Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

নজরুলের সাংবাদিকতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার শাণিত অস্ত্র

তহীদ মনি তহীদ মনি
প্রকাশ : সোমবার, ২৬ অক্টোবর,২০২৬, ১১:৩৬ পিএম
নজরুলের সাংবাদিকতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার শাণিত অস্ত্র

ছবি: এআই প্রণীত

“ওই ধূমকেতু আর উল্কাতে চায় সৃষ্টিটাকে উল্টাতে” — কবি কাজী নজরুল ইসলাম

কবি কাজী নজরুল ইসলামকে শুধু প্রেমের কবি, বিদ্রোহী কবি, সাম্যবাদের কবি, গজলতের স্রষ্টা, কালী ভঞ্জনার কবি—যত নামেই অভিহিত করে আলোচনা করা হোক না কেন, এ সবের মধ্যেও যে তিনি একজন সাংবাদিক, সেটা্ও জানা জরুরি। তাঁর সাংবাদিকতার কলমে ভীত হয়েছিল ব্রিটিশ রাজশক্তি। তাঁকে দিয়েছিল জেলে। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল তাঁর কাগজ-কবিতা। তিনি ছিলেন স্বাধীনতা আকাঙ্ক্ষী, রাজশক্তি তাঁকে দিয়েছে শৃঙ্খল। তিনি তা ভাঙতে কলম ধরেছেন তাঁর সাহিত্যে, তাঁর সাংবাদিকতায়। বর্তমান বছর সরকার ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাই নজরুলকে শুধু কবি হিসেবে জানলে হবে না, তাঁর সামগ্রিক দিক জানা এবং সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে যাওয়ার মাধ্যমেই সরকারের নজরুল বর্ষ পালনের সার্থকতা এনে দেবে।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ভারতর্বষ যখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খলে বন্দি, যখন রাজনৈতিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ক্রমান্বয়ে তীব্র হয়ে উঠছিল, শাসকের দমননীতির বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী মানুষের আত্মত্যাগ—এই সংঘাতের মধ্যেই নজরুলের আবির্ভাব। তিনি ছিলেন বিদ্রোহের ভাষ্যকার, শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর এবং ঔপনিবেশিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে এক আপসহীন সাংবাদিক। নজরুলের সাংবাদিকতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল, তিনি স্বাধীনতাকে শুধু শাসক পরিবর্তনের বিষয় হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে স্বাধীনতার অর্থ ছিল মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, শোষণ থেকে মুক্তি এবং সাম্প্রদায়িক বিভেদ অতিক্রম করে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণ।

তাঁর সৃষ্ট ‘নবযুগ’ তাঁকে সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে; ‘ধূমকেতু’ তাঁকে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে উচ্চকণ্ঠ করেছে; ‘লাঙল’ তাঁকে কৃষক-শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ‘আনন্দময়ীর আগমন’ তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, আর ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ তাঁর নৈতিক সাহসকে ইতিহাসে স্থায়ী আসন দিয়েছে।

‘নবযুগ’, ‘ধূমকেতু’, ‘লাঙল’—তাঁর পত্রিকা; ‘আনন্দময়ীর আগমন’—কবিতা; ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’—আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দেওয়া নজরুলের বক্তব্য।

নজরুলের সাংবাদিকতার বিশেষত্ব ছিল, তিনি শুধু শাসকের অন্যায়ের বিবরণ দিতেন না; শাসকের নৈতিক বৈধতা, শোষণের কাঠামো এবং পরাধীনতার মানসিকতাকেও প্রশ্নবদ্ধ করতেন। তাঁর কাছে সংবাদপত্র নিছক সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম ছিল না, ছিল জনগণকে জাগিয়ে তোলার মঞ্চ। তাঁর সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’, ‘লাঙল’ এবং ‘নবযুগ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত লেখলেখি ও সম্পাদকীয় কর্মকাণ্ড বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে প্রতিবাদী সাংবাদিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত। ‘নবযুগ’-এর লেখলেখিতে এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। পত্রিকাটি ব্রিটিশ সরকারের নজরে আসে; এর একটি সংখ্যার সব কপি বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং এক হাজার টাকা জামানত বাজেয়াপ্ত করার ঘটনাও নজরুলের সাংবাদিকতার ওপর ঔপনিবেশিক চাপের প্রমাণ হিসেবে আলোচিত।

