বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)

বিকল্পজোটে পাল্টা চ্যালেঞ্জ জামায়াতের

❒ বিএনপিভুক্ত হয়ে 'রাজনৈতিক অস্তিত্ব বিসর্জন’ দিয়েছে কয়েকটি ছোট দল

ধ্রুব রিপোর্ট ধ্রুব রিপোর্ট
প্রকাশ : সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর,২০২৫, ০২:৫৬ পিএম
আপডেট : সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর,২০২৫, ১০:১৫ পিএম
বিকল্পজোটে পাল্টা চ্যালেঞ্জ জামায়াতের

ছবি: প্রতীকি

সমকালীন রাজনীতিতে এখন এক নাটকীয় মেরুকরণ দৃশ্যমান। একদিকে রাজপথের প্রধান শক্তি বিএনপি যখন 'একীভূতকরণ' রাজনীতির নামে ছোট ছোট দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে বিলীন করে দিয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের পথে হাঁটছে, ঠিক তখনই পাল্টা চালে দৃশ্যপট বদলে দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। ছোট দলগুলোর স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে তাদের সাথে নিয়ে 'বিকল্প জোট' গঠনের মাধ্যমে জামায়াত এখন বিএনপির একক আধিপত্যের সামনে এক বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে চলছে ছোট দলগুলোর 'রাজনৈতিক অস্তিত্ব বিসর্জন' দিয়ে বড় দলে লীন হওয়ার প্রতিযোগিতা, আর অন্যদিকে জামায়াত নিজেকে আধুনিক ও নির্বাচনমুখী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণে নতুন বার্তা দিচ্ছে। ক্ষমতার এই দ্বিমুখী লড়াইয়ে দেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।"

বিএনপি নিজেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারক দাবি করলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে দলটি ‘একীভূতকরণ’ বা ‘মার্জার’ রাজনীতির মাধ্যমে ছোট দলগুলোর অস্তিত্ব মুছে দিচ্ছে। দলের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম সৈয়দ সিরাজুল হুদার ছেলে এবং বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা গত সপ্তাহে গুলশান কার্যালয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতে ফুল দিয়ে দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এ সময় তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘দেশ এক ক্রান্তিকাল পার করছে। শহীদ জিয়ার আদর্শকে শক্তিশালী করতেই আজ নিজের হাতে গড়া দল বিলুপ্ত করে আমি মূল স্রোতে মিশে গেলাম।’ তবে কর্মীরা মনে করছেন, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে মনোনয়ন নিশ্চিত করতেই তিনি পৈতৃক ঐতিহ্য বিসর্জন দিয়েছেন। একইভাবে বিএলডিপি চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘এই যোগদানে জাতীয়তাবাদী শক্তি আরও সংহত হলো।’ কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এতে একটি নিবন্ধিত দলের অপমৃত্যু ঘটলো।

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন রাজনীতির স্বপ্ন দেখানো নেতারাও এখন বড় দলের ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছেন। গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রাশেদ খান ঝিনাইদহ-৪ আসনে ‘ধানের শীষ’ নিয়ে লড়ার ঘোষণা দিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আন্দোলন ও নির্বাচন—দুই জায়গাতেই আমরা বড় শক্তির ঐক্য চেয়েছিলাম।’ তবে তাঁর এই সিদ্ধান্তে দলটির তরুণ কর্মীরা হতাশ। ঝিনাইদহে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা কাফনের কাপড় পরে বিক্ষোভ করে বলেছেন, ‘বাইরে থেকে আসা কাউকে আমরা মেনে নেব না।’

এই রাজনৈতিক প্রবণতা নিয়ে যশোরের রাজনৈতিক বিশ্লেষক বেনজিন খান বলেন: ‘বিএনপি ছোট দলগুলোকে গিলে খাচ্ছে—এটা যেমন দৃশ্যমান সত্য, তেমনি এই ছোট দলগুলো কেন নিজেদের বিলীন করে দিচ্ছে সেটা বড় প্রশ্ন। এই প্রবণতাটি জনআকাঙ্ক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য রাজনৈতিক বহুত্ববাদ প্রয়োজন, যা এখানে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’

বিএনপি যখন ছোট দল ভাঙিয়ে নিজেদের বড় করতে ব্যস্ত, তখনই জামায়াতে ইসলামী এক বিশাল মাস্টারস্ট্রোক দিয়েছে। গতকাল বিকেলে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান ১০ দলীয় নির্বাচনী জোটের ঘোষণা দেন। এই জোটে এনসিপি এবং কর্নেল (অলি) আহমদের এলডিপির যোগদান বিএনপির জন্য বড় একটি কৌশলগত হোঁচট। যে অলি আহমদ বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন, তাঁর জামায়াত জোটে যাওয়া বিএনপির জন্য নৈতিক পরাজয়ের সমান। ছাত্রনেতাদের দল এনসিপির জামায়াত জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত রাজনীতিতে চমক সৃষ্টি করেছে। 

বড় দুই দলের জোটবদ্ধ হওয়াকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল মজিদ। তিনি মনে করেন এটিকে কেবল 'গ্রাস করা' হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে বড় দল ছোট দলকে গ্রাস করছে—বিষয়টি এভাবে না দেখে রাজনীতির ধারাবাহিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা উচিত। জামায়ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সময়ের পরিক্রমায় দলটির  ভেতরেও অনেক সংস্কার ও পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করেই এলডিপি বা এনসিপির মতো দলগুলো তাদের সাথে জোটবদ্ধ হচ্ছে। তবে এই জোট কতটা সফল হবে, তা ভবিষ্যতই বলে দেবে।’

জামায়াতকে নিয়ে প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে বেনজিন খান আরও একটি গভীর বিশ্লেষণ প্রদান করেন। তিনি মনে করেন, জামায়াত এখন আর কেবল একটি ধর্মীয় দল নয়, বরং বিশ্ব রাজনৈতিক প্রবণতার সাথে তাল মেলাতে সক্ষম একটি আধুনিক শক্তি। তার ভাষ্যমতে, ‘জামায়াত এখন ‘মোর দ্যান আধুনিক’ হয়ে উঠছে। অনেকে তাদের অর্থোডক্স বা রক্ষণশীল ভাবলেও, তারা মূলত তুরস্কের এরদোগানের মডেল অনুসরণ করছে। বিশ্ব রাজনীতিতে পুঁজিবাদীদের যে গণতান্ত্রিক ধারা, জামায়াত ঠিক সেই কক্ষপথেই আছে। পশ্চিমা বিশ্ব ইসলামী মৌলবাদ নিয়ে যতটা সোচ্চার, জামায়াতের মতো নির্বাচনমুখী দলের ক্ষেত্রে তারা তেমন কঠোর হতে পারবে না।’

তিনি আরও যোগ করেন, বিএনপি জামায়াতকে খেলাফতের তকমা দিয়ে পিছিয়ে দিতে চাইলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক মূল্যয়ন একই।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জনীতিতে বড় দলের প্রভাব থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু ছোট দলগুলোর বিলুপ্তি গণতন্ত্রের বহুত্ববাদকে সংকটে ফেলছে। বিএনপি হয়তো দল ভাঙিয়ে বড় হচ্ছে, কিন্তু মিত্র হারানো এবং তৃণমূলের অসন্তোষ তাদের নির্বাচনের ময়দানে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিতে পারে। অন্যদিকে জামায়াতের এই নতুন জোট সমীকরণ আগামীর সংসদীয় রাজনীতিতে এক নতুন ‘কিং মেকার’ সৃষ্টি করতে পারে। 

 

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 225 x 270 Position (2)
Position (2)