বিশেষ প্রতিবেদক
❒ ব্যান্ডের রস গুড় ছবি: গাছি বাড়ির ফেসবুক পেজ থেকে নেয়া
হাইজিন’ আর ‘ব্র্যান্ড’—এই আধুনিক শব্দের মারপ্যাঁচে
সাধারণ গাছিদের তৈরি গুড় পাচ্ছে ‘অস্বাস্থ্যকর’ তকমা
যশোর সদর উপজেলার খাজুরা এলাকার ইছালী রাজাপুর গ্রাম। এই গ্রামের গাছি আলী আহম্মদ লস্করের জীবন প্রায় ৪০ বছর ধরে আবর্তিত হচ্ছে খেজুর গাছকে কেন্দ্র করে। প্রতিদিন শীতের বিকেলে বাঁকে করে ভাড়(ঠিলে) নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন গাছ কাটতে। পরদিন ভোরে সেই রস নামিয়ে জ্বাল দিয়ে তৈরি করেন সুগন্ধি গুড় ও পাটালি। এক সময় তার হাতের তৈরি পাটালির সুখ্যাতি ছিল দেশময়। রাজাপুরের পাটালি আর আহম্মদকে খুঁজতেন গুড়ের ক্রেতারা। কিন্তু আলী আহম্মদের চোখে এখন দুশ্চিন্তার ভাঁজ।
তার বাড়ির ঠিক সামনেই একটি সুদৃশ্য বাংলো অফিস। নাম দেওয়া হয়েছে ‘গাছি বাড়ি’। এই অফিসের লোকজন গাছিদের নিয়ে ঘটা করে মিটিং করে, ছবি তোলে। আলী আহম্মদ লস্কর কিছুটা ক্ষোভের সুরেই বললেন, ‘তারা গাছিদের নিয়ে ছবি তোলে, জাপানিদের কাছে পাঠিয়ে দেয়। শুনছি আমাদের ছবি নাকি বিদেশেও দেখায়। কিন্তু আমরা গাছিরা কী পাচ্ছি? বেশি দামে গুড় বেচলেও আমাদের পকেটে পয়সা আসে না। গত বছর তো লাভের বদলে নিজের তৈরি গুড়ই ফেরত নিতে হয়েছে। উল্টো সমিতির নামে টাকা দিয়ে সিজন শেষে ২০ হাজার টাকা লাভ দেওয়ার চাপ দেওয়া হয়েছিল। এইসব অব্যবস্থা দেখে আমি ওখান থেকে বেরিয়ে এসেছি।’
আলী আহম্মদের এই অভিযোগ মূলত এক বড় সংকটের ইঙ্গিত। ‘হাইজিন’ আর ‘ব্র্যান্ড’—এই আধুনিক শব্দের মারপ্যাঁচে সাধারণ গাছিদের তৈরি গুড়কে ‘অস্বাস্থ্যকর’ তকমা দিয়ে বাজার দখলের এক প্রচ্ছন্ন থাবা লক্ষ্য করা যাচ্ছে যশোরের ঐতিহ্যবাহী রস গুড়ে। করপোরেট এই ছায়া এখনো হয়তো সবটুকু গ্রাস করেনি, কিন্তু ঐতিহ্যের সেই খাঁটি স্বাদ আর প্রান্তিক গাছিদের জীবনকে তা এক অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
আলী আহম্মদের মতো অনেক গাছিই এখন একই যন্ত্রণায় ভুগছেন। পাশের বাড়ির গাছি আলম লস্কর বা তার ছেলে আবু হুরায়রা এখন আর ওই ‘গাছি বাড়িতে’ রস দেন না। তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি কেবল নিজেদের সুবিধা বোঝে। শীত-কুয়াশা বা মেঘলা আকাশের কারণে রস একটু সাদাটে ভাব হলে তারা তা নিতে চায় না। আবু হুরায়রা প্রশ্ন করেন, “আমরা কি আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারি? মেঘলা দিনে রস একটু অন্যরকম হতেই পারে, সেই রস না নিলে আমরা কোথায় যাবো? অথচ তারা আমাদের রস নিয়ে বড় বড় দোকানে চড়া দামে বিক্রি করছে। পাঠাচ্ছে দেশে বিদেশে।
বাজারে রসের এই রাজনীতি যখন তুঙ্গে, তখন সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে ভিন্ন কারণে। যশোরের রাস্তায় ১০-১৫ বছর আগেও শীতের ভোরে দেখা যেত গাছিরা বাঁকে করে ভাড় ভরা রস নিয়ে বিক্রি করতে বের হয়েছেন। মানুষ সেই রস দিয়ে মুড়ি খেত, পায়েস বা চিতই পিঠা বানাত। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য দুর্লভ। কোথাও কোথাও ৬০-৭০ টাকা লিটারে রস মিললেও তাতে ভরসা করা কঠিন।
