ড. মো. তবিবর রহমান
‘করয’ শব্দটি আরবি, যার অর্থ ঋণ। আর ‘হাসানা’ শব্দের অর্থ সুন্দর বা উত্তম। অর্থাৎ ‘করযে হাসানা’ মানে হলো উত্তম ঋণ। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়—অসহায়, দরিদ্র ও দুস্থদের উপকারের উদ্দেশ্যে, কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় যে ঋণ প্রদান করা হয়, তাকে করযে হাসানা বলে।
আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম করযে হাসানা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “এমন কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ (করযে হাসানা) দেবে? অতঃপর আল্লাহ তাকে দ্বিগুণ-বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেবেন। আল্লাহই সংকুচিত করেন এবং তাঁরই নিকট তোমরা সবাই ফিরে যাবে।” (সূরা বাকারা: ২৪৫)।
আয়াতে ঋণ শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। মানুষ সামাজিক কল্যাণে যে ব্যয় করে, বাহ্যিকভাবে তার কোনো জাগতিক রিটার্ন নেই। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এটি আল্লাহকে ঋণ দেওয়ার শামিল। উদ্দেশ্য হলো—যেভাবে ঋণ পরিশোধ করা ওয়াজিব, তেমনি সামাজিক কল্যাণে আপনার ব্যয় করা অর্থ আল্লাহ তায়ালা পরকালে বহুগুণ সওয়াবসহ ফিরিয়ে দিতে বাধ্য।
জান্নাত লাভ ও গুনাহ মাফের উপায় করযে হাসানা কেবল পরোপকার নয়, বরং এটি জান্নাতপ্রাপ্তি ও গুনাহ মাফের অন্যতম মাধ্যম। সূরা মায়েদায় আল্লাহ ঘোষণা করেছেন— “যদি তোমরা নামাজ কায়েম করো, জাকাত দাও, আমার রাসুলদের প্রতি বিশ্বাস রাখো এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের গুনাহগুলো মিটিয়ে দেব এবং তোমাদের এমন জান্নাতে প্রবেশ করাব যার তলদেশ দিয়ে ঝরনাধারা প্রবাহিত হয়।” (সূরা মায়েদা: ১২)।
সাহাবিদের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ইসলামের স্বর্ণযুগে সাহাবিগণ করযে হাসানার অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছেন। হযরত আবু দারদাহ (রা.)-এর ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। যখন আল্লাহ ঋণ চাইলেন, তখন তিনি রাসূল (সা.)-এর কাছে এসে নিজের দুটি বাগানের একটি (যাতে ৬০০টি ফলন্ত খেজুর গাছ ছিল) আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ বা ঋণ হিসেবে দিয়ে দেন। রাসূল (সা.) তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে করযে হাসানার ভূমিকা অপরিসীম। নিচে এ সম্পর্কে পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হলো-
দারিদ্র্য বিমোচন: এটি বিত্তহীন ও অনগ্রসর মানুষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে অত্যন্ত ইতিবাচক ও সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করে।
আত্মকর্মসংস্থান: প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যবস্থায় ঋণ পাওয়া কঠিন হলেও করযে হাসানা বিনা লাভে সহজ শর্তে বেকারদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।
সুদ নির্মূল: করযে হাসানা সুদের প্রকৃত প্রতিষেধক। সমাজে এর প্রচলন বাড়লে শোষণের ভিত্তি সুদের হার ও প্রভাব কমে যায়।
উৎপাদন বৃদ্ধি: ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিকাশে করযে হাসানা বিনিয়োগ হিসেবে কাজ করে, যা দেশের সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধি করে।
উপসংহার পরিশেষে বলা যায়, করযে হাসানা একটি কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এটি একদিকে মানুষের অভাব দূর করে, অন্যদিকে দাতার জন্য আখেরাতে বিশাল পুরস্কার নিশ্চিত করে। সমাজে করযে হাসানার ব্যাপক প্রচলন ঘটলে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হবে এবং একটি মানবিক সমাজ গঠিত হবে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, যশোর।
তথ্যসূত্র:
১. সূরা বাকারা: ২৪৫
২. সূরা মায়েদাহ: ১২
৩. সূরা হাদীদ: ১১ ও ১৮
৪. সূরা তাগাবুন: ১৭
৫. সূরা মুয্যাম্মিল: ২০।