সাংবাদিক হিসেবে কাজী নজরুল ইসলামের কলমে যেসব শব্দ, যুক্তি, ব্যঙ্গ, রাজনৈতিক ঘোষণা ও স্বাধীনতার আহ্বান ছিল, তা ঔপনিবেশিক শাসকদের উদ্বিগ্ন করে তুলছিল। নজরুলের লেখার পাশাপাশি সে সময় ব্রিটিশ সরকারের সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ, মামলা, বাজেয়াপ্তকরণ ও কারাবাসের ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে নজরুলের কলমের ভীতি কীভাবে রাজশক্ত্রিকে কাপিয়ে দিয়েছিল তা বোঝায় যায়।

কবি কাজী নজরুলের সাংবাদিকতার ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় ‘ধূমকেতু’। ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট পত্রিকাটির প্রকাশনা শুরু হয়। এটি ছিল একটি অর্ধসাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা, যার সম্পাদক ছিলেন নজরুল ইসলাম। ‘ধূমকেতু’ নামটির মধ্যেই ছিল প্রচলিত ব্যবস্থাকে আলোড়িত করার ইঙ্গিত। ওই পত্রিকার ঘোষণাতেই ছিল ‘সপ্তাহে দুই বার করিয়া বাহির হইবে’। বার্ষিক মূল্য ৫ টাকা। সম্পাদক কাজী নজরুল ইসলাম।

ধূমকেতু শুধু সাহিত্যচর্চার পত্রিকা ছিল না; এটি ছিল রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও জাতীয় মুক্তির দাবিতে সোচ্চার একটি মাধ্যম। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পত্রিকাটির সূচনাকে স্বাগত জানিয়ে আশীর্বাণী পাঠিয়েছিলেন। পত্রিকাটিতে নজরুলের কবিতা, সম্পাদকীয়, রাজনৈতিক প্রবন্ধ ও ব্যঙ্গরচনা প্রকাশিত হতো। এসব লেখায় তিনি ব্রিটিশ শাসনের অন্যায়, রাজনৈতিক দাসত্ব এবং ভীরু আপসকামিতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ঔপনিবেশিক ভারতের রাজনৈতিক পরিবেশে হিন্দু-মুসলমানদের সম্পর্ক ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছিল। ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার প্রবণতাও বাড়ছিল। নজরুল এই বিভাজনকে মুক্তির পথ হিসেবে দেখেননি। তাঁর সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য, মানুষের সমান মর্যাদা এবং ধর্মের ঊর্ধ্বে মানবিক সম্পর্কের গুরুত্ব বারবার প্রকাশ পেয়েছে। ‘ধূমকেতু’-তেও বিভিন্ন ধর্মীয় পটভূমির লেখক ও নারী লেখকদের অংশগ্রহণ ছিল।

কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি নন; তিনি ছিলেন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন এক সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও জনজাগরণের অগ্রদূত। তাঁর কবিতার মতো তাঁর সাংবাদিকতার কলমও ছিল তীক্ষ্ণ, ক্ষুরধার ও দুর্নিবার। সেই কলমে উচ্চারিত হয়েছে পরাধীন মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, শোষিতের অধিকার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সাম্যের বাণী এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর আহ্বান। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন যখন ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও বাক্‌স্বাধীনতা সংকুচিত করে রেখেছিল, তখন নজরুল তাঁর লেখনিকে পরিণত করেছিলেন প্রতিবাদের শাণিত অস্ত্রে।

বস্তুত: কাজী নজরুল ইসলামের সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটে এমন সময়ে, যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ভারতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলন ব্রিটিশবিরোধী জনমতকে ক্রমশ শক্তিশালী করছিল।

১৯২০ সালে তিনি ‘নবযুগ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। নজরুলের সাংবাদিকতায় উঠে আসে শ্রমজীবী মানুষের দুর্দশা, অস্পৃশ্যতা, জাতিগত বৈষম্য, ধর্মীয় বিভেদ এবং সমাজে ক্ষমতার অসম বণ্টনের প্রশ্ন। এ সময় তিনি বুঝেছিলেন যে, রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে হলে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক শোষণ ও সামাজিক অবমাননার শিকার বন্ধ করতে হবে।

