ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
ইবোলা আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৭৫০ জনে পৌঁছেছে এবং এর মধ্যে ১৭৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমানে প্রায় ১,৪০০ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করে তাদের ওপর নজরদারি (কনট্যাক্ট ট্রেসিং) চালানো হচ্ছে।
আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর (ডিআরসি) ইতুরি প্রদেশে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা প্রাদুর্ভাব অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে এটি ইতিহাসের তৃতীয় বৃহত্তম ইবোলা প্রাদুর্ভাব হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, ভাইরাসটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ছড়াচ্ছে এবং পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৭৫০ জনে পৌঁছেছে এবং এর মধ্যে ১৭৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমানে প্রায় ১,৪০০ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করে তাদের ওপর নজরদারি (কনট্যাক্ট ট্রেসিং) চালানো হচ্ছে।
ঝুঁকির মাত্রা বৃদ্ধি এবং শনাক্তকরণে বিলম্ব
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জাতীয় পর্যায়ে ঝুঁকির মাত্রা "উচ্চ" থেকে বাড়িয়ে "অত্যন্ত উচ্চ" হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে আঞ্চলিক পর্যায়ে এটি "উচ্চ" এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে এখনও "কম" ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, প্রাথমিক অবস্থায় রোগটি শনাক্ত করতে এবং চিকিৎসাসেবা পৌঁছাতে দেরি হওয়ার কারণেই ভাইরাসটি এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। ডব্লিউএইচও-এর প্রতিনিধি ডক্টর অ্যান অ্যানসিয়া জানিয়েছেন, বিশেষজ্ঞদের দলটি যখন আক্রান্ত এলাকায় পৌঁছায়, ততক্ষণে ভাইরাসটি বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে নীরবে সমাজজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৪ এপ্রিল ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়াতে একজন স্বাস্থ্যকর্মী প্রথম এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই বিষয়ে জানতে পারে মে মাসের ৫ তারিখে, যখন চারজন স্বাস্থ্যকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যুর খবর সামনে আসে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দল যখন সেখানে পৌঁছায়, ততক্ষণে আক্রান্তের সংখ্যা ৮০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
নতুন প্রজাতি ও ভ্যাকসিনের অভাব
এবারের প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এর বৈজ্ঞানিক চরিত্র। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই সংক্রমণের পেছনে রয়েছে ইবোলা ভাইরাসের একটি বিরল প্রজাতি, যার নাম "বুন্দিবুগিও ভাইরাস"। সাধারণত ইবোলার অন্যান্য প্রজাতির জন্য প্রতিষেধক বা থেরাপি থাকলেও, এই নির্দিষ্ট বুন্দিবুগিও ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ভ্যাকসিন বা অনুমোদিত ওষুধ এখনও চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে নেই।
ফলে চিকিৎসকদের একমাত্র ভরসা এখন—আক্রান্তদের দ্রুত খুঁজে বের করা, তাদের আইসোলেশন বা সম্পূর্ণ আলাদা করে রাখা এবং আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা। কিন্তু যুদ্ধবিদ্ধস্ত এলাকা, ব্যাপক জনগমন, দুর্বল স্বাস্থ্য কাঠামো এবং তীব্র খাদ্য সংকটের কারণে এই কাজগুলো করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
মার্কিন নীতি ও বৈশ্বিক নেতৃত্বের অভাবের সমালোচনা
এই স্বাস্থ্য সংকটের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যনীতিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। একসময় বিশ্বজুড়ে ইবোলা মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএআইডি) এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের ব্যাপক বাজেট কর্তন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য রাখা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ সদস্যপদ প্রত্যাহারের কারণে এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং ২০১৪ সালে গিনিতে ইবোলা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া ভুক্তভোগী চিকিৎসক ক্রেগ স্পেন্সার নিউইয়র্ক টাইমসের একটি নিবন্ধে লিখেছেন:
"যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক স্বাস্থ্য এবং মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে তার দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের জায়গা থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। আমরা এই ভাইরাসের প্রত্যাবর্তন মোকাবিলার জন্য মোটেও প্রস্তুত নই।"
প্রতিবেদনে জানা গেছে, এবার ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য নেওয়ার সময় রক্তের নমুনা সঠিক তাপমাত্রায় পরিবহন না করায় রোগ শনাক্তকরণে বিলম্ব হয়—যা আগে ইউএসএআইডি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তদারকি করত। এছাড়া ফেস শিল্ড, রেসপিরেটর এবং বিশেষ সুরক্ষামূলক পোশাকের (পিপিই) তীব্র ঘাটতি থাকায় প্রথম সারির স্বাস্থ্যকর্মীরা চরম ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন।
"সহানুভূতির রোগ"
চিকিৎসক ক্রেগ স্পেন্সার ইবোলাকে "সহানুভূতির রোগ" হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ এই ভাইরাসটি শরীরের তরল পদার্থের মাধ্যমে ছড়ায়। ফলে অসুস্থ সন্তানের সেবা করতে গিয়ে বাবা-মা, মৃত স্বজনদের শেষকৃত্য করতে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা এবং রোগীদের বাঁচাতে গিয়ে চিকিৎসকেরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হন। এটি এমন এক মানবিক রোগ যেখানে ভালোবাসার মানুষের সেবা করতে গিয়েই মানুষ বেশি সংক্রমিত হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, যেখানে এই রোগ সহানুভূতির মাধ্যমে ছড়ায়, সেখানে বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতি এই রোগের প্রতি চরম "অসহানুভূতি ও অবহেলা" প্রদর্শন করছে।
'আতঙ্ক ও অবহেলার' দুষ্টচক্র ভাঙার আহ্বান
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহামারি ও প্যান্ডেমিক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মারিয়া ভ্যান কারখোভ এই সংকটে বিশ্বনেতাদের মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করেছেন। অর্থায়নের অভাব সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন:
"বিশ্বে প্রতিদিন যুদ্ধের পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করা হচ্ছে। সুতরাং এই মহামারি মোকাবিলার জন্য অর্থের কোনো অভাব হওয়ার কথা নয়। সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ন্ত্রণের জন্য ঠিকই টাকা পাওয়া যায়, কিন্তু রোগ প্রতিরোধের জন্য টাকা পাওয়া যায় না।"
তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, মহামারি আসার পর হুজুগে "আতঙ্কিত হওয়া এবং পরে তা ভুলে গিয়ে অবহেলা করার" যে আন্তর্জাতিক প্রবণতা রয়েছে, তা বন্ধ করতে হবে। তার পরিবর্তে জাতীয় স্তরে নজরদারি, গবেষণা, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্থায়ী উন্নয়নের জন্য নিয়মিত ও স্থায়ী তহবিলের ব্যবস্থা করা উচিত।
ধ্রুব/এস.আই