদীর ঘাটের দিকে চলে যায়।
একদিন ক্লাস শেষে তিনি এক ছাত্রকে আলাদা করে কাছে ডাকলেন।
কী হয়েছে তোর?
কয়েক দিন ধরে পড়ায় মনোযোগ নেই কেন?
ছেলেটি প্রথমে কিছু বলতে চাইল না। পরে অনেক চাপাচাপির পর নিচু গলায় বলল, স্যার, নদীর দিক থেকে কিছু প্যাকেট নিয়ে যেতে বলে। নিয়ে গেলে টাকা দেয়।
শফিক মাস্টার চমকে উঠলেন।
কীসের প্যাকেট?
জানি না, স্যার। খুলে দেখতে নিষেধ করে। নৌকায় করে আনে। মাছের ঝুড়ির মতো ঝুড়িতে প্যাকেটের মধ্যে থাকে।
কে এসব দেয়?
ছেলেটি চারপাশে তাকাল।
নাম বললে আমার বড় বিপদ হবে, স্যার।
শফিক মাস্টার আর চাপ দিলেন না। তিনি ছেলেটিকে সেদিন বুঝিয়ে বাড়ি পাঠালেন। কিন্তু সেদিন থেকে নদীর ঘাট তাঁর চোখে অন্য রকম হয়ে উঠল। রাতের দিকে কয়েকটি নৌকা মাছ নিয়ে বাজারে আসে। অন্য দিনের তুলনায় মাছের দামও কম থাকে। কিন্তু মাছের আড়ালে আর কী আসে, তা নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলে না।
সবাই জানে, এই নৌকাগুলোর ব্যবসা লাভজনক। কিন্তু মাছের আড়ালে আর কী আসে, তা নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলে না। ঝিমুনি কমিটির সুবিধাভোগী হলে লাভের অংশ পেতে বেগ পেতে হয় না। সেজন্য এই নেটওয়ার্কে কারা কারা যুক্ত, তা খুঁজে বের করা সহজ নয়।
নদীপথে মাদকের কারবার চলে বলে গুঞ্জন আছে। যে প্যাকেট আসে, হাতবদল হয়, তারপর আশপাশের গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। কার পেছনে কার হাত, তা সবাই কমবেশি জানে। কেউ মুখ খোলে না।
একদিন খয়বার কানা এসব নিয়ে কথা বলেছিল।
বাজারের এক পাশে বসে সে শফিক মাস্টারকে বলেছিল, মাস্টার, রাতের নৌকাগুলোর শব্দ আমি চিনি। সব নৌকা মাছ নিয়ে আসে না। এসব জেলেনৌকায় মাছ আনা বাহানা মাত্র।
তুমি কীভাবে বুঝলে?
মাছের নৌকা ঘাটে ভেড়ার সময় লোকজনের হাঁকডাক থাকে। কিছু নৌকা আসে একেবারে চুপচাপ। লোকজন নামে, মাল নামায়, আবার চলে যায়। সেই শব্দ আমি অনেক রাতে শুনেছি। কিছু ফিসফাস ভালো কোনো লক্ষ্মণ মনে হয় না।
তাতে কী বুঝলি?
সব নৌকায় শুধু মাছ আসে না, মাস্টার। মাছের নৌকা হলে লোকজন লুকিয়ে মাল নামাবে কেন?
কাউকে বলেছিস?
খয়বার একটু অন্যভাবে হাসল। চোখ দুটো বুজে থাকে তার, তাই সে হাসি দিলে সবার দৃষ্টিতে ধরা পড়ে।
বললে কী হবে?
আমি তো কানা। আমি নাকি কিছুই দেখি না।
সবাই ধরেই নিয়েছে আমি কিছু দেখতে পারবো না।
মানুষের চোখে ফাঁকি দিয়ে গভীর রাতে কেন চুপচাপ এই তামাশা চলবে?
কাউকে বলেছ?
খয়বার একটু হাসল। বললে কী হবে শুনি?
আমি তো কানা। আমি কিছুই দেখি না। কিন্তু বুঝতেও কী পারবো না?
শফিক মাস্টারের বুকের মধ্যে কেমন একটা চাপ অনুভব হল। খয়বার চোখে দেখে না, কিন্তু রাতের অন্ধকারে অনেকের অদেখা কাজের শব্দ সে শুনতে পায়। অথচ এখানে হিজলডাঙ্গায় তার সাক্ষ্যের কোনো দাম নেই!

