মো. খায়রুল আবেদীন
মনুষ্যত্ব ও পশুত্ব পরস্পর বিপরীতমুখী, পশুত্ব আক্রমণাত্মক যা বিবেককে লক্ষ্যবস্তু করে। এটি কোনো মানবিক দুর্বলতা নয় এটি মানুষের অজ্ঞতা, নির্বুদ্ধিতা ও অসতর্কতাকে কাজে লাগিয়ে বিস্তার লাভ করে।
জ্ঞানই পশু ও মানুষকে বিভাজন করেছে। মানুষ প্রকৃতি প্রদত্ত জ্ঞানের সাথে সাথে প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করতে পারে। এক্ষেত্রে ধর্মীয় জ্ঞান একটি অপরিহার্য বিষয়। ধর্মীয় জ্ঞান মানুষকে সততা, মনুষ্যত্ববোধ ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। ধর্মীয় অনুশাসন মানুষকে ন্যায় পরায়ণতা ও শিষ্টাচারের ভিত্তি স্থাপন করে। কাজেই সে হয়ে ওঠে বিনয়ী।
একজন মানুষ যতই বিনয়ী হয় ততই তার বিবেক যাগ্রত হয়। আর জাগ্রত বিবেক মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা পশুত্বকে দমন করে। ছোটদের প্রতি স্নেহ, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলমানুষের যথাযথ সম্মান প্রাপ্তি সহজ হয়ে ওঠে। অনৈতিক কাজকে সে ঘৃণা করতে শেখে। বারো বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত মানবিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধে গড়ে তোলার যথার্থ সময়। কাজেই সন্তানের বয়স বারো অতিক্রম করার আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।
২.
বর্তমানে যারা চল্লিশ পার করেছেন তাদের অধিকাংশকেই দেখবেন ছোট বেলায় তারা মক্তবে গিয়ে কোরআন শিক্ষা করেছেন। সাথে সাথে বড়দের সম্মান করা, সত্য কথা বলা, কারো অনুমতি ছাড়া ফল ছিড়ে না খাওয়া ইত্যকার নৈতিকশিক্ষা পেয়েছেন। প্রয়োজনীয় দোয়া, দুরুদ শিক্ষা করেছেন। অতঃপর তারা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশুনা করেছেন। সেই নৈতিকশিক্ষা কর্মজীবনে তাদের সততা ও ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে।
বর্তমানে একটি শিশু মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় পিতামাতা স্বপ্নদেখে ছেলে মেয়ে বড় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবে। কিন্তু তাকে যে মানুষ হতে হবে তা বেমালুম ভুলে যায়। সন্তানকে শিশুকালেই জাগতিক শিক্ষার কষাঘাতে ক্ষতবিক্ষত করা হয়। তাকে টার্গেট দেওয়া হয় তোমাকে প্রথম হতে হবে। উচ্চ শিক্ষায় চান্স পেতে হবে। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাটা তখন সময়ের অপচয় মনে করা হয়। শিশু বড় হতে থাকে কিন্তু সামাজিক ও ধর্মীয় জীবন তার কাছে থাকে সম্পূর্ণ অপরিচিত।
৩.
উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েরা আগে পাড়া মহল্লার মুরব্বীদের নিকট থেকে চলাফেরা, ওঠা বসা ও বড়দের সম্মান করা শিখত। মুরব্বীরা কোন ক্রুটি দেখলে হরহামেষা শাসন করতেন। বর্তমানে সেটি সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। কেননা শাসন করতে গেলে বিপথগামী ছেলেটির মা-বাবা এসে সন্তানের পক্ষ নিয়ে ঝগড়া জুড়ে দেন, সবাইকে নাজেহাল করে ছাড়েন। কাজেই আজ স্বীকৃতসত্য শাসন নয়, নিজ সম্মান নিয়ে দ্রুত প্রস্থান করাটাই বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক চাপমুক্ত উঠতি বয়সের একটি ছেলে সহজেই বন্ধুদের ছলনায় পড়ে প্রথমে ধূমপান শুরু করে। এরপর তারা ওলিতে গলিতে ইভটিজিং করে মজা নিতে থাকে। পর্যায়ক্রমে তারা মাদক, অনলাইন জুয়া, চুরি ছিনতাই, এমনকি খুন খারাবিতে জড়িয়ে পড়ে। তখন মা বাবা সকল দোষ সন্তানের উপর চাপিয়ে সান্ত্বনা খোঁজে।
বর্তমান সময়ে বাবা-মায়ের অধিক ব্যস্ততা সন্তানকে সময় দিতে না পারা, মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৈশোরে প্রশস্ত জায়গায় খেলাধূলার সুযোগ না পাওয়া। একাকিত্বের মধ্যে মোবাইলে সময় কাটানো যেমন সর্বনাশ ডেকে আনছে, তেমনি ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সোস্যালমিডিয়া যেমন তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিয়ে এসেছে তেমনি তরুণের বিপথগামী হওয়ার রাস্তাকে প্রশস্ত করেছে। পর্নো ভিডিও ফুটেজ বিক্রয়, টিকটকের নামে বেলেল্লাপনার বিস্তার, অশালিন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে চরিত্র হনন, ফেক আইডির মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে দেওয়া। মহামূল্যবান সময়ের যথেচ্ছ অপচয় খুবই স্বাভাাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বগ্রাসী মাদক ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন এমনকি ইহকাল ও পরকাল সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিচ্ছে। সন্তানের মাদকের পয়সা সরবরাহ না করায় পিতা মাতাকে পর্যন্ত জীবন দিতে হচ্ছে।
৪.
