তৌফিকুর রহমান
আকারে ছোট হলেও পুষ্টিগুণে কোয়েলের ডিম একেবারেই বড়। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের খাদ্য তালিকায় কোয়েলের ডিম দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অনেকেই একে ‘মিনি নিউট্রিশন বোমা’ বলে থাকেন। প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ এই ডিম শুধু সুস্বাদুই নয়, বরং মানবদেহের নানা উপকারে আসে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের আধুনিক খাদ্যাভ্যাস—সবখানেই এখন কোয়েলের ডিমের কদর বাড়ছে।
কোয়েলের ডিমের পুষ্টিগুণ
কোয়েলের ডিম আকারে মুরগির ডিমের তুলনায় প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হলেও এতে পুষ্টির ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি। প্রতি ১০০ গ্রাম কোয়েলের ডিমে গড়ে থাকে—
প্রোটিন: প্রায় ১৩ গ্রাম
চর্বি: ১১ গ্রাম
ক্যালসিয়াম: ৬৪ মিলিগ্রাম
ফসফরাস: ২২৬ মিলিগ্রাম
আয়রন: ৩.৬ মিলিগ্রাম
ভিটামিন বি১২, এ, ডি ও ই উল্লেখযোগ্য মাত্রায়
এই পুষ্টিগুলো শরীরের কোষ গঠন, শক্তি উৎপাদন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী ও বৃদ্ধদের জন্য কোয়েলের ডিম একটি উৎকৃষ্ট খাদ্য।
প্রোটিনের উৎকৃষ্ট উৎস
কোয়েলের ডিমের অন্যতম প্রধান গুণ হলো এর উচ্চমানের প্রোটিন। এই প্রোটিনে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব অপরিহার্য অ্যামাইনো অ্যাসিড রয়েছে। যারা নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করেন, ক্রীড়াবিদ বা ব্যায়ামপ্রেমী—তাদের জন্য কোয়েলের ডিম পেশি গঠনে ও শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক। একই সঙ্গে এটি দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে, ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি
কোয়েলের ডিমে থাকা ভিটামিন এ, সি ও ই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের ক্ষতিকর ফ্রি-র্যাডিক্যালের বিরুদ্ধে কাজ করে, যা ক্যানসারসহ নানা দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। নিয়মিত কোয়েলের ডিম খেলে সর্দি-কাশি ও সাধারণ সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায় বলে অনেক পুষ্টিবিদ মনে করেন।
মস্তিষ্ক ও স্মৃতিশক্তির জন্য উপকারী
কোয়েলের ডিমে রয়েছে কোলিন ও ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স, যা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। শিক্ষার্থী ও মানসিক শ্রমে নিয়োজিত মানুষের জন্য এটি স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বৃদ্ধিতে কার্যকর। নিয়মিত কোয়েলের ডিম খেলে স্নায়ুতন্ত্র সুস্থ থাকে এবং মানসিক অবসাদ কমে।
হৃদ্স্বাস্থ্যে ভূমিকা
অনেকের ধারণা ডিম মানেই কোলেস্টেরল, কিন্তু কোয়েলের ডিমে থাকা উপকারী ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। এতে থাকা ‘এইচডিএল’ বা ভালো কোলেস্টেরল হৃদ্যন্ত্রের কার্যকারিতা উন্নত করে। পরিমিত মাত্রায় কোয়েলের ডিম গ্রহণ করলে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমতে পারে।
হাড় ও দাঁত মজবুত করে
ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও ভিটামিন ডি—এই তিনটি উপাদান কোয়েলের ডিমে ভালো মাত্রায় পাওয়া যায়। ফলে এটি হাড় ও দাঁত শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি এবং বয়স্কদের অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে কোয়েলের ডিম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ
কোয়েলের ডিমে থাকা আয়রন ও ভিটামিন বি১২ রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সহায়ক। যারা রক্তস্বল্পতায় ভোগেন, বিশেষ করে নারী ও কিশোরীদের জন্য কোয়েলের ডিম একটি উপকারী খাদ্য হতে পারে। নিয়মিত খেলে দুর্বলতা ও মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ কমে।
ত্বক ও চুলের যত্নে
কোয়েলের ডিমে থাকা ভিটামিন এ ও ই ত্বককে উজ্জ্বল ও স্বাস্থ্যবান রাখতে সাহায্য করে। এটি ত্বকের শুষ্কতা কমায় এবং বয়সের ছাপ পড়া ধীর করে। পাশাপাশি চুলের গোড়া মজবুত করে ও চুল পড়া কমাতে সহায়ক। তাই সৌন্দর্য সচেতনদের খাদ্য তালিকায় কোয়েলের ডিম বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
শিশুদের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর
অনেক দেশে শিশুদের জন্য কোয়েলের ডিম জনপ্রিয়, কারণ এটি সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, কোয়েলের ডিমে অ্যালার্জির ঝুঁকি তুলনামূলক কম। ফলে যেসব শিশু মুরগির ডিমে অ্যালার্জিতে ভোগে, তারা অনেক সময় কোয়েলের ডিম নিরাপদে খেতে পারে—যদিও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
রান্না ও গ্রহণ পদ্ধতি
কোয়েলের ডিম সেদ্ধ, ভাজি, তরকারি কিংবা সালাদ—বিভিন্নভাবে খাওয়া যায়। সাধারণত দিনে ৩–৫টি কোয়েলের ডিম খাওয়া নিরাপদ বলে ধরা হয়। তবে যাদের বিশেষ কোনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে পরিমাণ নির্ধারণে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, কোয়েলের ডিম আকারে ছোট হলেও পুষ্টিতে বিশাল। এটি মানবদেহের শক্তি বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ, মানসিক ও শারীরিক সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সহজলভ্যতা ও বহুমুখী উপকারিতার কারণে কোয়েলের ডিম ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যকর খাদ্য তালিকায় আরও বেশি জায়গা করে নেবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।