❒ জয় ও পলকের মামলা প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর
ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযোগ গঠন পেছানোর আবেদন করেছেন আসামিপক্ষ। এর বিরোধিতা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, নির্বাচন হলে বিচার হবে না, এমন আশা থেকেই আসামিপক্ষ বিচারকাজ বিলম্বিত করতে চাইছে।
গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে শুনানি চলাকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। এই মামলায় আসামিপক্ষের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য আগামী বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
শুরুতেই চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম আসামি জয় ও পলকের বিরুদ্ধে তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে চার্জগঠনের আবেদন জানান। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ আসত জয়ের কাছ থেকে। সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করতেন পলক। তাজুল ইসলাম জানান, দেশের বাইরে থাকলেও সব ধরনের কাজে হস্তক্ষেপ করতেন সজীব ওয়াজেদ জয়। জুলাই আন্দোলনের সময় পলককে তিনিই ইন্টারনেটের গতি কমানোর আদেশ দেন। একইসাথে আন্দোলনকারীদের ওপর বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেন। শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকতে শেখ হাসিনার সরকারকে সহায়তা করেন পলক। এ জন্য জয়ের নির্দেশে বিশ্বের কাছ থেকে গণহত্যার তথ্য আড়াল করতে ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় তার মন্ত্রণালয়। মূলত জয়ের কাছ থেকেই ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত আসত। এ সময় প্রসিকিউশনের পক্ষে ট্রাইব্যুনালে একটি ভিডিও দেখানো হয়। প্রদর্শিত ভিডিওটি জুলাই আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়া পলকের। এতে সাবেক এই আইসিটি প্রতিমন্ত্রীকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা ইন্টারনেট বন্ধ করিনি, বন্ধ হয়ে গেছে’ ভিডিওটি বেশ মনোযোগ দৃষ্টিতে দেখেন কাঠগড়ায় থাকা পলক।
ভিডিও প্রদর্শনের পর সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ পড়েন চিফ প্রসিকিউটর। অভিযোগ নম্বর-১ এ বলা হয়, জয়ের কথামতো ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই রাত ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পরপর তিনটি পোস্ট করে উসকানি দেন পলক। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায় পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র বাহিনী।
চার্জ-২ এ বলা হয়, উভয়ের পরামর্শক্রমে ইন্টারনেট বন্ধ করে মারণাস্ত্র ব্যবহারে উসকানি ও প্ররোচনা দেন জয় ও পলক। একইসাথে হত্যায় সহায়তা করেন। ফলে পুলিশ ও দলীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর হামলায় শহীদ হন রাসেল, মোসলেহ উদ্দিনসহ ২৮ জন।
তিন নম্বর অভিযোগ প্রসঙ্গে তাজুল ইসলাম জানান, উত্তরায় ৩৪ হত্যায় সহায়তা করেন আসামিরা। তাদের উসকানি ও প্ররোচনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলায় ছয় বছরের জাবির ইবরাহিম, সাগর হোসেন, সুজনরা শহীদ হন। শুনানি শেষে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তাদের এসব অপরাধ শাস্তিযোগ্য। আমরা অডিও-ভিডিও প্রমাণ দিয়েছি। অতএব এই দুই আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের প্রার্থনা করছি।
প্রসিকিউশনের শুনানি শেষে পলকের আইনজীবী লিটন আহমেদ বলেন, আদালতের আদেশ থাকা সত্ত্বেও গত ৯ জানুয়ারি কারাগারে ল্যাপটপ ও পেনড্রাইভ নিয়ে আসামির সাথে দেখা করতে দেয়নি কারা কর্তৃপক্ষ। ফলে মামলার ডিজিটাল এভিডেন্স নিয়ে তারা কাজ করতে পারেননি। এই কারণ দেখিয়ে তারা আগামী ১৮ জানুয়ারি শুনানির তারিখ ধার্য করার আবেদন করেন।
আসামিপক্ষের এই সময় চাওয়ার তীব্র বিরোধিতা করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘ওনারা বিচারকাজকে বিলম্ব করতে চাইছেন। ওনারা আশায় আছেন ইলেকশন (নির্বাচন) হলে বিচার-টিচার হবে না। এ জন্যই এত কিছু।’
