❒ গল্প
সাইফুল ইসলাম
পদ্মা সেতু হয়ে বেনাপোল-ঢাকা ট্রেনের নতুন রুট। কুষ্টিয়া কোর্ট স্টেশনে টিকিট কাটতে গেলাম, গন্তব্য ফরিদপুর। কাউন্টার জানাল, লোকাল যাত্রীর টিকিট সিস্টেমে নেই। বললাম, দাঁড়ানো টিকিট দেন। তাও সিস্টেমে নেই। ট্রেনের ভেতর থেকে টিকিট নিয়ে নিয়েন। আমি বললাম, টিটি তো জরিমানা চাইবে!! তার সোজাসাপ্টা উত্তর—জানি না, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা করেন। এখন কী করব!! প্রয়োজন আইন মানে না। তাই ভাবতে ভাবতে খানিকক্ষণ বাদে ট্রেন এলে উঠে পড়লাম। দেখি না টিটি কী করে!!
দু ঘণ্টার পথ ফরিদপুর। ১৬ আসনের ছোট কামরায় যাত্রীরা যার যার সিটে। আমরা চার-পাঁচজন দাঁড়ানো। আমি এক সিটে ঠেস দিয়ে এক পায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে ঠোঁট বিড়বিড় করছি। মাঝে মাঝে পা বদল করছি আর ভাবছি, না জানি কখন টিটি এসে হাইকোর্ট দেখিয়ে দেয়! টিকিট ছাড়া যাত্রী বলে কথা!!
এক ঘণ্টা পার হয়ে গেল। ট্রেন রাজবাড়ী স্টেশনে থেমে আবারো ছেড়েছে। একদল টিটি আমাদের কামরায় এলে ভাবলাম, ওরা চাওয়ার আগে আমার টিকিট না থাকার কথা জানাই। কিন্তু তার মধ্যে ওরা সামনের দিকে চলে গেল। তখন ভাবতে লাগলাম, টিটি তো চলে গেল, টাকা দেওয়া হলো না। প্ল্যাটফর্মে না জানি কোন বিপদে পড়তে হয়। ভাবতে ভাবতে ব্যথায় ভারী হয়ে থাকা পা বদল করছি আর বিকট ঘটঘটানি শব্দ হজম করছি। একটু গরমে স্বস্তি পেতে গায়ের হাফ হাতা হুডিটা খুলতে খুলতে দেখছিলাম ট্রেনের কামরাটি বেশ পরিচ্ছন্ন, কমলা রঙের। তার সাথে হালকা হলুদ লাইটে কামরাটি সেজেছে বেশ।
বাংলাদেশের ট্রেনের এমন পরিপাটি চেহারা নিজেকে পুলকিত করছিল। পরিচ্ছন্ন পোশাকে মন যেমন তৃপ্তিতে ভরে ওঠে, তেমনি পরিবেশের পরিচ্ছন্নতাও মনের উৎফুল্লতা বাড়িয়ে দেয়। আহ! আমার সোনার দেশটা যদি এমন সুন্দর হতো! রাস্তাঘাট, অলিগলি, দোকানপাট, নগর-বন্দর, প্ল্যাটফর্ম যদি নোংরা না হতো!! দেশটির চালকের আসনে অধিকাংশ মানুষের নোংরা মন যদি পরিচ্ছন্ন হয়ে যেত! ট্রেনের কামরার মতো!
আমি দাঁড়িয়ে। আমার পেছনের সিটে কুচকুচে কালো হাতমোজা আর বোরকায় আবৃত এক মহিলা বিড়ালছানাকে আদর করছেন। ছানাটি মাঝে মাঝে মিউ মিউ করে ডাকছে। ও যেন বলতে চাইছে, আর কতদূর গন্তব্য!! এত ঘটর মটর শব্দ আর তো নিতে পারি না।
টিটিরা ফিরে এল। যাত্রীদের টিকিট চেক করছে। চাওয়ার আগেই আমার টিকিট না থাকার ব্যাপারটি বললাম। আমার গন্তব্যের ভাড়া ১১০ টাকার পরিবর্তে টিটি ১০০ টাকা চাইল। আমি টাকা দিতে দিতে বললাম, আমার টিকিট দেন ভাই, প্ল্যাটফর্মে ঝামেলা করতে পারে। তিনি বললেন, সমস্যা নাই ওয়েট করেন।
আমাদের কামরা ছাড়ার আগে লোকটি টিকিট দিলেন। আমি দেখলাম টিকিটটি কুষ্টিয়া কোর্ট স্টেশন থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত। আসন নম্বর ট-৯২। ভাড়া ১৪০ টাকা। এই ট্রেনেরই টিকিট। কিন্তু বিপত্তি অন্যখানে!!
হতে পারে এই টিকিটের যাত্রীর গন্তব্য রাজবাড়ী ছিল। টিকিট কাটা হয়েছিল ভাঙ্গা স্টেশন পর্যন্ত। চেকিংয়ের পর লোকটি আর টিকিট ফেরত নেননি। আমাকে দেওয়া টিকিটে দুটি দাগ দেওয়া ছিল, নীল কালির। কালির দাগ থাকার মানে হলো টিকিটটি চেক করা।
পাঠক এখন বুঝলেন তো বিপত্তি কোথায়!! একই টিকিট দুবার বিক্রি হলো—একবার গভর্মেন্ট টাকা পেল, আরেকবার টাকা পেল টিটি!!!
আমি ভাবছিলাম পরিচ্ছন্নতায় ট্রেনের উন্নতির কথা, টিকিট ছাড়া ভাড়া বিহীন ভ্রমণের গ্লানি মুক্ত হবার কথা। ঘটনার সবই এখন ভুলে যাচ্ছি। একটু পর পুরোপুরি ভুলে যাব। এটা আমার দোষ না! আমরা ভুলোমনা জাতি! তাই ভুলে যাই রাতের ভোট! ভুলে যাই পাহাড় সমান টাকা পাচার! ভুলে যাই রিজার্ভ লুট! ভুলে যাই বৈদেশিক ঋণের টাকায় কথিত উন্নয়নের আড়ালে সাগর চুরি। ভুলে যাই সবকিছু।
ইয়েস!!! এটাই আমার দেশ!!!