Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

ভারতে মুসলিম শাসন আমল : সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত

ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৯ মে,২০২৬, ০৯:০৫ এ এম
ভারতে মুসলিম শাসন আমল : সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত

তিহাস কেবল অতীত দিনের দর্পণ নয়, বরং বর্তমান ও আগামীর পথচলার শ্রেষ্ঠ পাথেয়। আজ যখন পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক অস্থিরতা আর উগ্র জাতীয়তাবাদের দাপটে হাজার বছরের লালিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেয়ালে ফাটল ধরার খবর পাওয়া যায়, তখন মুসলিম ইতিহাসের ধূসর পাতাগুলো নতুন করে উল্টানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ভারতবর্ষের মুসলিম শাসনামল নিয়ে যখন সংকীর্ণ স্বার্থে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা চলে, তখন নির্মোহ সত্যের মুখোমুখি হওয়া প্রয়োজন। মুসলমানদের প্রায় সাতশ বছরের সেই দীর্ঘ শাসনকাল কেবল রাজ্য জয় বা ক্ষমতার লড়াইয়ের ইতিহাস ছিল না, বরং তা ছিল হিন্দু-মুসলিম ও অপরাপর ধর্মের মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠা এক অনন্য সংহতি এবং গভীর মৈত্রীর আখ্যান। সম্রাট আকবরের ‘সুলহ-ই-কুল’ থেকে শুরু করে বাংলার সুলতানদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা—সব মিলিয়ে ভারতবর্ষ যে ‘গঙ্গা-যমুনা সংস্কৃতি’ বা 'গঙ্গা-জামুনি তহজিব' লাভ করেছিল, তা আজও আমাদের বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের শিক্ষা দেয়। বর্তমানের বিভেদকামী রাজনীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের সেই সোনালী অধ্যায়গুলো তাই আজ পাঠ করা অত্যন্ত জরুরি।


ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাস 

ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের ইতিহাস দীর্ঘ এবং বৈচিত্র্যময়। এটি মূলত অষ্টম শতাব্দীতে শুরু হয়ে আঠারোশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। নিচে এই সুদীর্ঘ ইতিহাসের একটি বিস্তারিত সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো-


​১. প্রাথমিক অভিযান ও সূচনা

​ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের সূত্রপাত ঘটে মূলত সামরিক অভিযানের মাধ্যমে।
​মুহাম্মদ বিন কাসিম (৭১২ খ্রিস্টাব্দ): উমাইয়া খলিফার সেনাপতি হিসেবে তিনি সিন্ধু ও মুলতান জয় করেন। এটিই ছিল ভারতে মুসলিম শাসনের প্রথম পদক্ষেপ।
​সুলতান মাহমুদ (১০০০–১০২৭ খ্রিস্টাব্দ): গজনীর সুলতান মাহমুদ ভারতে ১৭ বার অভিযান চালান। তার মূল লক্ষ্য ছিল সম্পদ আহরণ এবং মধ্য এশিয়ায় সাম্রাজ্য বিস্তার।
​মুহাম্মদ ঘুরি (১১৯১–১১৯২ খ্রিস্টাব্দ): তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে পৃথ্বীরাজ চৌহানকে পরাজিত করে তিনি ভারতে স্থায়ী মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন।


​২. দিল্লি সুলতানি আমল (১২০৬–১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ)

​মুহাম্মদ ঘুরির সেনাপতি কুতুবউদ্দিন আইবেকের হাত ধরে দিল্লি সুলতানি আমলের সূচনা হয়। এই আমলে পাঁচটি প্রধান রাজবংশ শাসন করেছে-


মুঘল সাম্রাজ্য (১৫২৬–১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ)