ভরসা না থাকার অন্যতম কারণ হলো রসের সংকট থাকলেও বাজারে গুড়ের অভাব নেই। গাছির সংখ্যা বাড়ছে না, আগের মতো ভাড় ভরে রসও পড়ছে না, তাহলে এত গুড় আসছে কোথা থেকে? এই রহস্যের উত্তর মেলে অসাধু ব্যবসায়ীদের গোপন কারখানায়। মাঝে মাঝেই গণমাধ্যমে আটা, চিনি, রঙ আর ভারতীয় রাসায়নিক দিয়ে ভেজাল গুড় তৈরির খবর পাওয়া যায়। যশোর বড় বাজারের মাছ বাজারের প্রবেশপথে সিজন আসার আগেই মণ মণ গুড় মজুত হতে দেখা যায়। এই ভেজাল গুড়ের দাপটে খাঁটি গুড় উৎপাদনকারী গাছিরা যেমন বিশ্বাস হারাচ্ছেন, তেমনি অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে।
এই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে করপোরেট ও সুযোগসন্ধানী এক শ্রেণির ব্যবসায়ী। সাধারণ বাজারে যে গুড় ৫-৬ শত টাকায় পাওয়া যায়, সুপার শপগুলোতে ‘ব্র্যান্ড’ আর ‘হাইজিনিক’ স্টিকার লাগিয়ে তা বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা কেজি দরে। শহরের অর্থবান ক্রেতারা অতিরিক্ত দাম দিয়ে সেই গুড়ই কিনছেন। ফলে স্থানীয় বাজার অস্থিতিশীল হচ্ছে এবং সাধারণ গাছিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কম দামে গুড় কিনতে গেলেই এক শ্রেণির প্রচারক কানে কানে বলছে, “এতে ভেজাল আছে, এটা আন-হেলদি।” এমন স্লোগানই এখন শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
যশোরের বয়ারডাঙ্গা এলাকায় জাপানি অনুদান সংস্থা ‘জীপ’-এর সহায়তায় ‘বেডস’ (BEDS) নামক একটি প্রতিষ্ঠান গাছিদের জীবনমান উন্নয়নের প্রকল্প চালাচ্ছে। তারা গাছিদের মাস্ক, অ্যাপ্রন, গ্লাভস আর আধুনিক উপকরণ দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রজেক্ট ম্যানেজার মো. আসাদুল হাসান জানান, তারা চাষিদের কল্যাণে কাজ করছেন এবং গুড় বিক্রির পুরো টাকা গাছিরাই পান। গত বছর তারা ৫০০ কেজি গুড় বিক্রি করলেও এবার ৫ হাজার কেজি বাজারজাত করার লক্ষ্য নিয়েছেন।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। সাধারণ গাছিদের অভিযোগ, সমিতির মাধ্যমে তাদের ওপর এক ধরণের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। গাছিরা লিটার প্রতি পাচ্ছেন মাত্র ৬০ টাকা, অথচ সেই গুড়ই যখন ব্র্যন্ডের নামে বাজারে যাচ্ছে, তখন তার দাম দাঁড়াচ্ছে ৯০০ টাকা। এই বিশাল মুনাফার ছিটেফোঁটাও মাঠের গাছিরা পাচ্ছেন না।
যশোরের খেজুর গুড়কে করপোরেট শক্তি এখনো পুরোপুরি গিলে খেতে পারেনি ঠিকই, তবে তাদের থাবাটি স্পষ্ট। যশোরের সেই ঐতিহাসিক ‘যশ’ আর ঐতিহ্যের স্বাদকে বাঁচাতে হলে কেবল প্যাকেটের চাকচিক্য বাড়ালেই হবে না। যদি আলী আহম্মদ লস্করের মতো প্রান্তিক গাছিরা ন্যায্য মূল্য না পান এবং এই অসম প্রতিযোগিতা চলতে থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে যশোরের আসল গুড় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে কেবল শৌখিন শোপিস হিসেবেই রয়ে যাবে।