এদিকে নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে এল, হিজলডাঙ্গায় উত্তেজনা তত বেড়ে চলল। বজলু চেয়ারম্যানের লোকজন বাড়ি বাড়ি গেল। কেউ উন্নয়নের কথা বলল, কেউ সাহায্যের আশ্বাস দিল। আবার কোথাও কোথাও ভোট নিয়ে কথা বলতে গেলে চোখ রাঙানো হলো। যেখানে যেমন দরকার, তারা করতে পিছপা হল না।
শফিক মাস্টার কয়েকজন ভালো মানুষকে নিয়ে আবার বসার চেষ্টা করলেন। কিন্তু প্রার্থী ঠিক করার মতো সময় আর হাতে নেই। যে যার ব্যস্ততায় ছড়িয়ে পড়েছেন।
কেউ বলছেন, এবার না হোক, পরেরবার দেখা যাবে।
কেউ বলছেন, পরিস্থিতি বুঝে চলতে হবে।
শফিক মাস্টার বুঝলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস তাঁদের আছে; কিন্তু সেই কথার দায় নেওয়ার সাহস সবার নেই।
নির্বাচনের আগের সন্ধ্যায় গুলশান আরা বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিল। রাস্তার পাশে একটি ভ্যান দাঁড়ানো। দুজন লোক ভ্যান থেকে ভারী একটা বস্তা নামিয়ে মোটরসাইকেলে তুলছে। একজনকে সে চেনে, বজলু চেয়ারম্যানের সঙ্গে প্রায়ই দেখা যায়। অন্যজনকে কয়েকবার নদীর ঘাটের আশপাশে দেখেছে।
গুলশান আরা থমকে দাঁড়াল।
এই বস্তায় কী?
ইশারায় জিজ্ঞাসা করলো।
ওরা বুঝে গেল সে কথা বলতে পারে না।
লোক দুটি অন্য কথা বলে সময় পার করতে চাইলো।
গুলশান আরা বস্তায় হাত দিতে চাইলে তারা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
তারপর চারপাশে তাকিয়ে দ্রুত মোটরসাইকেলে উঠে চলে গেল। বাড়ি ফিরে সে অস্থির হয়ে উঠল। হাত নেড়ে, চোখ বড় বড় করে, নানা ভঙ্গিতে কথাটা বোঝানোর চেষ্টা করল। তার মা কিছুই বুঝতে পারলেন না।
বিরক্ত হয়ে বললেন, কী হয়েছে তোর?
এমন করছিস কেন?
গুলশান আরা ছুটে বেরিয়ে গেল হাচেন কালার বাড়ির কাছে। হাচেন কালা তার হাতের নড়াচড়া, মুখের অভিব্যক্তি মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করল। বারবার প্রশ্ন করে বুঝতে চেষ্টা করল। গুলশান আরা পরিচিত লোকটির নাম বলতে পারল না, কিন্তু লোকটা যে চেয়ারম্যানের লোক তা ইশারায় বোঝাল। নদীর দিকের লোকটির কথা বোঝাতে গিয়ে দুই হাত দিয়ে নৌকা চালানোর ভঙ্গিও অভিনয় করল।
হাচেন কালার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।
শফিক মাস্টারকে খবর দে, সে বলল।
গুলশান আরা তার কথা বুঝেছে কি না, বোঝা গেল না।
হাচেন কালা বলল, চল তবে আগে মাস্টারের কাছে যাই।
তবে কিছুক্ষণ পরই সে শফিক মাস্টারের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলো।
শফিক মাস্টার তার ইশারা বোঝার চেষ্টা করলেন। শেষে খয়বারও এসে যোগ দিল। দু'জনের কাছ থেকে যতটা সম্ভব বুঝে নিয়ে তিনি চিন্তায় পড়ে গেলেন।
তুই নিশ্চিত, নৌকাগুলো একই কারবারের? শফিক মাস্টার জিজ্ঞেস করলেন।
নিশ্চিত হলে তোমাকে বলতাম না, মাস্টার।
বলতাম, গিয়ে ধরো।
তাহলে?
