এম এ আজীম
❒ এম এ আজীম। ছবি: ধ্রুব নিউজ গ্রাফিক্স
একজন প্রকৃত লেখকের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো পাঠক—টাকা নয়। লেখালেখির মূল উদ্দেশ্য কখনোই অর্থ উপার্জন ছিল না; বরং নিজের ভাবনা, অনুভূতি ও সময়ের সত্যকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তাহলে প্রশ্ন আসে—যদি একজন লেখক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই পাঠক পেয়ে যান, যদি তাঁর লেখা হাজারো মানুষ পড়ে, আলোচনা করে—তবে টাকা দিয়ে বই প্রকাশ করার প্রয়োজনটাই বা কোথায়?
আজকের বাংলা প্রকাশনা জগতের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানেই। অনেক প্রকাশনী এখন আর লেখা খোঁজে না, খোঁজে লেখকের পকেট। টাকা না থাকলে ভালো লেখাও ছাপার অযোগ্য হয়ে যায়, আর টাকা থাকলে দুর্বল, অপরিণত কিংবা দায়িত্বহীন লেখাও বইয়ের মলাট পায়। এর ফলে পাঠক ধীরে ধীরে বইয়ের ওপর আস্থা হারাচ্ছে, আর সাহিত্যের মান ক্রমেই নিচের দিকে নামছে।
এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তরুণ ও সম্ভাবনাময় লেখকেরা। যাদের লেখার গভীরতা আছে, কিন্তু পকেটে প্রকাশনার খরচ নেই—তাদের কণ্ঠ রয়ে যাচ্ছে চাপা। অন্যদিকে, কেবল অর্থের জোরে প্রকাশিত বইগুলো বাজার ভরিয়ে দিচ্ছে, যেগুলোর বেশিরভাগই পাঠকের মনে স্থায়ী কোনো ছাপ ফেলতে পারছে না। ফলাফল—বই আছে, কিন্তু পাঠক কমে যাচ্ছে।
এই অবস্থায় ফেসবুক, ব্লগ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম লেখকদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে। এখানে কোনো প্রকাশনীর অনুমতি লাগে না, টাকা লাগে না—লাগে শুধু লেখা। পাঠক নিজেই বেছে নেয় কী পড়বে, কী ছেড়ে দেবে। এটাই প্রমাণ করে যে পাঠক এখনো আছে, সাহিত্য এখনো মরেনি; সংকটে আছে কেবল ব্যবস্থাটা।
কিন্তু এই সংকট যদি চলতেই থাকে, তবে হয়তো এমন দিন খুব দূরে নয়, যেদিন মানুষ বই কিনে পড়া বন্ধ করে দেবে। বই তখন হয়ে যাবে শুধু সাজসজ্জার বস্তু, অথবা প্রকাশকের হিসাবের খাতা ভরানোর উপকরণ। সেটি হবে বাংলা সাহিত্যের জন্য এক ভয়াবহ পরিণতি।
তাই এখনই সময় প্রকাশনীগুলোর আত্মসমালোচনা করার। তাদের বুঝতে হবে—ভালো লেখা ছাপানো কোনো দয়া নয়, এটি তাদের দায়িত্ব। শুধু ব্যবসায়িক চিন্তা দিয়ে সাহিত্য টিকে থাকতে পারে না। পাশাপাশি রাষ্ট্রেরও এখানে দায়িত্ব রয়েছে। মানসম্মত প্রকাশনাকে উৎসাহ দেওয়া, নতুন লেখকদের জন্য নীতিমালা তৈরি করা, এবং সাহিত্যকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে রক্ষা করা রাষ্ট্রের কর্তব্য।
নইলে একদিন ইতিহাস হয়তো লিখবে—আমরা এমন এক সময়ে ছিলাম, যখন বাংলা সাহিত্য পাঠকের অভাবে নয়, বরং লোভ আর অব্যবস্থাপনার কারণে ধীরে ধীরে নিজের কবর নিজেই খুঁড়ে ফেলেছিল।