তরুণ কবি নজরুলের সাংবাদিকতার সবচেয়ে বিপ্লবী ঘোষণা ছিল পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি। তখন ভারতীয় রাজনীতির বিভিন্ন অংশে স্বরাজ, সাংবিধানিক সংস্কার ও সীমিত স্বায়ত্তশাসন নিয়ে আলোচনা চলছিল। কিন্তু নজরুলের অবস্থান ছিল আরও স্পষ্ট।

ধূমকেতু-র ১৯২২ সালের ১৩ অক্টোবর সংখ্যায় প্রকাশিত তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি। তিনি বিদেশি শাসনের অধীনে কোনো ধরনের পরাধীনতাকেই চূড়ান্ত মুক্তি বলে মানতে রাজি ছিলেন না কখনো।

নজরুল স্বাধীনতার দাবিকে কেবল সভা-সমাবেশের বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে খবরের পাতার তা প্রকাশ্যে উচ্চারণ করছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের চোখে এমন লেখা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

ধূমকেতুর পূজা সংখ্যায় ১৯২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয় নজরুলের বিখ্যাত কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনী’। এই কবিতা তাঁর সাংবাদিকতাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। দুর্গাপূজার সাংস্কৃতিক ও পৌরাণিক আবহকে অবলম্বন করে তিনি মাতৃশক্তির জাগরণ, অত্যাচারীর পতন এবং পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক ভাষা দেন। তখন ঔপনিবেশিক শাসক এই প্রতীকী ভাষার রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে ভুল হয়নি। ফলে কবিতাটি প্রকাশের পর ব্রিটিশ সরকার ধূমকেতুর সংশ্লিষ্ট সংখ্যা নিষিদ্ধ করে এবং পত্রিকার কার্যালয়ে পুলিশি তল্লাশি চালায়।

তাঁর জীবনীতে রয়েছে, ১৯২২ সালের নভেম্বরে নজরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়। ১৯২৩ সালের জানুয়ারিতে বিচারের পর তাঁকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে ব্রিটিশ রাজশক্তি তথা ঔপনিবেশিক প্রশাসন তাঁর লেখাকে নিছক সাহিত্যিক আবেগ হিসেবে বিবেচনা করেনি। তাঁর লেখাকে রাজনৈতিক গুরুত্ব হিসেবেই বিবেচনা করছিল তৎকালীন প্রশাসন।

ওই কবিতায় কবি নজরুল হিন্দু পুরাণের প্রতীক ব্যবহার করে ব্রিটিশবিরোধী চেতনা প্রকাশ করছেন, কিন্তু তাঁর বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক আদর্শ ছিল সাম্প্রদায়িক বিভেদ অতিক্রম করা। অর্থাৎ, তিনি ধর্মীয় সংস্কৃতিকে মানুষের মুক্তির ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছেন।

ব্রিটিশ সরকার সামরিক শক্তি, প্রশাসন, পুলিশ ও আদালতের অধিকারী ছিল। তার বিপরীতে নজরুলের হাতে ছিল কাগজ, কলম ও ভাষা। তবুও সেই কলমের বিরুদ্ধে মামলা, পত্রিকা নিষিদ্ধকরণ এবং লেখককে কারাবন্দি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এই প্রতিক্রিয়া থেকেই বোঝা যায়, শাসকের কাছে সাংবাদিক নজরুল কতটা ভয়ের, স্বাধীনতার ভাষা কতটা অস্বস্তিকর।

তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা তাঁর জীবনের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। কিন্তু এই মামলায় তিনি শুধু অভিযুক্ত লেখক ছিলেন না; তিনি ঔপনিবেশিক বিচারব্যবস্থার সামনে সত্য উচ্চারণকারী এক প্রতিবাদী কণ্ঠ।

আদালতে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে বাংলা সাহিত্যে এক বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। এই বক্তব্যে নজরুল সত্যকে প্রকাশ করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ভাষা দেওয়ার কাজটিই করছিলেন।

নজরুলকে ১৯২৩ সালের জানুয়ারিতে এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাগার তাঁর স্বাধীনচেতা মানসিকতাকে দমাতে পারেনি। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন এবং নজরুলের কারাবাসের সময় তাঁর উদ্দেশ্যে ‘বসন্ত’ নাট্যকাব্য উৎসর্গ করেন।