৩.​ ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল ভারতের ইতিহাসের এক স্বর্ণযুগ।
​আকবর দ্য গ্রেট: মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত সংহতি আনেন তিনি। তার 'দীন-ই-ইলাহি' এবং প্রশাসনিক কাঠামো (মনসবদারি প্রথা) ছিল অত্যন্ত আধুনিক।
​জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান: এই সময়কাল শিল্প ও স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত। শাহজাহানের নির্মিত তাজমহল বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়।
​আওরঙ্গজেব : তার সময় মুঘল সাম্রাজ্য ভৌগোলিকভাবে সর্ববৃহৎ আকার ধারণ করে।
​পতন : আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর (১৭০৭) দুর্বল উত্তরসূরি এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থানের ফলে মুঘলদের পতন শুরু হয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করার মাধ্যমে এই শাসনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।


​৪. আঞ্চলিক মুসলিম শাসন

​দিল্লির বাইরেও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে শক্তিশালী মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল :
​বেঙ্গল সালতানাত: শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের নেতৃত্বে বাংলা একটি স্বাধীন ও সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত হয়।
ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনামলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত :
​আসলে ভারতবর্ষের মধ্যযুগের ইতিহাসের দিকে তাকালে অনুমিত হয় যে, ভারতবর্ষে মধ্যযুগীয় ইতিহাস এক অনন্য সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের যুগ। সুলতানি আমল থেকে মুঘল আমল—প্রায় ছয়শ বছরের এই দীর্ঘ যাত্রায় ভারত এক অবিচ্ছেদ্য ‘গঙ্গা-যমুনা সংস্কৃতি’ বা 'গঙ্গা-জামুনি তহজিব' লাভ করেছিল, যেখানে ধর্ম ছিল ব্যক্তিগত, কিন্তু উৎসব ও সংস্কৃতি ছিল সর্বজনীন।

​রাজনৈতিক উদারতা ও প্রশাসনিক সমন্বয়

ভারতবর্ষের মুসলিম শাসকরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি বিশাল অমুসলিম জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী শাসন সম্ভব নয়। তাই তারা প্রশাসনে যোগ্য হিন্দুদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ কিংবা অর্থমন্ত্রী রাজা টোডরমলের নাম ইতিহাসে সর্বজনবিদিত। এমনকি আওরঙ্গজেবের শাসনামলেও মুঘল প্রশাসনে হিন্দু কর্মকর্তাদের হার ছিল পূর্বের চেয়ে বেশি। এটি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মের চেয়ে আনুগত্য ও যোগ্যতাই ছিল বড় মাপকাঠি।

​ধর্মীয় সহিষ্ণুতার স্তম্ভসমূহ

মুসলিম শাসকদের উদারতার এক বড় উদাহরণ হলো 'জিজিয়া' কর প্রত্যাহার। সম্রাট আকবর ১৫৬৪ সালে এটি বিলোপ করে সকল নাগরিককে সমান মর্যাদা দেন। কাশ্মীরের সুলতান জয়নুল আবেদিন কিংবা বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতি যে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে, তা বিরল। হোসেন শাহের আমলেই শ্রীচৈতন্যদেব বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারের অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছিলেন এবং তার হিন্দু মন্ত্রীবর্গ রাজকার্যে প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছিলেন।


​ভাষা ও সাহিত্যের মেলবন্ধন

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় ভাষায়। মুসলিম শাসকদের উৎসাহেই প্রথমবার রামায়ণ ও মহাভারত বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়। কৃত্তিবাস ও মালাধর বসুর মতো কবিরা রাজদরবারে সমাদৃত হতেন। অন্যদিকে ফারসি ও স্থানীয় ভাষার সংমিশ্রণে জন্ম নেয় ‘উর্দু’, যা ছিল হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। এই সাহিত্যিক বিনিময় দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে আত্মিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করেছিল।


​সুফি ও ভক্তি আন্দোলনের প্রভাব

তৎকালীন ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে শাসক শ্রেণির চেয়েও বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন সুফি সাধক ও ভক্তি আন্দোলনের সন্তরা। খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (র.) বা নিজামুদ্দিন আউলিয়া (র.)-এর দরগাহে যেমন হিন্দু-মুসলিম উভয়ই ভিড় করত, তেমনি কবীর ও গুরু নানকের বাণীতে একত্ববাদের সুর ছিল প্রবল। এই আধ্যাত্মিক ধারাটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের এক মজবুত ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।

