বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)

আমেরিকায় মদ ত্যাগের ঢেউ, এক শান্ত প্রজন্মের উত্থান

দ্য উইক দ্য উইক
প্রকাশ : সোমবার, ১২ জানুয়ারি,২০২৬, ১০:০১ পিএম
আপডেট : সোমবার, ১২ জানুয়ারি,২০২৬, ১০:২২ পিএম
আমেরিকায় মদ ত্যাগের ঢেউ, এক শান্ত প্রজন্মের উত্থান

❒ আমেরিকায় এখন মদ্যপান ত্যাগের এক বিশাল ঢেউ বইছে। ছবি: ফাইল

আমেরিকা বর্তমানে তার ইতিহাসের এক অনন্য মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। যে দেশটি একসময় 'হার্ড ড্রিঙ্কস' বা কড়া মদ্যপানের জন্য পরিচিত ছিল, সেখানে এখন মদ্যপান ত্যাগের এক বিশাল ঢেউ বইছে। ১৯৩৯ সালে মদ্যপানের আচরণ ট্র্যাক করা শুরু হওয়ার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত আমেরিকানদের মদ্যপান করার হার এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এই প্রতিবেদনে আমরা এই পরিবর্তনের গভীর কারণ এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবগুলো আলোচনা করব।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মদ্যপানের প্রতি আমেরিকানদের এই অনীহা কেবল একটি সাময়িক ধারণা নয়, বরং এটি পরিসংখ্যানগতভাবে প্রমাণিত একটি কঠোর সত্য। গ্যালাপের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৫৪% আমেরিকান প্রাপ্তবয়স্ক এখন মদ্যপান করেন। ২০২২ সালের ৬৭% থেকে এই দ্রুত পতন নির্দেশ করে যে মানুষ অত্যন্ত সচেতনভাবেই মদ্যপান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এমনকি গবেষণা সংস্থা বার্নস্টাইন জানাচ্ছে যে, ২০২৪ সালে প্রতি ব্যক্তি বিশুদ্ধ অ্যালকোহল গ্রহণের পরিমাণ ৩% কমেছে, যা এক শতাব্দী আগের ঐতিহাসিক 'নিষিদ্ধকরণ' বা প্রহিবিশন যুগের পর একক বছরে সবচেয়ে বড় পতন হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এই পরিবর্তনের অগ্রভাগে রয়েছে তথাকথিত 'শান্ত প্রজন্ম' বা জেন-জি। ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী আমেরিকানদের মধ্যে মাত্র অর্ধেক এখন মদ্যপান করেন। তবে মজার বিষয় হলো, এই ধারা কেবল তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ৩৫ থেকে ৫৫ বছরের ঊর্ধ্বের ব্যক্তিদের মধ্যেও মদ্যপানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

এই গণহারে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পেছনে কাজ করছে বহুমুখী মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ। বিশেষজ্ঞরা একে দেখছেন একটি 'পেন্ডুলামের গতির' মতো। মহামারীর সময় চরম বিচ্ছিন্নতা আর একঘেয়েমি কাটাতে আমেরিকানরা রেকর্ড পরিমাণ মদ্যপান শুরু করেছিল; ২০২০ সালে মদের দোকানের বিক্রি এক লাফে ২০% বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছরের সেই অনিয়ন্ত্রিত অভ্যাসের পর এখন মানুষের মধ্যে এক ধরনের ক্লান্তি বা 'আফটারশক' তৈরি হয়েছে। এখন একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেই মানুষ তাদের শরীর ও লিভারকে বিশ্রাম দিতে চাইছে। এছাড়া অ্যালকোহল শিল্প এখন অনেকটা ১৯৭০-এর দশকের তামাক শিল্পের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি। একসময় মনে করা হতো রাতের খাবারের সঙ্গে এক গ্লাস রেড ওয়াইন স্বাস্থ্যের জন্য ভালো, কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান সেই ধারণা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। ২০২৫ সালে সার্জন জেনারেল বিবেক মূর্তির সেই যুগান্তকারী সতর্কবার্তা মানুষকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, মদ্যপানের কোনো স্তরই আসলে নিরাপদ নয়। মানুষ এখন জানে যে সামান্য মদ্যপানও নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি অ্যালকোহল যে কেবল শরীরের ক্ষতি করে না বরং উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা বাড়িয়ে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়, তা নিয়ে আজকের প্রজন্ম আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন।

সামাজিক প্রেক্ষাপটেও এসেছে বড় পরিবর্তন। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে মদ্যপান ত্যাগ করা এখন একটি বিদ্রোহ বা ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মাধ্যম। তারা তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মকে মদ্যপানে বুঁদ হয়ে থাকতে দেখে বড় হয়েছে এবং এখন নিজেদের জীবনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখাকেই শ্রেষ্ঠত্ব মনে করে। ডিজিটাল এই যুগে গেমিং, ভিডিও স্ট্রিমিং আর সোশ্যাল মিডিয়ায় মেলামেশার ধরণ বদলে যাওয়ায় মদের আড্ডার প্রয়োজনীয়তা কমছে। তার ওপর মাতাল অবস্থায় কোনো অপ্রীতিকর ছবি বা ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার সামাজিক লজ্জার ভয়ও একটি বড় প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করছে। এমনকি ওজেম্পিক বা ওয়েগোভির মতো আধুনিক ওজন কমানোর ওষুধগুলোও মানুষের মদ্যপানের জৈবিক ইচ্ছাকে অবদমিত করছে বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের অভিঘাত অত্যন্ত প্রবলভাবে লাগছে অ্যালকোহল শিল্পের গায়ে। আমেরিকার মদ্যপান শিল্প এখন আক্ষরিক অর্থেই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে। গত চার বছরে বিশ্বের শীর্ষ মদ্যপান প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ৮৩০ বিলিয়ন ডলার বাজার মূল্য হারিয়েছে। জিম বিমের মতো শতাব্দী প্রাচীন বড় কোম্পানিগুলো তাদের কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। কেবল বড় জায়ান্টরাই নয়, ধুঁকছে ক্ষুদ্র ক্রাফট-বিয়ারি আর ভাইনইয়ার্ডগুলোও। ক্যালিফোর্নিয়ার আঙুর চাষিরা দেখছেন যে গত এক চতুর্থাংশ শতাব্দীতে প্রথমবারের মতো তাদের উৎপাদিত ফসলের বড় একটি অংশ অবিক্রিত থেকে যাচ্ছে। চাহিদা না থাকায় অনেকেই লোকসানের মুখে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন। 

এই পরিবর্তন কি স্থায়ী? মদ্যপানের ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরনো হলেও আমেরিকানদের বর্তমান জীবনদর্শন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক রূপান্তর। ২০২৬ সালের জন্য প্রায় ৪০% প্রাপ্তবয়স্কের নতুন বছরের সংকল্পই হলো মদ্যপান কমানো। আমেরিকা সম্ভবত একটি সুস্থ, সচেতন এবং 'শান্ত' ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা শুরু করেছে, যেখানে আমোদ-প্রমোদের জন্য আর বোতলের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন পড়ছে না।

দ্য উইক থেকে ভাষান্তর: মহিউদ্দীন মোহাম্মদ

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 225 x 270 Position (2)
Position (2)