নজরুল ছিলেন এমন একজন সাংবাদিক, যিনি স্বাধীনতার প্রশ্নকে ধর্ম, শ্রেণি ও সামাজিক পরিচয়ের সংকীর্ণ সীমা অতিক্রম করে মানুষের সর্বজনীন অধিকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত করছিলেন।

ব্রিটিশ রাজশক্তি কেন নজরুলের লেখনীতে উদ্বিগ্ন হয়েছিল সে বিষয়ে সংক্ষেপে কয়েকটি দিক তুলে ধরা যেতে পারে—

তিনিই প্রথম পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি প্রকাশ্যে উচ্চারণ করছিলেন। শাসকের দয়ার ওপর নির্ভর না করে তিনি পরাধীনতার অবসান চেয়েছিলেন।

কঠিন রাজনৈতিক তত্ত্বকে তিনি কবিতা, ব্যঙ্গ ও সম্পাদকীয়র মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে জনমানসে আলোড়ন তুলেছিলেন।

তাঁর সাংবাদিকতা সাহিত্য ও রাজনীতির মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতু তৈরি করছিল। তাই তাঁর লেখা শুধু শিক্ষিত পাঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত না; তা বৃহত্তর জনজাগরণের অংশ হয়ে উঠছিল।

তিনি সামাজিক বৈষম্য, শ্রমিকের অধিকার এবং সাম্প্রদায়িক বিভেদের বিরুদ্ধে কথা বলে ঔপনিবেশিক শাসনের পাশাপাশি সমাজের প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোকেও প্রশ্ন করছিলেন।

রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখেও নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেননি। গ্রেপ্তার, কারাবাস এবং অনশনের ঘটনাগুলো তাঁর প্রতিবাদী অবস্থানকে আরও ইস্পাতকঠিন অবস্থার পরিচয় তুলে ধরে। ফলে তাঁর কলম, তাঁর অবস্থান, তাঁর কবিতা ও বাণী শাসকের আতঙ্ক তৈরি করে।

এমন কিছু মানুষ আছেন ইতিহাসের পাতায় যাঁদের কণ্ঠ স্তব্ধ করার জন্য শাসককে কারাগারের দরজা খুলতে হয়, সংবাদপত্র বন্ধ করতে হয়, বই বাজেয়াপ্ত করতে হয়, কাজী নজরুল ইসলাম তার উত্তম দৃষ্টান্ত। তিনি তাঁর কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও সাংবাদিকতা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তি কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন।

তবে নজরুলের প্রতিবাদ শুধু খবরের পাতায় কিংবা আদালতেও বক্তব্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কারাগারে রাজনৈতিক বন্দিদের প্রতি আচরণের প্রতিবাদেও তিনি দৃঢ় অবস্থান নেন। ১৯২৩ সালের এপ্রিল মাসে তিনি অনশন শুরু করেন। কারাগারে বন্দিদের সঙ্গে আচরণ, বিশেষ করে রাজনৈতিক বন্দির মর্যাদার প্রশ্নে তাঁর এই অনশন ছিল প্রতিবাদের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।

অনশনটি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সমকালীন সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুলকে অনশন ভাঙার আহ্বান জানিয়েছিলেন বলেও ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। অবশেষে নজরুল অনশন ভাঙেন। বছরের শেষদিকে তিনি কারাগার থেকেও মুক্তি পান। সহজ কথায় ব্রিটিশ শক্তি তাঁকে আটকে রেখে স্বস্তিতে ছিল না, তাঁর বই, তাঁর সংবাদপত্র বাজেয়াপ্ত করেও তাঁকে টলাতে পারেনি বরং জন বিস্ফোরণ ঘটছে বারবার। আদালতেও তাঁর বক্তব্য চাবুক হেনেছে ঔপনিবেশিক শক্তিকে।

নজরুলের সাংবাদিকতাকে শুধু ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর চিন্তার পূর্ণতা বোঝা যায় না। তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল শ্রেণিবৈষম্য ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান।