​স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সমন্বিত রূপ

ভারতবর্ষের স্থাপত্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, মধ্যযুগীয় ভারতের মসজিদ বা সমাধিগুলোতে হিন্দু স্থাপত্যশৈলীর কলস, পদ্মফুল বা ঘণ্টার চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে। একেই ঐতিহাসিকরা ‘ইন্দো-ইসলামিক’ স্থাপত্য বলেন। সঙ্গীতেও আমির খসরুর হাতে যে সেতার ও তবলা জন্ম নিয়েছিল, তা আজও দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গীতের মূল ভিত্তি।
​সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উল্লেখযোগ্য কিছু নজির -


​১. সম্রাট আকবরের 'সুলহ-ই-কুল' নীতি

​মুঘল সম্রাটদের মধ্যে সম্রাট আকবর ছিলেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রধান পথপ্রদর্শক।
​সুলহ-ই-কুল: তিনি 'সর্বজনীন শান্তি' বা 'সুলহ-ই-কুল' নীতি প্রবর্তন করেন, যার মূল কথা ছিল সকল ধর্মের মানুষের সমান মর্যাদা।
​ইবাদত খানা: ফতেহপুর সিকরিতে তিনি একটি প্রার্থনা কক্ষ নির্মাণ করেন যেখানে হিন্দু, মুসলিম, জৈন, খ্রিস্টান ও পার্সি ধর্মতাত্ত্বিকরা এসে ধর্মীয় আলোচনা করতেন।
​বৈবাহিক ও রাজনৈতিক মৈত্রী: তিনি রাজপুতদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং রাজ্যের উচ্চপদগুলোতে (যেমন: রাজা মানসিংহ, রাজা টোডরমল) হিন্দুদের নিয়োগ দিয়ে প্রশাসনে ভারসাম্য আনেন।


​২. সুলতান জয়নুল আবেদিনের উদারতা (কাশ্মীর)

​কাশ্মীরের সুলতান জয়নুল আবেদিনকে তার উদারতার জন্য 'কাশ্মীরের আকবর' বলা হয়।
​তিনি হিন্দুদের ওপর থেকে জিজিয়া কর তুলে নেন এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তর নিষিদ্ধ করেন।
​ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দির পুনর্নির্মাণে তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থ সাহায্য দিতেন।


​৩. বাংলার ইলিয়াস শাহী ও হোসেন শাহী আমল

​বাংলার মুসলিম সুলতানদের আমলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল।
​আলাউদ্দিন হোসেন শাহ: তাকে 'নৃপতি তিলক' ও 'জগৎভূষণ' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন সমকালীন হিন্দু পণ্ডিতরা। তার শাসনামলেই শ্রীচৈতন্যদেব বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারের পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়েছিলেন।


​সাহিত্যে পৃষ্ঠপোষকতা: মুসলিম সুলতানদের উৎসাহে ও অর্থায়নেই প্রথমবার রামায়ণ ও মহাভারত বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়। কৃত্তিবাস ও মালাধর বসুর মতো কবিরা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন।

​৪. সুফি ও ভক্তি আন্দোলনের প্রভাব

​শাসকদের বাইরেও সাধারণ মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে তুলেছিলেন সুফি সাধক এবং ভক্তি আন্দোলনের সন্তরা।
​খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (র.) ও নিজামুদ্দিন আউলিয়া (র.): তাদের দরগাহগুলোতে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল মানুষ ভিড় করত, যা আজও বিদ্যমান।
​কবীর ও গুরু নানক: তারা স্রষ্টার একত্ববাদ প্রচার করতেন এবং জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে কথা বলতেন, যা দুই ধর্মের সাধারণ মানুষকে কাছাকাছি এনেছিল।

