বিশেষ প্রতিনিধি
ছবি: সংগৃহীত
বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ কেবল একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটায়নি, বরং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের চিরচেনা ব্যাকরণকেও এক ধাক্কায় বদলে দিয়েছে? এই শোকাতুর ঢাকাতেই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সশরীরে এসে এবং সরাসরি তারেক রহমানের হাতে নরেন্দ্র মোদীর বিশেষ চিঠি হস্তান্তর—এই দুটি ঘটনাই এখন বড় এক ‘নোট অব ইন্টারোগেশন’ বা প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে যে সম্পর্কের মেরুকরণ একপাক্ষিক ছিল, সেখানে কি তবে বড় কোনো পালাবদল ঘটতে যাচ্ছে? জয়শঙ্করের এই সফরের মাধ্যমে ‘কী কথা তাহার সাথে’ হলো—তা নিয়েই এখন সর্বত্র আলোচনা।
শোকাতুর ঢাকা ও জয়শঙ্করের ‘স্মার্ট’ কূটনীতি
সাধারণত কোনো প্রতিবেশী দেশের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানের প্রয়াণে শোকবার্তা পাঠানোই কূটনৈতিক শিষ্টাচার। কিন্তু এস জয়শঙ্করের সশরীরে ঢাকায় উপস্থিতি এবং সরাসরি বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের সাথে সাক্ষাৎ এক ভিন্ন বার্তাই দিচ্ছে। গুলশানে বেগম জিয়ার কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর জয়শঙ্কর যেভাবে ঢাকায় অবস্থানরত তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তার হাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ চিঠি তুলে দিয়েছেন, তা ছিল এক পরিকল্পিত কৌশলের অংশ। দিল্লির এই পদক্ষেপটি কি তবে স্পষ্টভাবেই একটি বার্তা দিচ্ছে যে ভারত এখন আর বাংলাদেশের কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তিকে ব্রাত্য করে রাখতে চায় না? তারেক রহমানের নতুন নেতৃত্বকে কি তবে তারা বর্তমানের প্রধান রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবেই শেষমেশ গ্রহণ করে নিল? এই প্রশ্নগুলোই এখন কূটনৈতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে।
মানুষ কীভাবে দেখছে
জয়শঙ্করের এই আকস্মিক সফর এবং তারেক রহমানের সাথে এই ‘হাই-প্রোফাইল’ সাক্ষাৎ কি তবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে কেবল কৌতূহলই জাগিয়েছে, নাকি জন্ম দিয়েছে গভীর কোনো প্রশ্নের? গত দেড় দশকের তিক্ত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় অভ্যস্ত সাধারণ মানুষ কি এই পরিবর্তনকে কেবলই ‘ভারতের কৌশলগত ইউ-টার্ন’ হিসেবে দেখবে? চায়ের কাপে ঝড় ওঠা আলোচনায় যে প্রশ্নটি বারবার আসছে—ভারত কি শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারল যে বাংলাদেশের জনআকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্ব আদতে অসম্ভব? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জয়শঙ্করের এই নমনীয়তাকে অনেকেই ‘জনগণের শক্তির বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করছেন। বিশেষ করে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের স্বস্তি কি কেবলই আবেগপ্রসূত, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো কঠিন রাজনৈতিক সত্য? সচেতন নাগরিক সমাজের সেই পুরনো সন্দেহ কি তবে অমূলক যে—এই পরিবর্তন কি কেবলই সাময়িক কৌশল, নাকি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের ভিত্তি আমূল বদলে যাওয়ার পূর্বাভাস?