১৯২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয় ‘লাঙল’ পত্রিকা। এটি শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ দলের আদর্শের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং শ্রমজীবী মানুষের দাবি-দাওয়াকে গুরুত্ব দিত। নজরুল এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পত্রিকাটি কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার, সামাজিক মর্যাদা এবং শোষণমুক্ত জীবনপিপাসাকে সামনে নিয়ে আসে। তিনি শুধু দেশের শাসনভার দেশীয় মানুষের হাতে তুলে দেওয়ার কথাই বলেননি; তিনি প্রশ্ন তুলছেন, স্বাধীন দেশে মানুষের পেটে খাবার থাকবে কি না, শ্রমের ন্যায্য মূল্য মিলবে কি না, সামাজিক বৈষম্য দূর হবে কি না। এখানেই তাঁর সাংবাদিকতা প্রচলিত জাতীয়তাবাদী বক্তব্য থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য উন্মোচন করে সবার সামনে। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হলেও যদি সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি, অধিকারহীনতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার হয়, তাহলে নজরুলের সাম্যবাদী ও মানবতাবাদী সাংবাদিকতা আমাদের তখন শাসকের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করতে উদ্বুদ্ধ করবে। তাঁর সাংবাদিকতা ছিল একই সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী এবং মানবমুক্তির পক্ষে।

অবশ্য এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, ব্রিটিশ সরকার শুধু নজরুলের লেখার কারণেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছিল—এমন কথা পুরোপুরি সত্য নয়, কারণ ভারত জুড়ে বহু রাজনৈতিক আন্দোলন, বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ও জাতীয়তাবাদী প্রচেষ্টা ব্রিটিশ শাসনের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছিল। কিন্তু নজরুলের কলম সেই শক্তির ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং তার সাংবাদিকতা ও কবিতা দুটোই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অনেকাংশের রসদ হয়েছিল। তিনি সেই বৃহত্তর সংগ্রামে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যকে এমনভাবে যুক্ত করেছিলেন, যা তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় দমনমূলক পদক্ষেপের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।

কাজী নজরুল ইসলামেস সাংবাদিকতাজীবন প্রমাণ করে, খবরের শক্তির শুধু সংবাদ পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তা অন্যায়ের মুখোশ উন্মোচন করতে পারে, জনগণকে সচেতন করতে পারে, স্বাধীনতার স্বপ্নকে ভাষা দিতে পারে এবং ক্ষমতাবান শাসককে নিজের নীতি ও আচরণ নিয়ে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। ব্রিটিশ রাজশক্তি নজরুলের শরীরকে কারাগারে আবদ্ধ করতে পেরেছে, তাঁর পত্রিকার সংখ্যা নিষিদ্ধ করতে পেরেছে, তাঁর প্রকাশের ওপর বাধা সৃষ্টি করতে পেরেছে। কিন্তু তাঁর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, মানবমুক্তির দর্শন এবং প্রতিবাদী চেতনাকে মুছে ফেলতে পারেনি। সাম্রাজ্য টিকে থাকে শক্তির ওপর, কিন্তু মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বেঁচে থাকে আদর্শের ওপর যা নজরুল তাঁর লেখায় বারবার তুলে এনেছেন।

আজকের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও নজরুলের জীবন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনে দেয়, সাংবাদিক কি কেবল ক্ষমতাবানদের বক্তব্য প্রচার করবেন, নাকি ক্ষমতার অপব্যবহার, সামাজিক অন্যায় ও গণমানুষের অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে সত্য উচ্চারণ করবেন? সাংবাদিকতার প্রকৃত মর্যাদা নির্ভর করে তার সাহস, সততা, স্বাধীন চিন্তা এবং জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতার ওপর। সেই অর্থে নজরুল শুধু ব্রিটিশবিরোধী সাংবাদিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন স্বাধীন সাংবাদিকতার নৈতিক আদর্শেরও এক পথকৃৎ।

সাংবাদিক কাজী নজরুলের কলমে যুগ যুগ ধরে লালিত ভারত বর্ষের মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আগুনের ভাষা দিয়েছিল। কাঁপিয়ে দিয়েছিল রাজদণ্ডকে। তাঁর সাংবাদিকতার উত্তরাধিকারী হতে আজও তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী উচ্চারণ জোরালো দাবি রাখে—শক্তি জোগায় শাসকের চোখে চোখ রেখে কথা বলায়।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)