সাধারণত অপরাধ চক্রের সাথে জড়িত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের নিয়ে কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের মতে দেশে প্রায় ৪০০ এর কাছাকাছি কিশোর গ্যাং রয়েছে। সদস্য প্রায় ৪০০০ এর বেশি। যার মধ্যে ১০০ এর বেশি গ্যাং রয়েছে শুধু ঢাকা শহরে।
প্রত্যেকটা কিশোর গ্যাং এর পিছনে থাকে এক বা একাধিক বড় ভাই। প্রয়োজনীয় শেল্টার প্রদান, অস্ত্র সরবরাহ করা হয় প্রভাবশালী বড় ভাইয়ের স্বার্থসিদ্ধির জন্য। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা ও প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে কিশোর গ্যাং ব্যবহৃত হয়।
দেশে কিশোর গ্যাং এর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। গত চার বছর যার সংখ্যা দ্বিগুন হয়েছে। কিন্তু কিশোরদের এহেন অপরাধ জগতের সাথে জড়িয়ে পড়া রোধে কোন পদক্ষেপই কার্যকর হচ্ছে না। যার মূল কারণ আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। অনেক ক্ষেত্রে গ্রেফতারের পর দ্রুত জামিন ও বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপকে অকার্যকর করে দিচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন অপরাধ চক্র কিশোরদেরকে তাদের কর্মকান্ডের পাইপ লাইন হিসেবে ব্যবহার করছে। পুলিশের হিসাব মতে সংঘটিত অপরাধের ৪০% এ কিশের গ্যাং জড়িত। কিশোর গ্যাং এর যে সদস্যের কথা বলা হচ্ছে তার অর্ধেকই মাদকের ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কিশোরদের দিয়ে ভয়ংকর কোনো অপরাধ ঘটিয়ে জিম্মি করা হয়। ফলে সে আর অপরাধ জগৎ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখা, মাদকের পয়সা জোগাড়ের জন্য হেন অপকর্ম নেই তারা করে না।
৫.
কিশোরদের অপরাধ প্রবণতা রোধে প্রধান অস্ত্র পরিবার। শিশুদের মানসিক বিকাশে মা বাবাকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। তাদের চলাফেরা বন্ধু নির্বাচনের দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ববোধ সর্ম্পকে সচেতন করা। খেলাধূলা, চিত্র বিনোদন ও কর্মক্ষম করে গড়ে তোলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা, পড়াশুনা বিমুখ কিশোরদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। মাদক ব্যবসা নির্মূল এবং মাদকের সরবরাহলাইন বন্ধ করা। অপরাধ সংগঠিত হলে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অপরাধের সংশোধন ও পুনরায় সমাজে অন্তর্ভুক্তি মূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। মোদ্দা কথা হল মানুষের সচেতনতাই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
আজকের যুব সমাজ আগামি দিনে জাতির ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আকাশে যে কালো মেঘের ঘনঘটা দেখা যাচ্ছে, তা দূর করতে হলে শিক্ষার হাতেখড়ি হতে হবে তথা ঐশীবাণী শেখার সাথে সাথে শিখতে হবে পারিবারিক ও সামাজিক শিষ্টাচার। শিক্ষার পরবর্তী ধাপে সে যেন যেতে পারে তার পছন্দের বিভাগে- কলা, বিজ্ঞান, চিকিৎসা বা প্রাকৌশল বিদ্যায়। তাতে দেশ ও জাতি পাবে যোগ্যপেশাজীবী ও একজন সুনাগরিক, যুবসমাজ যুব সম্পদে পরিণত হবে। আমার সন্তান আমাকেই গড়ে তুলতে হবে। দুনিয়া ও আখেরাতে সফল হওয়ার জন্য উপযুক্ত প্লান ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: ব্যাংকার