​৫. স্থাপত্য ও সংস্কৃতিতে সংমিশ্রণ (ইন্দো-ইসলামিক শিল্প)

​মুসলিম শাসনামলে স্থাপত্যে এক নতুন শৈলী তৈরি হয় যা ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্য নামে পরিচিত।
​মসজিদ ও সমাধির কারুকার্যে পদ্মফুল, কলস বা ঘণ্টার মতো হিন্দু সংকেত চিহ্ন ব্যবহার করা হতো।
​সঙ্গীতের ক্ষেত্রে আমীর খসরু ভারতীয় এবং পারস্যের সুর মিলিয়ে 'সেতার' ও 'তবলা'র মতো বাদ্যযন্ত্র এবং 'কাওয়ালি' ও 'খেয়াল' গানের প্রবর্তন করেন।

​৬. দাক্ষিণাত্যের সুলতানদের ভূমিকা

​দক্ষিণ ভারতের বিজাপুর ও গোলকুণ্ডার সুলতানরা অত্যন্ত উদার ছিলেন। বিজাপুরের সুলতান দ্বিতীয় ইব্রাহিম আদিল শাহ এতটাই হিন্দু সংস্কৃতির অনুরাগী ছিলেন যে তাকে 'জগতগুরু বাদশা' বলা হতো। তিনি বিদ্যার দেবী সরস্বতীর নামে তার সংগীত গ্রন্থ 'কিতাব-ই-নওরস' শুরু করেছিলেন।

হিন্দু- মুসলিম সম্প্রীতির মেলবন্ধন বিষয়ে কয়েকজন প্রভাবশালী মুসলিম ব্যক্তিত্বের মন্তব্য ও দর্শন-


​১. আমীর খসরু (Amir Khusrau)

​ত্রয়োদশ শতাব্দীর এই বিখ্যাত কবি ও সংগীতজ্ঞকে বলা হয় 'ভারতের তোতাপাখি'। তিনি নিজেকে একজন গর্বিত ভারতীয় মনে করতেন এবং হিন্দু সংস্কৃতির প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা ছিল।
​"আমি হিন্দুবাসীদের ভালোবাসি এবং তাদের প্রতি আমার অসীম শ্রদ্ধা রয়েছে। যদিও তাদের ধর্ম আমার থেকে আলাদা, কিন্তু তারা সৃষ্টিতত্ত্ব ও একেশ্বরবাদে অনেক গভীর জ্ঞান রাখে।"
(তাঁর এই দর্শন হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন তৈরিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল)


​২. হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (র.)

​দিল্লির বিখ্যাত এই সূফি সাধক মানুষের সেবাকেই শ্রেষ্ঠ ইবাদত মনে করতেন। একবার যমুনা নদীর তীরে হিন্দুদের পূজা দেখে তিনি তাঁর শিষ্য আমীর খসরুকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন:
​"হর কওম রা আস্ত রাহে, দ্বীনে ওয়া কিবলা গাহে।"
(অর্থাৎ: প্রতিটি জাতির নিজস্ব পথ, ধর্ম এবং উপাসনার কেন্দ্র রয়েছে।)
তাঁর এই উদারতা প্রমাণ করে যে, তৎকালীন আধ্যাত্মিক সমাজ অন্যের ধর্ম পালনের স্বাধীনতাকে কতটা সম্মান জানাতো।

​৩. দারা শিকোহ (Dara Shikoh)

​মুঘল শাহজাদা দারা শিকোহ ছিলেন উপনিষদ ও বেদের অনুবাদক এবং আন্তঃধর্মীয় সংলাপের পথিকৃৎ। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'মাজমা-উল-বাহরাইন' (দুই সমুদ্রের মিলনস্থল)-এ তিনি লিখেছেন-
​"ইসলাম এবং হিন্দুধর্মের অন্তর্নিহিত সত্য আসলে একই। এই দুই মহান ধর্মতত্ত্বের মধ্যে কোনো মৌলিক বিরোধ নেই, বরং এগুলো একই সত্যের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ মাত্র।"