সন্দেহ আছে।
খোঁজ নেওয়ারও তো দরকার আছে।
বস্তার মধ্যে কী ছিল, তা তো কেউ জানে না, তিনি বললেন।
খয়বার বলল, আমি নদীর ঘাটে পূর্বেও নৌকার শব্দ শুনেছি। গুলশান ওই দুজনকে দেখেছে। দুটো কথা মিলিয়ে দেখার দরকার।
দরকার তো আছেই, শফিক মাস্টার বললেন।
কিন্তু এখন কী করা যায়?

তিনি পরিচিত কয়েকজনকে খবর দিলেন। আবু তাহের এলেন, নাসিরুদ্দিনও এলেন। বিষয়টি শুনে সবাই গম্ভীর হলেন বটে, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসতে চাইলেন না।
আবু তাহের বললেন, এখন এসব নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করা ঠিক হবে না। নির্বাচনের আগে ঝামেলা হলে আমাদেরই ক্ষতি হবে।
নাসিরুদ্দিন বললেন, প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করা যাবে না। কথাটা বাইরে গেলে উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে।
শরীফ সাহেব বললেন, আগে নিশ্চিত হতে হবে। শুধু ইশারায় তো আর বিচার হয় না।
শফিক মাস্টার খয়বারের দিকে তাকালেন। খয়বার মাথা নিচু করে বসে আছে। গুলশান আরা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সে কথা বলতে পারে না, তাই তার কথার পক্ষে যুক্তি সাজিয়ে দেওয়ারও কেউ নেই।
শফিক মাস্টার বললেন, আমরা যদি কিছুই না করি, তাহলে নিশ্চিত হব কী করে?
কেউ উত্তর দিলেন না।
শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো, নির্বাচনের আগে আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। যাই হোক পরে দেখা যাবে।
গুলশান আরা সবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে এমন একটা প্রশ্ন ছিল, যার উত্তর দেওয়ার সাহস ঘরের কারও হলো না।
নির্বাচনের দিন সকাল থেকেই হিজলডাঙ্গার কেন্দ্রগুলোতে লোকজনের ভিড় জমল। কোথাও ভোটারদের সারি, কোথাও মোটরসাইকেলের আনাগোনা। বজলু চেয়ারম্যানের লোকজন কেন্দ্রের আশপাশে ঘুরছে। কেউ ভোট দিতে এসে ফিরে যাচ্ছে, কেউ ভয় পেয়ে মুখ বন্ধ রাখছে।
গুলশান আরা ও শফিক মাস্টার কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলেন। কয়েকবার প্রতিবাদ করতে গিয়েও থেমে গেলেন। শুধু একজনকে নিয়ে কতটা প্রতিবাদ করা যায়? যাদের নিয়ে তিনি দাঁড়াতে চেয়েছিলেন, তাদের কাউকেই পাশে পেলেন না।
গুলশান আরা ইশারায় প্রতিবাদ জানাতে চাইল। শফিক মাস্টারও কয়েকবার মুখ খুলতে গিয়েও থেমে গেলেন।
যাঁরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা বলেছিলেন, তাঁরা আজ কোথায় গেল?
দুপুরের রোদে কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে শফিক মাস্টার বুঝলেন, বৈঠকের ঘরে প্রতিবাদ করা আর মানুষের সামনে দাঁড়ানো এক কথা নয়।
বিকেলে ভোট শেষ হলো।
সন্ধ্যার পর ফলাফল আসতে শুরু করল। বজলু চেয়ারম্যান বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। তাঁর সমর্থিত অধিকাংশ মেম্বারও জিতেছেন।
বাজারে মিষ্টি বিলি হলো, মাইক বাজল। চেয়ারম্যানের বাড়িতে লোকজনের ভিড় জমল।
শফিক মাস্টার স্কুলঘরের এক পাশে বসে ফলাফলের কাগজ দেখছিলেন। আবু তাহের এসে পাশে বসলেন।
মানুষকেই তো ভোট দিতে হয়েছে, মাস্টার।
আমরা আর কী করতে পারতাম?