তারেক রহমানের কাছে মোদীর বার্তা কেন প্রশ্নবোধক চিহ্ন
তারেক রহমানের কাছে নরেন্দ্র মোদীর বার্তা হস্তান্তরের ঘটনাটি গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক মোড়। ভারতের সরকারি নথিতে একসময় যাকে নিয়ে নানা সংশয় ছিল, আজ ঢাকার মাটিতে সেই তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি এক ধরনের পরোক্ষ স্বীকৃতির প্রতিফলন কি এই চিঠি? প্রশ্নটি উঠছে কারণ, জয়শঙ্কর এখানে কেবল শোক প্রকাশ করতে আসেননি; তিনি একটি দীর্ঘদিনের আস্থার সংকটের বরফ গলানোর মিশন নিয়ে এসেছিলেন। রয়টার্স বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক মাধ্যমে জামায়াত বা প্রধান বিরোধী দলগুলোর সাথে ভারতীয় কূটনীতিকদের যোগাযোগের যে তথ্যাদি আসছে, ঢাকায় তারেক রহমানের সাথে এই সরাসরি সাক্ষাৎ তারই একটি চূড়ান্ত ও দৃশ্যমান ধাপ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কেন এই কৌশলগত পরিবর্তন
জয়শঙ্কর বরাবরই ‘রিয়েলিটি চেক’ বা বাস্তববাদী কূটনীতিতে বিশ্বাসী। ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে তিনি বুঝেছেন যে, একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরতা দিল্লির দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ঢাকায় তারেক রহমানের সাথে এই যোগাযোগ এবং বার্তা হস্তান্তরের অর্থ হলো—ভারত আগামী দিনের ক্ষমতার সম্ভাব্য অংশীদারদের সাথে একটি সুশৃঙ্খল ‘কমিউনিকেশন চ্যানেল’ তৈরি করতে চায়। জয়শঙ্করের এই পদক্ষেপ আসলে একটি বড় প্রশ্ন রেখে গেছে: ভারত কি তবে তার পুরনো ‘একমুখী নীতি’ থেকে পুরোপুরি সরে এসে ‘মাল্টি-পার্টি এনগেজমেন্ট’-এর পথে হাঁটছে?
কী কথা তাহার সাথে
জয়শঙ্করের এই সফর এবং তারেক রহমানের উদ্দেশে দেওয়া মোদীর বার্তার পরতে পরতে অনেক প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। দুটি প্রশ্ন জনগণের মধ্যে বিশেষভাবে দানা বেধেছে-
১. ভারত কি তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবর্তন ও জনগণের প্রবল আকাঙ্ক্ষাকে শেষ পর্যন্ত শ্রদ্ধা জানাতে বাধ্য হলো?
২. আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অখণ্ডতার স্বার্থে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে কি তবে একটি স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদী সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যেই এই ঝটিকা সফর?
এই ‘কী কথা তাহার সাথে’ প্রশ্নের উত্তর হয়তো এখনই খোলাসা হবে না, তবে জয়শঙ্কর যে আস্থার একটি নতুন বীজ বপন করে গেলেন, তা নিশ্চিত। শোকের মুহূর্তে ঢাকায় তারেক রহমানের সাথে এই মোলাকাত আসলে এক বড় ধরনের কৌশলগত বিনিয়োগ।
বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ এক শোকের ছায়া ফেললেও, জয়শঙ্করের হাত ধরে দিল্লির যে নতুন বার্তা ঢাকায় পৌঁছালো, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক রোমাঞ্চকর সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। সাধারণ মানুষ এই সফরের মাধ্যমে ভারতের অবস্থান পরিবর্তনের যে ছবি দেখছে, তা আগামীর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক হতে পারে যদি তা স্বচ্ছতার ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে। তারেক রহমানের কাছে মোদীর এই ব্যক্তিগত চিঠি হস্তান্তর কেবল শিষ্টাচার নয়, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। জয়শঙ্কর প্রমাণ করলেন যে, কূটনীতিতে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়; সময়ের প্রয়োজনে এবং জাতীয় স্বার্থের খাতিরে ‘তার সাথে’ কথা বলতেই হয়, যাকে একসময় এড়িয়ে চলা হতো।
ঢাকায় জয়শঙ্কর ও তারেক রহমানের এই সাক্ষাৎ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন এখন।