ধ্রুব ডেস্ক
বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচায় বরণ করার অপেক্ষায় এখন বেইজিং। আগামী ২২ থেকে ২৬ জুন সস্ত্রীক এই সফর করবেন তারেক রহমান। গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর থেকেই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে যে প্রশ্নটা জোরালো ছিল তা হলো-দিল্লি নাকি বেইজিং— কোথায় আগে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সে সব জল্পনার অবসান হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরসূচি এখন চূড়ান্ত। প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে আগামীকাল রোববার মালয়েশিয়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। মালয়েশিয়া থেকে সরাসরি যাবেন বহুল আলোচিত চীন সফরে।
এদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জাতীয় স্বার্থ আর ভূরাজনীতির হিসাব-নিকাশ প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের গুরুত্বকে বাড়িয়ে দিয়েছে অনেক গুণ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা এখনো চলমান। অন্যদিকে পুশইনসহ নানা ইস্যুতে যখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে অস্থিরতা বিরাজ করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ভূরাজনৈতিক দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরের রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব সবকিছুকে ছাপিয়ে যাবে। যদিও আসন্ন এই সফরে শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), গণমাধ্যম, যোগাযোগ ও উন্নয়ন সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে তিনটি চুক্তিসহ ১০টিরও বেশি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হতে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন, এই সফরের মাধ্যমে ঢাকা-বেইজিং রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের এক নতুন ভিত্তি তৈরি হতে যাচ্ছে, যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আগামী দিনে পথ চলবে দুই দেশ। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য চীনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরকে ফলপ্রসূ করতে কয়েক দিন ধরে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎসহ আসন্ন সফর নিয়ে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে গত ৫-৭ মে বেইজিং সফর করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। পরে প্রধানমন্ত্রীর সফর এবং আলোচ্যসূচি নিয়ে চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার জন্য গত ৯-১১ জুন বেইজিং সফর করেন পররাষ্ট্র সচিব।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় দ্বিপক্ষীয় সফর শেষে ২২ জুন বিকেলে কুয়ালালামপুর থেকে চীনের দালিয়ানের উদ্দেশে রওনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সফরে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবায়দা রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র সচিবসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তারা সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন।
আগামী ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রী দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেবেন। সেখান থেকে ২৪ জুন বিকালে বুলেট ট্রেনে বেইজিং পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা। আগামী ২৫ ও ২৬ জুন বেইজিংয়ে ব্যস্ত সময় কাটাবেন প্রধানমন্ত্রী। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিকবিষয়ক প্রধানের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফর সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কূটনীতিক বলেন, আসন্ন সফরটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের জন্য চীনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশই আসন্ন সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। সাধারণত চীনা প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী একজনের সঙ্গেই দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কিন্তু এবারের সফরে চীনের দুই শীর্ষ নীতিনির্ধারকের সঙ্গেই দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের কথা রয়েছে। এ ছাড়া বিগত দুই দশকের বেশি সময় পর শীর্ষ বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতির পরিবর্তে যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করা হবে। এর আগে ২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বেইজিং সফরের সময় যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছিল। তারপর বাংলাদেশের আর কোনো সরকারপ্রধানের চীন সফর নিয়ে যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করা হয়নি।
এ ছাড়া শি জিনপিংয়ের যে চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ রয়েছে, তার মধ্যে গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে (জিডিআই) বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার বিষয়টি ঘোষণা দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুক্তবাণিজ্য জোট রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি), ব্রিকস ও সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনে (এসসিও) যুক্ত হতে চায় বাংলাদেশ। এ ব্যাপারে চীনের সমর্থন চাওয়া হবে।
তিস্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ব্যাপারে জানতে চাইলে ওই কূটনীতিক জানান, আশা করা হচ্ছে তিস্তা প্রকল্পে চীনের যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। তবে এখনই তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নের ঘোষণাটি হয়তো আসবে না। কারণ অর্থায়নের ঘোষণা দেওয়ার আগে প্রকল্পের খুঁটিনাটি অনেক কিছুই স্পষ্ট করতে হবে। তবে তিস্তা ও টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা, রেল যোগাযোগ, গ্রিন এনার্জি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষিসহ ১২-১৩টি খাতে প্রকল্প সহযোগিতা চাওয়া হবে।
ওই কূটনীতিক বহুল আলোচিত সামরিক সরঞ্জাম কেনা এবং সামরিক সম্পর্কের বিষয়ে বলেন, এবারের বৈঠকে সামরিক ইস্যুটি খুব বেশি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হবে বলে মনে হয় না। এই ইস্যুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর। তবে দুদেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সামরিক সহযোগিতার বিষয় নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান ওই কূটনীতিক।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক এম শহীদুজ্জামানের মতে, প্রধানমন্ত্রী এমন একটি সময়ে চীন সফরে যাচ্ছেন, যখন ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে পুশইনসহ নানামুখী তৎপরতা চলছে। ভারতের নতুন দূত ঢাকায় পৌঁছে তার অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার খায়েশের কথা জানিয়ে রীতিমতো বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। এমন এক পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর বড় ধরনের বার্তা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে ভারতের একটি দালালশ্রেণি রয়েছে। তারা বারবার বলার চেষ্টা করেছে প্রধানমন্ত্রীর উচিত ভারত সফরে গিয়ে একটা ভারসাম্য রক্ষা করা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। অনেকে বলার চেষ্টা করেন, ভারত ও চীনের সঙ্গে আমাদের ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। কিন্তু আমি মনে করি ভারত নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আমাদের বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে।
পাকিস্তানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে এই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক বলেন, আমরা জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে পাকিস্তান মডেল অনুসরণ করতে পারি। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অত্যন্ত সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে অর্থনৈতিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখতে চান সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ূন কবির। তার মতে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক সাপোর্ট জরুরি। এটা চীন ছাড়া অন্য কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়টি নিশ্চিতভাবেই অনুধাবন করে চীন সফরে যাচ্ছেন। চীনই একমাত্র দেশ, যে দেশটি প্রকল্প সহায়তার পাশাপাশি ক্যাশ সাপোর্টও দিতে পারে। পারে চীন। তবে এ ব্যাপারে আমাদের সার্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে সুস্পষ্ট জবাব দেওয়া দরকার।
সূত্র-আমার দেশ
ধ্রুব/টিএম