​৪. আল-বিরুনী (Al-Biruni)
​বিখ্যাত এই পর্যটক ও পণ্ডিত তাঁর 'িতাহকিক-ই-হিন্দ' গ্রন্থে অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে ভারতীয় সমাজ ও ধর্মকে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন:
​"ভারতীয়রা অত্যন্ত মেধাবী এবং তাদের বিজ্ঞান ও দর্শন অত্যন্ত উন্নত। সত্যের অনুসন্ধান করতে হলে আমাদের একে অপরের সংস্কৃতিকে ঘৃণা নয়, বরং গভীরভাবে বুঝতে হবে।"

​৫. মাওলানা আবুল কালাম আজাদ

​আধুনিক ভারতের রূপকার এবং প্রখ্যাত আলেম মাওলানা আজাদ মুঘল আমলের সেই সম্মিলিত সংস্কৃতিকে বা গঙ্গা-যমুনা সংস্কৃতিকে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে দেখতেন। তিনি বলতেন:
​"ইসলামের এগারোশ বছরের ইতিহাস এবং হিন্দুধর্মের হাজার বছরের ঐতিহ্য মিলে মিশে এক অখণ্ড জাতিসত্তা তৈরি করেছে। আজ আমরা কেউই একে অপরকে ছাড়া অসম্পূর্ণ।"
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধন বিষয়ে ​বিখ্যাত হিন্দু মনীষীদের পর্যবেক্ষণ ও বাণী-


​১. স্বামী বিবেকানন্দ (Swami Vivekananda)

​ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক চেতনার অন্যতম মহাপুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ মনে করতেন, ভারতের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হতে পারে কেবল হিন্দু ও মুসলিম এই দুই সংস্কৃতির মিলনের মাধ্যমে। তিনি বলতেন,​"আমাদের মাতৃভূমির জন্য আমাদের প্রয়োজন—একটি হিন্দু মন এবং একটি ইসলামি শরীর (Vedantic brain and Islamic body)। আমি আমার অন্তরে দেখতে পাই যে, এই বিশৃঙ্খলা ও কলহ থেকে এক মহান এবং অপরাজেয় ভারত গড়ে উঠছে, যার ভিত্তি হবে এই দুই মহান দর্শনের সমন্বয়।"

​২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore)

​রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের 'মহাভারতের পুণ্যভূমি' প্রবন্ধে এবং বিভিন্ন লেখায় ভারতের আত্মিক মিলনের কথা বলেছেন। তিনি বলেছিলেন,​"ভারতবর্ষে পাঠান-মুঘলদের যখন শাসন ছিল, তখন তারা এ দেশকে নিজের দেশ বলেই গ্রহণ করেছিল। তারা হিন্দু ও মুসলিমকে শত্রু মনে করত না, বরং ভারতের সংস্কৃতিতে নিজেদের রং মিশিয়ে দিয়েছিল। যার ফলে সংগীত, স্থাপত্য এবং সাহিত্যে এক অদ্ভুত ও সুন্দর বিনিময় ঘটেছিল।"

আরও পড়ুন-

মরণজয়ী মিছিলের ৫০ বছর: ফারাক্কা বাঁধ ও অমীমাংসিত পানি রাজনীতি মরণজয়ী মিছিলের ৫০ বছর: ফারাক্কা বাঁধ ও অমীমাংসিত পানি রাজনীতি

​৩. মহাত্মা গান্ধী (Mahatma Gandhi)

​ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক মহাত্মা গান্ধী সবসময়ই হিন্দু-মুসলিম ঐক্যকে ভারতের শক্তির উৎস মনে করতেন। তিনি বলতেন, ​"হিন্দু ও মুসলিম এই দুই সম্প্রদায় হলো ভারতবর্ষ নামক এক সুন্দর পাখির দুটি চোখের মতো। একটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মানে পাখির পুরো দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলা।"

