❒ বাউল চিন্তা ও ইসলাম-১
ড. জামিল মাসরুর
বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বাউল মতবাদ এক অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং স্বতন্ত্র ধারার প্রতিনিধিত্ব করে। এই মতবাদ জাতি-ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের প্রতি মানবিকতা এবং অভ্যন্তরীণ সাধনার উপর জোর দেওয়ায় সমাজের এক বিশাল অংশের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাউলরা ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং শাস্ত্রীয় অনুশাসনের বেড়া ভাঙার কথা ঘোষণা করেছে । তবে, বাউল মতবাদের এই সমন্বয়বাদীতা এবং জনপ্রিয়তার আড়ালে এর দার্শনিক ভিত্তি ও গুহ্য সাধনা পদ্ধতিগুলো মূলধারার ইসলামি শরিয়তের মৌলিক আকিদা (বিশ্বাস) এবং নৈতিক কাঠামোর সঙ্গে গুরুতর আদর্শগত সংঘাত তৈরি করে।
এই প্রতিবেদনটির লক্ষ্য হলো বাউলতত্ত্বের কেন্দ্রীয় ধারণা, বিশেষত এর দেহতত্ত্ব, গুরুবাদ ও যুগল সাধনার পদ্ধতিগত ও ধর্মতাত্ত্বিক গলদ বা মৌলিক ত্রুটিগুলির কঠোর কিন্তু বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনা করা। এর পাশাপাশি, ইসলাম ধর্ম মানবদেহ, রূহ এবং নফসকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করে এবং আত্মশুদ্ধির (তাজকিয়াতুন নফস) জন্য শরিয়ত-সম্মত যে পথ নির্দেশ করে, তার একটি বিশদ তুলনামূলক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হবে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সংঘাত কেবল বাহ্যিক আচার-আচরণের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি স্রষ্টা, সৃষ্টি ও সাধনার প্রকৃতি সম্পর্কিত মৌলিক মেটাফিজিক্যাল ধারণার উপর নির্ভরশীল। বাউলদের সাম্যের আদর্শ সামাজিক দিক থেকে গ্রহণযোগ্য হলেও, তাদের ঈশ্বর-ধারণা ও নবী-ধারণা ইসলামের প্রধান স্তম্ভ—তাওহীদ (একত্ববাদ) ও রিসালাত (নবুয়ত)—কে সরাসরি বাতিল করে দেয়।
বাউল মতবাদের ঐতিহাসিক পটভূমি ও সমন্বয়বাদী উৎস
বাউল দর্শন প্রাচীন ভারতের নানা ধর্মবিশ্বাস, রীতিনীতি এবং লোকায়ত ধারার সংমিশ্রণে সৃষ্ট । গবেষকদের ধারণা, এই মতবাদ তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম (সহজযান), বৈষ্ণব সহজিয়া এবং সূফীবাদের ফলশ্রুতি । বাউল শব্দটির উৎপত্তি নিয়েও মতভেদ রয়েছে; কেউ কেউ সংস্কৃত 'বায়ু' (শ্বাস-নিয়ন্ত্রণ ক্রিয়া) অথবা 'বাতুল' (পাগল) শব্দ থেকে এর উৎপত্তি মনে করেন, আবার অনেকে আরবি 'আউলিয়া' (অলী)-এর বহুবচন 'আউল' থেকে এর যোগসূত্র খুঁজে পান । এই একাধিক উৎসের প্রভাব বাউলদের সমন্বয়বাদী চরিত্রের পরিচয় দেয়।
বাউল দর্শনের উপর সহজিয়া মতের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। নিত্যানন্দের পুত্র বীরচন্দ্র যখন সহজিয়া নেড়া-নেড়ীদের বৈষ্ণব সমাজের অন্তর্ভুক্ত করেন, তখন বৈষ্ণব সহজিয়া মতবাদ গড়ে ওঠে, যদিও গোঁড়াপন্থী গৌড়ীয় বৈষ্ণবরা এর তীব্র নিন্দা করেছিলেন । এই সহজিয়া সাহিত্য দেহসাধনার প্রতীকি ব্যঞ্জনা, রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার শারীরিক ব্যাখ্যা এবং গূঢ় তত্ত্বকে সহজ ভাষায় উপস্থাপনের উপর জোর দেয় ।
সামাজিক প্রেক্ষাপটে, বাউলরা ছিল প্রচলিত কাঠামোর প্রতিভূ। আর্যদের দ্বারা সৃষ্ট জাত প্রথা এবং এমনকি মুসলমান সমাজে সৈয়দ-শেখের মতো মর্যাদা নিয়ে আসা নতুন বৈষম্যের বিরুদ্ধে তারা মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার বার্তা নিয়ে আসে । বাউলরা জাত-বর্ণে বিভক্ত করে মানুষকে না দেখে, তাকে মানুষ হিসাবেই দেখতে চেয়েছিল—যেমন লালন শাহ আক্ষেপ করেছেন: "সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে, লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে" ।
বাউলদের দেহ-দর্শন: 'কায়া' বা 'দেউল'-এ 'মনের মানুষ'-এর সন্ধান
বাউল সাধনার কেন্দ্রীয় ভিত্তি হলো দেহতত্ত্ব। বাউলরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, পরম সত্তা এই মানব দেহের (কায়া) মধ্যেই বিরাজমান। এই কারণেই দেহকে মসজিদ বা দেউলের সঙ্গে তুলনা করা হয়। দাদু’র উক্তি—"য়হু মসিত য়হু দেহুরা সৎ গুরু দিয়া দিখাই। ভীতর সেরা বন্দগী বাহরি কাহে জাই" —এই ধারণাকেই প্রতিষ্ঠিত করে যে, দেহের অভ্যন্তরে যখন সব আছে, তখন বাইরে তাকে অন্বেষণ বৃথা। লালন ফকির তার বিখ্যাত গানে এই আক্ষেপই করেছেন: "আমি একদিনও না দেখিলাম তারে, আমার বাড়ির কাছে আরশী নগর এক পড়শী বসত করে" ।
দেহকে আশ্রয় করে এই দেহাতীতের সাধনা বাউল সাধনায় উল্টাপথ বা উজান বাওয়া নামে পরিচিত । ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত ব্যাখ্যা করেছেন, অধ্যাত্ম সাধনা সর্বদা উল্টাসাধনা—বাহির থেকে ভিতরের দিকে প্রত্যাবর্তন, স্থূল থেকে সূক্ষ্মে, মৃত্যু থেকে অমৃতে যাওয়া । এই সাধনার মাধ্যমে রূপের মধ্যে স্বরূপকে অন্বেষণ করা হয় । এই রূপ-স্বরূপের তত্ত্বজ্ঞান লাভ হলে দেহী আর দেহাতীতের মধ্যে কোনো দ্বৈত্বভাব থাকে না । সহজিয়া সাধনায় যখন এই রূপে স্বরূপ বোধ জন্মায় না, তখন সাধনার শুরুতে আরোপ-সাধনা বা আরোপ-তত্ত্ব-এর আশ্রয় নিতে হয়। সহজিয়া বৈষ্ণব সাধক-সাধিকারা যুগলসাধনায় অংশ নিতে নিজেদের মধ্যে রাধা ও কৃষ্ণভাব আরোপ করেন । (চলবে)
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক
দ্বিতীয় পর্বের লিংক-বাউল চিন্তা ও ইসলাম-২ বাউলের প্রধান গলদসমূহ–দেহতত্ত্ব ও শরিয়ত বিরোধিতা