বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)

কেন যশোরেই দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা

❒ হাড়কাঁপানো শীতের নেপথ্যে যে বৈজ্ঞানিক রহস্য

হ রহমান হ রহমান
প্রকাশ : শুক্রবার, ২ জানুয়ারি,২০২৬, ১২:৩৭ পিএম
আপডেট : শনিবার, ৩ জানুয়ারি,২০২৬, ০১:৫৩ পিএম
কেন যশোরেই দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা

❒ যত শীতই হোক গাছিদের শুয়ে থাকার সুযোগ নেই। কুয়াশা মাড়িয়ে গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতেই হবে। ছবিটি আজ সকালে যশোর সদরের বীর নারায়নপুর গ্রাম থেকে তোলা ছবি: ধ্রুব নিউজ

নতুন বছরের শুরুতেই হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় বিপর্যস্ত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। আজ শুক্রবার সকালে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে যশোরে—৮ডিগ্রি সেলসিয়াস। চলতি মৌসুমে ইতিমধ্যে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমেছে। গত কয়েক বছর ধরেই শীত মৌসুমে শীতলতম স্থানের তালিকায় শীর্ষে থাকছে এই জেলা। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণের জেলা হওয়া সত্ত্বেও কেন যশোরেই শীতের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি?

নাটোরের লালপুরকে বাংলাদেশের অন্যতম শীতলতম স্থান বলা হয়—মূলত একটি ঐতিহাসিক রেকর্ডের কারণে। ১৯৬৮ সালে সেখানে দেশের ইতিহাসের সর্বকালীন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১.১° সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, নিয়মিত গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রার দৌড়ে যশোর লালপুর বা তেঁতুলিয়াকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের অধিকাংশ সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড যশোরেই ধরা পড়ছে।

এমনটা কেন হচ্ছে? আবহাওয়াবিদদের মতে, লালপুর বা উত্তরবঙ্গ (তেঁতুলিয়া) হিমালয়ের কাছে হওয়ায় সেখানে শীত বেশি হওয়ার কথা থাকলেও যশোরের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ঘটনা ঘটছে, যাকে বলা হয় 'উইন্ড কনভারজেন্স'। আবহাওয়াবিদ ড. আব্দুল মান্নানের মতে, হিমালয় থেকে আসা শীতল বায়ু ভারতের গঙ্গা অববাহিকা হয়ে সরাসরি যশোর ও চুয়াডাঙ্গা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এই বাতাসের 'গতিপথ' বা ‘করিডোর’ পরিবর্তনের কারণেই ইদানিং যশোরের শীত লালপুরকে টেক্কা দিচ্ছে।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাতের ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ ইমপ্যাক্ট অন বাংলাদেশ’ বইয়ের ১১০ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে—বাংলাদেশে শীতের তীব্রতার কেন্দ্রবিন্দু উত্তরবঙ্গ থেকে ধীরে ধীরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের (যাশোর, চুয়াডাঙ্গা) দিকে সরে আসছে। আবহাওয়াবিদগণ একে 'ক্লাইমেট শিফট' বলছেন।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক সামসুদ্দিন আহমেদ ‘ক্লাইমেট অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক টেকনিক্যাল রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন, হিমালয় থেকে আসা শীতল বায়ুর একটি বড় অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে। যশোর সমতল ভূমি হওয়ায় এই বায়ুপ্রবাহ কোনো বাধা ছাড়াই জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।

ড. এম. আসাদুজ্জামান ও কে. আসাদ উজ্জামান তাদের ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এগ্রিকালচার ইন বাংলাদেশ’ গবেষণাপত্রের ৪২-৪৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন যে, যশোরের মাটির গঠন ও উপরিভাগের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি দিনের বেলা সূর্য থেকে যে তাপ শোষণ করে, সূর্যাস্তের পর তা খুব দ্রুত মহাকাশে বিকিরণ করে দেয়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'রেডিয়েশনাল কুলিং'। এই দ্রুত শীতলীকরণ প্রক্রিয়ার ফলে শেষ রাতে মাটির সংলগ্ন বাতাসের স্তর হিমাঙ্কের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

গবেষণাপত্রটির ৪৩-৪৪ পৃষ্ঠায় আরও বলা হয়েছে, উপকূলীয় জেলাগুলোর তুলনায় যশোরের বায়ুমণ্ডল শীতকালে অনেক বেশি শুষ্ক থাকে। সমুদ্রের লোনা পানির উষ্ণতা উপকূলীয় সাতক্ষীরা বা খুলনায় তাপমাত্রাকে কিছুটা ধরে রাখলেও, যশোর সমুদ্র থেকে কিছুটা ভেতরে (Inland) হওয়ায় এই সুবিধা পায় না। এই কন্টিনেন্টাল এফেক্ট বা মহাদেশীয় প্রভাবের কারণে তাপমাত্রা দ্রুত হ্রাস পায়।

গবেষণাটির ৪৫ নম্বর পৃষ্ঠায় বিশেষভাবে সতর্ক করে বলা হয়েছে, যশোরের এই অস্বাভাবিক নিম্নতাপমাত্রার ফলে রবি শস্য ও বোরো ধানের বীজতলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কুয়াশার চাদর দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটে এবং ফসলের বৃদ্ধি থমকে যায়।

‘বাংলাদেশ জার্নাল অব ফিজিক্স’-এ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, শীতকালে সাইবেরীয় উচ্চচাপ বলয় বা সাইবেরিয়ান হাই—এর একটি বর্ধিতাংশ ভারতের বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। যশোর এই বলয়ের খুব কাছে অবস্থান করায় এখানকার বায়ুচাপ বেশি থাকে এবং আকাশ পরিষ্কার থাকলে ভূপৃষ্ঠের তাপ দ্রুত বিকিরিত হয়ে যায়।

কৃষি আবহাওয়া সংক্রান্ত বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, যশোর অঞ্চলে শীতকালে অ্যাডভেকশন ফগ বা সঞ্চালন কুয়াশার ঘনত্ব বেশি থাকে। এই কুয়াশা অনেক সময় দুপুর পর্যন্ত সূর্যের আলো কে আটকে রাখে, ফলে দিনের বেলাতেও মাটি গরম হতে পারে না।

যশোর বিমানবাহিনীর আবহাওয়া অফিস ও ঢাকা আবহাওয়া অফিসের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী—৫ জানুয়ারির পর উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা এই বায়ুপ্রবাহ আরও শক্তিশালী হতে পারে। ফলে বর্তমানের মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ তীব্র শৈত্যপ্রবাহে (৬ ডিগ্রির নিচে) রূপ নেওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

প্রসঙ্গত, আবহাওয়া অধিদপ্তরের মানদণ্ড অনুযায়ী, তাপমাত্রা ৬.১ থেকে ৮ ডিগ্রির মধ্যে থাকলে তাকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। বর্তমানে যশোর ছাড়াও মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, সিলেট, মৌলভীবাজার, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়াসহ দেশের ১৭টি জেলায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ ও কম্বল বিতরণ শুরু হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 225 x 270 Position (2)
Position (2)