শফিক মাস্টার মুখ তুলে তাকালেন।
আমরা কী করতে পারতাম, সেটাই তো ঠিক করতে পারিনি।
আবু তাহের আর কথা বললেন না।
শফিক মাস্টার কাগজটা ভাঁজ করে রাখলেন। তাঁর মনে হলো, হিজলডাঙ্গায় শুধু একটা নির্বাচন শেষ হয়নি; মানুষের সামনে দাঁড়ানোর একটা সুযোগও শেষ হয়ে গেছে।
সেদিন রাতেই গুলশান আরা আর হাচেন কালা খয়বারের বাড়িতে গেল। খয়বার একা উঠানে বসেছিল। দূরে নদীর দিক থেকে নৌকার ইঞ্জিনের শব্দ ভেসে আসছিল।
গুলশান আরা তার সামনে বসে হাত নেড়ে কিছু বোঝাতে চাইল। খয়বার তার মুখের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে রইলো। হাচেন কালাও কাছে এসে বসল।
এবার তাহলে হিজলডাঙ্গা হারল, খয়বার বলল।
গুলশান আরা মাথা নিচু করল। তারপর নিজের ঠোঁটে আঙুল রাখল, দুই কানে হাত দিল, শেষে দুই চোখ ঢেকে ফেলল।
খয়বার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, তুই বলতে পারিস না, তাই তোর কথা কেউ শোনে না। হাচেন শুনতে পায় না, তাই ওর সামনে যা খুশি বলে। আমি দেখতে পাই না, তাই আমার সাক্ষ্য কেউ নেয় না। বলতে গিয়ে হাঁপিয়ে
সে একটু থামল।
কিন্তু যারা কথা বলতে পারে, তারা সত্য বলে না। যারা শুনতে পায়, তারা সত্য শুনতে চায় না। যারা চোখে দেখে, তারা অন্যায় দেখেও চোখ ফিরিয়ে নেয়।
অন্ধ আমরা তিনজন, না গোটা হিজলডাঙ্গা?
হাচেন কালা কথাটা পুরো শুনতে পেল কি না, বোঝা গেল না। কিন্তু সে খয়বারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
গুলশান আরার চোখ যেন ভিজে উঠল।
পরদিন সকালে গফুর আলীর গোয়াল থেকে আরেকটি গরু চুরি গেল।
গফুর ছুটে গেল জয়নাল মেম্বারের কাছে। আগেরবারও গরু হারিয়ে থানায় গিয়ে কোনো ফল পায়নি। এবার সে ভেবেছিল, নির্বাচনের পর অন্তত চেয়ারম্যান, মেম্বারদের কাছে বিচার চাইতে পারবে।
জয়নাল মেম্বার চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, থানায় গেছিস?
গেছি, মেম্বার সাব। কোনো খবর পেলাম না।
খবর পাবি কী করে?
চোর কি আর নিজের নাম ঠিকানা লিখে রেখে যায়?
গফুর চুপ করে রইল।
মেম্বার একটু ঝুঁকে বললেন, একটা কথা বলি, মামলা করে লাভ নেই।
তোর গরু কী ফিরবে?
উল্টো খরচ বাড়বে।
তাহলে বিচার পাব না?
জয়নাল মেম্বার কাপটা নামিয়ে রাখলেন।
বিচার চাইলে খরচ করতে হয়, গফুর। আর সব কথা সবার সামনে বলতে নেই।
গফুর মাথা নিচু করে বেরিয়ে এল। বাজারের মোড়ে বজলু চেয়ারম্যানের এক লোক তাকে থামাল।
চেয়ারম্যান সাবের কাছে যা। তিনি সব ব্যবস্থা করে দেবেন।
গফুরের মুখে আশার ছায়া ফুটতেই লোকটি তার কাছে এগিয়ে এল। গলা নামিয়ে বলল, তবে বেশি কথা বলিস না। গরু চুরি গেছে, গেছে। সব জায়গায় নাক গলালে নিজের বিপদ হবে। গফুর জানে, গরু চোরাই নেটওয়ার্কের লোক সে। দু'বার ধরাও পড়েছে।
গফুর আর কোনো কথা বলল না। যে লোকটি সন্দেহের তালিকায় আছে, সে জয়নালের লোক। বসে আছে জয়নালের পাশে। কিছু মানুষ মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে।
শফিক মাস্টার বললেন, লোকটা তো সব অস্বীকার করছে।
হাচেন কালা তাঁর হাত চেপে ধরে লোকটির দিকে ইশারা করল। তারপর নিজের বুকের ওপর হাত রেখে মাথা নাড়ল।
শফিক মাস্টার তার মুখের দিকে তাকালেন।
কী হয়েছে?