৪.​ স্যার যদুনাথ সরকার (Sir Jadunath Sarkar) মুঘল ইতিহাস চর্চায় একজন পথিকৃৎ। তিনি তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, দীর্ঘস্থায়ী মুসলিম শাসনের ফলে ভারতে একটি 'যুগল সংস্কৃতি' তৈরি হয়েছিল। তিনি লিখেছেন:

​"মুসলিম শাসনের ফলে ভারতের বিচ্ছিন্ন প্রদেশগুলো একটি রাজনৈতিক সংহতির অধীনে এসেছিল এবং ফারসি সাহিত্যের প্রভাবে ভারতীয়দের চিন্তাচেতনায় এক বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছিল।"


৫. ​ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার (R. C. Majumdar) ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যা ও তথ্যের ওপর জোর দিতেন। তিনি আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনকালকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে উল্লেখ করেছেন -

​"সুলতান হোসেন শাহের শাসনামল ছিল বাংলার ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগ। তার উদার নীতির কারণেই হিন্দু পণ্ডিত ও কবিরা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন এবং বাংলা সাহিত্যের অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটেছিল।"

এমন কি ​ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু (Jawaharlal Nehru) তার বিখ্যাত ঐতিহাসিক 'The Discovery of India' গ্রন্থে মুসলিম আমলের হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতি নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। তার ভাষায়,​"মুঘল সম্রাটরা, বিশেষ করে আকবর, ভারতের মাটির সাথে মিশে গিয়েছিলেন। তারা বাইরে থেকে আসা বিজেতা ছিলেন না, বরং ভারতের সন্তান হিসেবে শাসন করেছিলেন। তাদের সময়েই হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির মধ্যে যে মিলন ঘটেছিল, তা-ই বর্তমান ভারতের আধুনিক রূপ গড়ে দিয়েছে।"

 

​পরিশেষে বলা যায়, ভারতবর্ষের মুসলিম শাসনামল কেবল রাজবংশ পরিবর্তন বা রাজ্য জয়ের ইতিহাস ছিল না, বরং তা ছিল একটি মহান সভ্যতার বিনির্মাণ—যেখানে শাসকের ধর্মের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন। আজ যখন রাজনীতির সংকীর্ণ স্বার্থে ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষের মনে বিভেদ ও বিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়ানোর চেষ্টা চলছে, তখন আমাদের ফিরে তাকাতে হবে সেই শেকড়ের দিকে। যেখানে সম্রাট আকবরের রাজসভায় বীরবল আর মানসিংহরা ছিলেন প্রভাবশালী, যেখানে মুসলিম সুলতানদের অকৃত্রিম উৎসাহে হিন্দু কবিরা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। ইতিহাসের সেই মহান শিক্ষা আজ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ভারতবর্ষের আসল শক্তি তার বিভক্তিতে নয়, বরং তার বৈচিত্র্যপূর্ণ ঐক্যের মধ্যে নিহিত। বর্তমানের অস্থিরতা ও উগ্রতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমাদের সেই ‘গঙ্গা-যমুনা সংস্কৃতি’র মশালটিই নতুন করে প্রজ্বলিত করতে হবে। ঘৃণা ও নির্যাতনের অন্ধকার সরিয়ে সম্প্রীতির যে প্রদীপ মধ্যযুগের ভারত জ্বালিয়েছিল, সেই আলোতেই খুঁজে নিতে হবে আধুনিক ভারতবর্ষ ও দক্ষিণ এশিয়ার আগামীর পথ। কারণ, ইতিহাস সাক্ষী দেয়—হিংসা দিয়ে সাময়িক জয় পাওয়া গেলেও, মানুষের হৃদয় জয় করা যায় কেবল ভ্রাতৃত্ব আর উদারতার মহামন্ত্রে।

লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা

তিন সীমান্ত রাজ্যে বিজেপি: রাজনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তিন সীমান্ত রাজ্যে বিজেপি: রাজনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ

 

 

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)