এম সাইফুল্লাহ
ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হলো বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) আয়োজিত ‘এএফসি গ্রাসরুট ডে ও বিশ্ব ফুটবল সপ্তাহ’। ছবি: ধ্রুব নিউজ
শনিবারের তপ্ত রোদেও ক্লান্ত হয়নি হামিদপুরের শামসুল হুদা ফুটবল একাডেমি মাঠ। বরং মাঠটি রূপ নিয়েছিল এক টুকরো সবুজ ক্যানভাসে। যেখানে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল শুধু ফুটবলের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা আর এক বুক স্বপ্ন। যশোর সদর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের এই মাঠে দিনব্যাপী উদ্ভাসিত হলো বাংলাদেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ। ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হলো বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) আয়োজিত ‘এএফসি গ্রাসরুট ডে ও বিশ্ব ফুটবল সপ্তাহ’। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলা এই ফুটবল উৎসবে অংশ নিয়েছিল ৭ থেকে ১৩ বছর বয়সী প্রায় ৮০০ জন ক্ষুদে ফুটবলার। মাঠজুড়ে তাদের নিখাদ আনন্দ আর ফুটবলের পেছনে ছুটে চলা যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিল—ফুটবল এখনো এই দেশের মানুষের স্পন্দন।
তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবলের টেকসই উন্নয়ন এবং ক্ষুদে প্রতিভা অন্বেষণের লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত এই বিশেষ উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (বীর বিক্রম)। যিনি খ্যাতনামা ফুটবলারও ছিলেন। হামিদপুরের এই সবুজ গালিচায় ক্ষুদে ফুটবলারদের সাহস জোগাতে হাজির হয়েছিলেন দেশ-বিদেশের একঝাঁক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে উৎসবের আলো বাড়িয়ে দেন আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সালো কার্লোস সেসা, পাকিস্তান হাইকমিশনের ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট অ্যাটাচি জাইন আজিজ এবং বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল। এছাড়াও এই আনন্দ অনুষ্ঠানে শামিল হয়েছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন, যশোরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আশেক হাসান, জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম, শামসুল হুদা ফুটবল একাডেমির দূরদর্শী প্রতিষ্ঠাতা ও জাহেদী ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক নাসের শাহরিয়ার জাহেদী এবং স্থানীয় ক্রীড়ানুরাগী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
উদ্বোধনী মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্পিকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (বীর বিক্রম) দেশের ফুটবল অঙ্গনকে সম্পূর্ণ আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার এক আহ্বান জানান। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ফুটবল খেলাকে এখন রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে হবে। অতীতে রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে অনেকের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফুটবল ফেডারেশনের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। আমি মনে করি এই অবস্থার অবসান হওয়া উচিত। খেলাধুলার প্রতি যাদের জেনুইন বা প্রকৃত আগ্রহ আছে, যারা মাঠকে ভালোবাসেন, তারাই যেন এটি পরিচালনা করেন। তিনি তৃণমূলের এই ক্ষুদে খেলোয়াড়দের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন ক্রীড়াবান্ধব উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং দেশের ফুটবল মানচিত্রে যশোর যেন তার ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ স্থান ধরে রাখতে পারে সেই আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বক্তব্যের একপর্যায়ে যশোরকে নিয়ে নিজের সামরিক ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির ঝাঁপি খুলে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন স্পিকার। একাত্তরের রণাঙ্গনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সামরিক জীবনের প্রথম পোস্টিং হিসেবে যশোর তার অত্যন্ত প্রিয় শহর। ১৯৭১ সালের ৩০শে মার্চ যশোর ক্যান্টনমেন্টে তার নেতৃত্বেই ঐতিহাসিক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল। ৩১শে মার্চ সম্মুখ যুদ্ধে তার প্রিয় সহযোদ্ধা সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট আনোয়ার হোসেন শহীদ হন। শহীদ আনোয়ারের স্মৃতি রক্ষার্থে এবং স্থানীয় মাঠের অবহেলিত মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে তিনি প্রয়াত তৃণমূল নেতা তরিকুল ইসলামের ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের মাধ্যমে একটি বিশেষ স্মারক তৈরির প্রচেষ্টা চালাবেন বলে জানান। এছাড়াও বেনাপোল চেকপোস্টে দীর্ঘ দুই মাস পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙ্কার তৈরি করে যুদ্ধ টিকিয়ে রাখার ও বীরদর্পে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে রাখার গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতি কিশোর খেলোয়াড়দের সামনে তুলে ধরেন তিনি।
এদিকে অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশে বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল দেশের ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে বর্তমান সরকারের নানা অগ্রাধিকারমূলক ও আধুনিক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, আগামী বাজেটে ক্রীড়া খাতের কাঠামোকে পুরোপুরি পেশাদার রূপ দেওয়ার জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেখা যাবে। দেশের স্টেডিয়ামগুলোর আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেসব স্টেডিয়াম ডেভলপ করা সম্ভব সেগুলো সংস্কার করা হবে, আর যেগুলো উপযুক্ত নয়, সেগুলো একদম ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন নকশায় আন্তর্জাতিক মানে তৈরি করা হবে। খুব দ্রুতই জিমনেসিয়াম, ফিজিও সেন্টার, ফার্স্ট এইড এরিয়া ও মাঠের সামগ্রিক উন্নয়ন দৃশ্যমান হবে। এছাড়াও স্কুল পর্যায়ে চতুর্থ শ্রেণি থেকেই বাধ্যতামূলকভাবে অন্তত চারটি খেলাধুলা অন্তর্ভুক্ত করার সরকারি সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংসদ চলাকালীন সময়ে বিভিন্ন এমপিদের মাধ্যমে যেন সংসদে ক্রীড়া আইন নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা ও বিতর্ক হয়, বাফুফে সেই লবিংও বজায় রাখবে।
অনুষ্ঠানের শেষভাগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বাফুফে সভাপতি জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের কঠোর শৃঙ্খলা এবং নতুন কোচের বহুল আলোচিত চুক্তি নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দেন। খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলা প্রসঙ্গে তিনি জানান, জাতীয় দলের ক্যাম্প চলাকালীন কোনো খেলোয়াড়কে ব্যক্তিগত বা প্রাইভেট কোনো উদ্যোগে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না। ম্যানেজমেন্টের সুবিধার্থে তাদের প্রফেশনাল ও প্রাইভেট লাইফ সম্পূর্ণ আলাদা রাখা হয়। নতুন কোচ নিয়োগের বিষয়ে বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন অবান্তর গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বাফুফে ভবনে সাংবাদিকদের সামনে অফিশিয়ালি যে তথ্য ও আপডেট দেওয়া হয়েছিল, সেটাই একমাত্র সঠিক। নতুন কোচের চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি জানান, চুক্তিতে স্ট্যান্ডার্ড ক্লজ বা কঠোর শর্তসমূহ রাখা হয়েছে, যা ভঙ্গ হলে চুক্তি বাতিলের সুযোগ থাকবে। দুই পক্ষ চূড়ান্তভাবে সম্মত হলে খুব শীঘ্রই চুক্তির বিস্তারিত জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।
বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার মধ্যে তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবল উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার যে পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে, তার ধারাবাহিকতাতেই প্রতিবছর এই ‘এএফসি গ্রাসরুট ফুটবল ডে’ আয়োজিত হয়ে আসছে। হামিদপুরের এই উৎসবমুখর দিনটি প্রমাণ করল, সঠিক পরিচর্যা ও সুযোগ পেলে এই ৮০০ শিশুর মাঝখান থেকেই একদিন বেরিয়ে আসবে বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানোর মতো আগামীর ফুটবল তারকারা।