ওর কথা বিশ্বাস করিস না?
হাচেন কালা লোকটির দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটি তখন অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে কথা বলছিল। হাচেন নিজের কাঁধ গুটিয়ে নিল, যেন কেউ অস্বস্তি বা ভয় লুকোতে চাইছে।
শফিক মাস্টার বুঝলেন, লোকটির আচরণে হাচেন কিছু একটা অস্বাভাবিকতা লক্ষ করেছে। কিন্তু শুধু সেই অস্বস্তি দিয়ে কাউকে অপরাধী বলা যায় না।
বাজারের এক পাশে দাঁড়িয়ে গুলশান আরা ঘটনাটা দেখছিল। সে আবারও ছুটে গেল শফিক মাস্টারের কাছে। হাত নেড়ে, চোখের ইশারায় যতটা পারে সব বোঝাল।
শফিক মাস্টার এবার আর তাকে থামালেন না। মন দিয়ে তার ইশারা বুঝতে চেষ্টা করলেন। তারপর বললেন, তুই ভয় পাস না। আমি আছি। আগে পরামর্শ করতে দে।
গুলশান আরা তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
এই কথাটা সে আগেও অনেকের মুখে শুনেছে। কেউ বিপদে পাশে থাকার কথা বলে, তারপর সরে যায়। কেউ সাহায্যের আশ্বাস দেয়, তারপর নিজের দরজা বন্ধ করে দেয়।
শফিক মাস্টারের কথায় তার চোখে কৃতজ্ঞতার চেয়ে সংশয়ই যেন বেশি ফুটে উঠল।
শফিক মাস্টার সেটা লক্ষ করলেন। কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে শফিক মাস্টার টেবিলের ওপর একটা ভাঁজ করা কাগজ পেলেন। কে রেখে গেছে, কেউ জানে না। কাগজ খুলে দেখলেন, লেখা, মাস্টার, নিজের কাজ করেন। অন্যের ব্যাপারে নাক গলাবেন না। ভালো হবে না। কাগজে হিজিবিজি করে বিপদ সংকেত আঁকা আছে।
লেখাটা পড়ার পর অনেকক্ষণ তিনি চুপ করে বসে রইলেন।
বাইরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। ঘরের মধ্যে বাতি জ্বলছে। টেবিলের ওপর খোলা খাতা, ছাত্রদের পরীক্ষার উত্তরপত্র, পাশে চায়ের কাপ। প্রতিদিনের পরিচিত জিনিসগুলো আজ কেমন অপরিচিত লাগছে।
তিনি ভাবলেন, কালই কি থানায় যাবেন?
নাকি আগে প্রমাণ জোগাড় করবেন?
কার সঙ্গে কথা বলবেন?
যাদের ওপর ভরসা করেছিলেন, তারা তো নির্বাচনের আগেই পিছিয়ে গেছেন। এখন যদি তিনি একা এগিয়ে যান, বিপদটা শুধু তাঁর নিজের হবে না। পরিবার আছে, স্কুল আছে, ছাত্রছাত্রী আছে। নিজেকে বোঝালেন, সাবধানে চলতে হবে। প্রমাণ ছাড়া কিছু করা যাবে না। একা ঝাঁপিয়ে পড়লে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হতে পারে। যুক্তিগুলো মন্দ নয়। তবু কোথায় যেন একটা অস্বস্তি থেকে গেল।
রাত গভীর হলো। নদীর দিক থেকে আবার নৌকার ইঞ্জিনের শব্দ ভেসে এল। শফিক মাস্টার জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না। শুধু শব্দটা ধীরে ধীরে কাছে আসে, তারপর দূরে সরে যায়।
পরদিন সকালে বাজার খুলল। দোকানে দোকানে চা তৈরি হলো। মাছের ঝুড়ি নামল। লোকজন আগের মতোই কেনাকাটা করল। চায়ের দোকানে বসে কেউ বলল, দেশটার কিছু হবে না। সব চোরে ভরে গেছে। আরেকজন বলল, ভালো মানুষেরা কিছু করতে চায় না। শুধু মুখে বড় বড় কথার খই ফোঁটায়!