তার এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনালের প্রথম সদস্য বিচারপতি শফিউল আলম প্রসিকিউটরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘ইলেকশন হলে কি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে? এমন বইলেন না, এমন বইলেন না।’ এক পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউটরকে এ ধরনের রাজনৈতিক মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতে বলেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী লিটন আহমেদ অভিযোগ করেন, প্রসিকিউশন থেকে দেয়া ১০টি ভিডিওর মধ্যে ছয়টি তারা ওপেন করতে পারছেন না। জবাবে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘আপনারা বুঝে নেননি কেন? প্রসিকিউশনের সামনে সবকিছু দেখে নিতে পারতেন।’
চিফ প্রসিকিউটর পাল্টা দাবি করেন, তাদের এখানে সব ভিডিও ওপেন হচ্ছে, আসামিপক্ষের ডিভাইসে সমস্যা থাকতে পারে। এ সময় আদালত আসামিপক্ষকে আজই (রোবাবর) ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় দুই ঘণ্টা সময় নিয়ে প্রিভিলেজ কমিউনিকেশন ও ভিডিও যাচাইয়ের সুযোগ দিতে চান। কিন্তু আসামিপক্ষ তাদের আগামী রোববারের আবেদনে অটল থাকে।
আসামিপক্ষ লম্বা সময় চাইলেও ট্রাইব্যুনাল তা নাকচ করে দেন। ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সময় পাবেন। বৃহস্পতিবারই শুনানি করবেন।’ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ডিভাইসের সমস্যা থাকলে তা আজই সমাধান করে নিয়ে নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী শুনানিতে অংশ নিতে হবে।
ট্রাইব্যুনাল গত বছরের ৪ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের জমা দেয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছিল এবং ১০ ডিসেম্বর জয়কে আত্মসমর্পণের জন্য দু’টি জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছিল।
এ বিষয়ে ব্রিফিংয়ে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মামলায় চার্জ গঠনের উপরে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে শুনানি সম্পন্ন হয়েছে। এই মামলায় দু’জন আসামি। একজন হলেন সজীব ওয়াজেদ জয় এবং আরেকজন হলেন জুনাইদ আহমেদ পলক। সজীব ওয়াজেদ জয় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা ছিলেন এবং জুনাইদ আহমেদ পলক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তৎকালীন সরকারের দায়িত্ব পালন করেছেন।’
‘আমরা চার্জ গঠনের শুনানিতে বলেছি যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে সরকার পরিকল্পিতভাবে ইন্টারনেট সেবা প্রথমে স্লো করে দিয়ে এবং পরবর্তীতে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়ে এই আন্দোলনে যারা ছাত্র-জনতা নিরীহ-নিরস্ত্রভাবে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছিল, তাদের উপরে মানবতাবিরোধী অপরাধ পরিচালনা করেছে; এবং সেই তথ্য দেশে এবং দেশের বাইরে যেন মানুষ জানতে না পারে, সেই জন্য পরিকল্পিতভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘আন্দোলনকারীরা যেন পরস্পর যোগাযোগ করতে না পারে, সেজন্য এই ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে। এর প্রমাণ হিসেবে আমরা এই আসামিদের নিজস্ব কথোপকথন ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছি; যেটি সরকারি প্রতিষ্ঠান এনটিএমসি কর্তৃক রেকর্ড করা হয়েছিল। ‘যেটি তৎকালীন সরকার রেকর্ড করতেন তাদের প্রয়োজনে, কিন্তু আজকে তাদের রেকর্ড করা ডকুমেন্ট আমরা হাতে পেয়েছি এবং ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছি।’
কথোপকথনের বরাতে তামিম বলেন, ‘পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে যে, জুনাইদ আহমেদ পলক তৎকালীন একজন প্রভাবশালী অ্যাডভাইজারের সাথে মোবাইলফোনে কথোপকথন করছেন। কথোপকথনে বলছেন যে, আটটি অ্যাপস অর্থাৎ অ্যাপ্লিকেশনস চিহ্নিত করা হয়েছে, যেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত করা হয় এবং আটটি বন্ধ করে দেয়ার ডিসিশন হয়েছে এবং এই ব্যাপারে উনারা আইসিটি অ্যাডভাইজার অর্থাৎ এই মামলার অন্যতম আসামি সজীব ওয়াজেদ জয় সাহেবের সাথে কথা বলেছেন।
‘এই কথোপকথন থেকেই দেখা যায় যে, উনারা পরিকল্পিতভাবে বন্ধ করেছিলেন। তার পরও আমরা তদন্তকালে এমন কিছু সরকারি নথি-উপাত্ত পেয়েছি, যাতে পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে যে- তারা এই সময়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে যাচাই-বাছাই করে যে, কোন কোন অ্যাপস বন্ধ করলে তাদের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ থাকবে, মানুষ এগুলা জানতে পারবে না, সেগুলো পরিকল্পিতভাবে আটটি অ্যাপস তারা বন্ধ করেছিল। অতএব, আমরা এটি ট্রাইব্যুনালকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি যে, এই আসামিদের সম্পৃক্ততায়, ষড়যন্ত্রে এবং পরিকল্পনায় ইন্টারনেট বন্ধ হয়েছে।’