মাসুম বিল্লাহ
❒ বাউল স্কেচ ছবি:
বাংলাদেশে লোকগানের ইতিহাসে বাউলদের অবস্থান নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের গান, তাদের দর্শন, তাদের সাদামাটা জীবনযাপন এ দেশের সংস্কৃতিকে দীর্ঘদিন ধরে সমৃদ্ধ করেছে। এই পরিমিত জীবনযাপনই মানুষকে বাউল সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট করেছে। তাদের ভক্তিময় কণ্ঠে যখন দয়াল নবীজি সম্পর্কে গান গাওয়া হয়েছে, তখন মানুষ বাহবা দিয়েছে। আধ্যাত্মিকতা, ভালোবাসা ও মানবতার বার্তা সুরের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।
কিন্তু আজ বাউলের পোশাক পরে এক শ্রেণির ভণ্ড গুরু বের হয়েছে। যাদের নেই কোনো সুর, নেই কোনো আধ্যাত্মিকতা, নেই কোনো সাধনা। তাদের আছে অদ্ভুত তত্ত্ব—কোরআন-হাদিসের বিকৃত ব্যাখ্যা, যা শুনলে যে কোনো মুসলমানের হৃদয় রক্তক্ষরণ করবে। তারা বলে, গাঁজা ছাড়া বাউল হওয়া অসম্ভব। সাধারণ মানুষ ভাবে তারা ধ্যান করছে, আসলে তখন তারা নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে।
এই বাউলদের কিছু বিশেষ অভ্যাস আছে—
ধর্মের বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও ধর্মীয় ব্যাখ্যা করা; কোরআনের আয়াত বিকৃত করা; তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সাথে কোরআনকে অবমাননা করা; মহান আল্লাহ তায়ালাকে নিয়ে কটূক্তি করা; নবী-রাসুলদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা। কোরআনের আয়াত সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করলে তারা দার্শনিক ভঙ্গিতে বলে, “কোরআন দিয়ে কি হবে? সবকিছু হবে গুরুর দয়ায়।” আর যখন জিজ্ঞাসা করা হয়—“গুরু কোথায়?” তখন তারা চোখ বুজে উত্তর দেয়—“গুরু দেহের ভিতর থাকে।” তাদের দেহতত্ত্বের ব্যাখ্যা শুনলে মনে হয় রাতভর নেশা করার পর বকুনি।
এই বাউলদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তারা সবসময় বলে—“আমরা শরীয়তি নই, আমরা মারফতি।” (মারেফত শব্দের আভিধানিক অর্থ—পরিচয় লাভ করা; অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার পরিচয় ও সৃষ্টিকৌশল সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা রাখে।) তারা দাবি করে, “আমরা আল্লাহ-রাসুলকে বাইরে খুঁজি না, তাঁরা আমাদের ভেতরেই আছেন।” কিন্তু তাদের ভেতরে খুঁজতে গেলে পাওয়া যায় গাঁজা, ফেনসিডিল আর বিড়ি। মাঝারি স্তরের বাউলদের কাছে চুলাই মদের বোতলও মেলে। আর যারা বলে তাদের ‘মারেফত হাসিল’ হয়ে গেছে, তারা হয়ে যায় আরেক গ্রেডের গুরু—দেহতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করতে করতে নাকি তারা মহান গবেষক! অভিযোগ আছে—তারা বিশেষভাবে নারীদের দেহ নিয়েই গবেষণা করে।
প্রতিবেদনের বাস্তব ছবি দেখা যায় রাতে। সত্যিকার বাউল যখন কোনো মাটির ঘরে বসে সুর তোলে— “মনরে কৃষ্ণকলি…” —তখন ভণ্ড বাউলরা নেশার ঘোরে ঘুরে বেড়ায় কোথায় আলো নেভে, কোথায় নতুন দেহতত্ত্বের ক্লাস নেওয়া যায়— সেটাই খোঁজে। যেন তারা মানবতার গুরু নয়, বরং কার ঘরে যাওয়া যায় সে বিষয়ের গুরু!
এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার কোরআন ও ইসলামের গভীর বিষয়গুলো এমনভাবে বিকৃত করে যে তা একসময় রসিকতার পর্যায়ে পড়ে। যেমন—একজন বলছিলেন, “ইসলামের কথাগুলো বোঝা লাগে না, অনুভব করতে হয়।” অনুভব করতে গিয়ে দেখা গেল তিনি অনুভব করছেন শুধু গাঁজার নেশা! আবার কেউ বলে, “আল্লাহর সাথে সংযোগ লাগে, এজন্য একটু নেশা করা লাগে।” এমন ব্যাখ্যা শুনলে মনে হয়—ধর্মের জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে, কিন্তু নেশার তত্ত্বে পিএইচডি করে ফেলেছে!
সত্য হলো—সমাজে বাউলদের অবদান অনেক। কিন্তু একই সমাজে কিছু ভণ্ডের কারণে আজ ‘বাউল’ নাম শুনলেই মানুষ বিভ্রান্ত হয়। প্রকৃত বাউলরা যেখানে প্রেম, মানবতা ও আধ্যাত্মিকতার বার্তা ছড়িয়েছেন, ভণ্ড বাউলরা সেখানে সৃষ্টি করেছে বিভ্রান্তি, বিশৃঙ্খলা, নৈতিক পতন এবং ধর্ম নিয়ে ব্যঙ্গ। ফলে সাধারণ মানুষ সত্যিকারের বাউল ও ভণ্ড বাউলের পার্থক্য করতে গিয়ে হতাশ হয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনের শেষে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—বাউলদের নাম ব্যবহার করে যারা সমাজে ভুল পথ দেখায়, ধর্মকে অপমান করে, নেশাকে দর্শন বানায়, লম্পট্যকে তত্ত্ব বলে চালায়—তারা আমাদের লোকজ ঐতিহ্যের শত্রু। এদের বিরুদ্ধে সচেতনতা জরুরি। বাউল সঙ্গীত হৃদয়ের সুর, মানবতার সেতু—এটা যেন ভণ্ডদের হাতে বিকৃত না হয়। আসল বাউলদের সম্মান রক্ষা করতে হলে ভণ্ডদের স্বরূপ সমাজকে জানাতে হবে।
লেখক: আলেমেদীন ও খতিব