তারপর সবাই অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল।
শফিক মাস্টার স্কুলে যাওয়ার পথে কথাগুলো শুনলেন। কিছু বললেন না। পকেটে হাত দিয়ে দেখলেন, হুমকির কাগজটা এখনো আছে। ভাঁজ খুলে আবার পড়লেন। তারপর কাগজটা পকেটে রেখে স্কুলের দিকে হাঁটলেন।
সেদিন বিকেলে গুলশান আরা স্কুলের সামনে এসে দাঁড়াল। শফিক মাস্টার তখন ছাত্রদের ছুটি দিয়ে বেরোচ্ছেন। গুলশান আরা তাঁর সামনে এসে থামল।

সে কিছু বলল না। শুধু একবার নিজের ঠোঁটে আঙুল রাখল, তারপর হাত রাখল কানের ওপর, শেষে চোখ দুটো ঢেকে ফেলল।
শফিক মাস্টার তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। বেত্রাবতী নদীর দিক থেকে জেলেদের নৌকার ইঞ্জিনের শব্দ আসছিল। বাজারের দিকে মানুষ হাঁটছিল, দোকানে দোকানে বেচাকেনা চলছিল। সবকিছু আগের মতোই আছে।
গুলশান আরা ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে নিল। তার চোখে সেই একই প্রশ্ন, এবারও কি কেউ কিছু বলবে না?
শফিক মাস্টার পকেটের ভেতর হাত রাখলেন। আঙুলে কাগজটার ভাঁজ অনুভব করলেন। তিনি জানতেন, কী করা উচিত। অন্তত এত দিন ধরে ছাত্রদের সেটাই শিখিয়ে এসেছেন।
কিন্তু জানার সঙ্গে করার যে দূরত্ব, আজ সেই দূরত্বটাই তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
তিনি গুলশান আরাকে কিছু বলতে চাইলেন। বলতে চাইলেন, শোন ভয় পাস না, আমি আছি।
কিন্তু কথাটা মুখে আনার আগে তাঁর মনে পড়ল নিজের ঘরের সেই হুমকির চিঠি, মনে পড়ল পাশে দাঁড়ানোর কথা দিয়েও সরে যাওয়া মানুষগুলোর মুখ।
শেষ পর্যন্ত তিনি শুধু বললেন, বাড়ি যা।
তাঁর মনে হলো, মেয়েটি যেন এবারও কোনো কথা না বলেই এমন কিছু বলে গেল, যার উত্তর তাঁর কাছে নেই।
ধীরে ধীরে রাত নামল হিজলডাঙ্গায়। নদীর বুকে আবার নৌকার ইঞ্জিনের শব্দ ভেসে এল। কেউ জানালা বন্ধ করল, কেউ ঘুমের ভান করল। কেউ হয়তো শব্দটা শুনল, কিন্তু না-শোনার ভান করল।
সবাই জানে, পরদিন সকালে বাজার আবার খুলবে। চায়ের দোকানে আবারও কেউ বলবে, দেশটার কিছু হবে না, সমাজ রসাতলে যাচ্ছে। তারপর সবাই নিজের কাজে ফিরে যাবে।
গুলশান আরা কিছুক্ষণ শফিক মাস্টারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে হাঁটতে শুরু করল।
শফিক মাস্টার দাঁড়িয়ে রইলেন। নদীর দিক থেকে নৌকার ইঞ্জিনের শব্দ ভেসে আসছিল। পকেটের ভেতর হুমকির চিঠিটা আঙুলের নিচে কুঁচকে উঠল।
তিনি জানতেন, কী করা উচিত। এত দিন ছাত্রদের সেটাই শিখিয়েছেন। অথচ আজ নিজের শেখানো কথার সামনে দাঁড়ানোর সাহস পাচ্ছেন না।
হিজলডাঙ্গায় গুলশান আরা নামে কেউ নেই। হাসান আলী নামেও কাউকে প্রায় কেউ চেনে না। খয়বার কানার সাক্ষ্যও কেউ নিতে চায় না।
তারা তিনজনই দেখে, শোনে, বোঝে। অথচ যাদের চোখ আছে, কান আছে, মুখে কথা আছে, তারাই সত্যকে এড়িয়ে চলে।
হিজলডাঙ্গার অন্য চোখ আছে।
শুধু সেই চোখের দিকে তাকানোর সাহস নেই কারও।