আবু মুয়াজ মাসুম বিল্লাহ
আজ ২৬ শে রজব পবিত্র শবে মিরাজ। এদিন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সান্নিধ্যে গিয়েছিলেন। রজবের গুরুত্বপূর্ণ দিবসটির মর্যাদা ও গুরুত্ব বিবেচনায় লেখাটি প্রকাশ করা হলো। বি.স
ইসরা ও মিরাজ নবীজীর জীবনের এক অতি মর্যাদাপূর্ণ অধ্যায়। এটি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের অন্যতম অসাধারণ মুজিযা, যা উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত এক অনন্য নিআমত। এই মহাজাগতিক ঘটনার মাধ্যমে নবীর মর্যাদা যেমন আলোকিত হয়েছে, তেমনি সৃষ্টিজগতের সঙ্গে মানবতার সম্পর্ক ও মানব মর্যাদা প্রতিফলিত হয়েছে।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, ইসরা ও মিরাজ আক্বীদা ও বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কুরআন ও সহীহ হাদীসে নির্দেশিত এই ঘটনা মুসলমানদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। সহীহ বুখারী হাদীস ৩৮৮৭ এবং সহীহ মুসলিম হাদীস ২৬৪ ও ২৫৯ অনুসারে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাতের সময় বিশেষভাবে নির্বাচিত অবস্থায় ইসরা ও মিরাজের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। এই ঘটনায় নবীজীর হৃদয় আবে যমযম দ্বারা পরিশোধিত হয় এবং সোনার একটি চক্রের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে, যা প্রজ্ঞা ও ঈমানের নিখুঁত প্রতীক।
ইসরা অংশে নবীজীকে বুরাক নামক ক্ষিপ্রগতিশীল সওয়ারীতে আরোহন করা হয়। বুরাকের মাধ্যমে নবীজী মুহূর্তের মধ্যে জেরুজালেমের বায়তুল মাকদিসে পৌঁছান। হাদীসের বর্ণনা অনুসারে, বুরাকের অতিশয় দ্রুততা ও আকাশে যাত্রার অনন্য ক্ষমতা নবীজীর জন্য আল্লাহর বিশেষ রহমত ও কৃপার নিদর্শন।
মিরাজ অংশে নবীজী সাতটি আকাশ অতিক্রম করেন এবং প্রত্যেক আকাশে বিভিন্ন নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। প্রথম আকাশে হযরত আদম আ. ও তাঁর সন্তানদের সঙ্গে দেখা হয়; দ্বিতীয় আকাশে হযরত ঈসা আ. ও ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়ার সঙ্গে; তৃতীয় আকাশে হযরত ইউসুফ আ.; চতুর্থে হযরত ইদরীস আ.; সপ্তম আকাশে হযরত ইবরাহীম আ. নবীজীকে স্বাগত জানান। এই আকাশ পর্যায়গুলি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অগ্রগতির প্রতীক, যেখানে প্রতিটি স্তর মানব জীবনের পরীক্ষার প্রতিফলন।
সর্বোচ্চ আকাশে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয নির্ধারিত দেখেন। হযরত মূসা আ. পরামর্শ দেন, উম্মতের সক্ষমতা অনুযায়ী নামাযের সংখ্যা হ্রাস করার জন্য। নবীজীর বারবার প্রার্থনার পর আল্লাহ তাআলা নামাযকে পাঁচ ওয়াক্তে নির্ধারণ করেন, যার প্রতিটি ওয়াক্তের সওয়াব পঞ্চাশের সমান। এটি মুসলিম উম্মতের জন্য নামাযের অপরিসীম গুরুত্ব ও নৈতিকতার শিক্ষা বহন করে।
মিরাজের মাধ্যমে নবীজী জান্নাত ও জাহান্নামের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। মালেক নামক প্রধান ফেরেশতা নবীজীকে সালাম জানান। বিভিন্ন ধরনের মানুষের অবস্থা দেখা যায় যেমন: মিথ্যুক, গীবতকারী, দুঃখী, সুদখোর। একই সাথে নবীজী কাউসার, চারটি নদী ও সিদরাতুল মুনতাহারসহ জান্নাতের সৌন্দর্যও প্রত্যক্ষ করেন। এটি নির্দেশ করে যে, আধ্যাত্মিক সচেতনতা ও নৈতিক জীবনই চূড়ান্ত ফলাফলের সূচনা।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে মেরাজকে মনস্তাত্ত্বিক ও স্নায়ুবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। আধুনিক নিউরোসায়েন্স প্রমাণ করে, গভীর ধ্যান বা প্রার্থনার সময় মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল কর্টেক্স ও প্যারাইটাল লোবের কার্যক্রম বাড়ে। এর ফলে এমন অভিজ্ঞতা অনুভূত হয় যা বাস্তবিক ভ্রমণের অভিজ্ঞতার সমতুল্য মনে হয়। অতএব, নবীজীর মেরাজের ঘটনা আধ্যাত্মিক উচ্চতার সঙ্গে মানসিক প্রক্রিয়ার সমন্বয় হিসেবেও দেখা যেতে পারে, যেখানে আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাস ও ইমান মস্তিষ্কের কার্যক্রমকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
ইসরা ও মিরাজের শিক্ষা মানব জীবনের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অগ্রগতির প্রতীক। সত্য ও ন্যায়পরায়ণতার প্রতি নিষ্ঠা, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাস ছাড়া জীবন পূর্ণতা পায় না। এটি কেবল আধ্যাত্মিকতার শিক্ষা নয়, সামাজিক ও নৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নৈতিক জীবন মানে সমাজে ন্যায়, সহানুভূতি এবং কল্যাণ প্রতিষ্ঠা।
ইসরা ও মিরাজের ঘটনা কেবল নবীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়; এটি প্রতিটি মুসলিমের জন্য আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও মানসিক উন্নয়নের দিশারী। সাতটি আকাশের প্রতিটি পর্যায়, নবীদের সাক্ষাৎ এবং আল্লাহর নৈকট্য,সবই নির্দেশ করে যে, জীবন একটি ধারাবাহিক যাত্রা, যেখানে আত্মার পরিশোধন, নৈতিক সচেতনতা এবং জ্ঞানের চূড়ান্ত অর্জনই চূড়ান্ত লক্ষ্য।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইসরা ও মিরাজ শুধুমাত্র অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং নৈতিক শিক্ষা, আধ্যাত্মিক প্রেরণা এবং মানবজীবনের মানসিক বিকাশের এক যুগান্তকারী প্রক্রিয়া।
লেখক: আলেমে দীন ও খতিব