❒ স্মরণ সভায় বক্তারা
নিজস্ব প্রতিবেদক
ছবি: সংগৃহীত
যশোরের প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা, শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক, শিক্ষানুরাগী ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সহযোদ্ধা কমরেড ইলাহদাদ খান মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সমাজতন্ত্রের আদর্শ এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ নির্মাণের সংগ্রামে আজীবন নিবেদিত ছিলেন। ব্যক্তিগত শোক, পারিবারিক সংকট ও শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তিনি সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হননি। গত ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে যশোরের প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগঠকের অবসান ঘটে। প্রেসক্লাব যশোরে শনিবার বিকেলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি যশোর জেলা শাখা কর্তৃক আয়োজিত ইলাহদাদ খানের স্মরণ সভায় বক্তারা একথা বলেন।
১৯৪৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর যশোর সদর উপজেলার হামিদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কমরেড ইলাহদাদ খান। তাঁর পিতা মো. গোলাম আকবর খান এবং মাতা আবেদা বানু। যশোর মুসলিম একাডেমি থেকে ১৯৬৫ সালে বিজ্ঞান বিভাগে মাধ্যমিক এবং ১৯৬৮ সালে মাইকেল মধুসূদন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৬৯ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনে (ইপিএডিসি) যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। দীর্ঘ ২৭ বছর চাকরি করার পর স্বেচ্ছা অবসর গ্রহণ করেন। পরে মুক্তিযোদ্ধা ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে অবদান রাখেন এবং কলেজটির রসায়ন বিভাগের প্রদর্শক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। ২০০৯ সালে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর ২০১৬ সালে যশোরের মৌমাছি স্কুলের হিসাব বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে এ দায়িত্ব পালন করেন।
কর্মজীবনের পাশাপাশি শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যুক্ত হয়ে তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা, শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের অধিকার এবং সামাজিক সাম্য ছিল তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের মূল ভিত্তি। ১৯৯৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টিতে ভাঙনের পর যশোর জেলা কমিটি পুনর্গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে যশোর-৩ আসনে কাস্তে প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত জেলা সম্মেলন পর্যন্ত তিনি জেলা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলনেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর যশোর জেলা সংসদের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নারী অধিকার আন্দোলন, কৃষক সমিতি, বাম গণতান্ত্রিক জোট এবং বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির যশোর শাখার কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র সাপ্তাহিক একতা পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজও তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে করতেন। বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা ও সাংস্কৃতিক মুক্তির চেতনাকে তিনি সমাজ পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করতেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে না পারার আক্ষেপ তাঁর মধ্যে ছিল। তবে বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেন। পারিবারিক স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁকে ধরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং যশোর ক্যান্টনমেন্টে দুই দিন এক রাত নির্যাতনের পর ছেড়ে দেওয়া হয়। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের অন্যতম বেদনাময় অধ্যায় হয়ে ছিল।
১৯৭৭ সালে অধ্যাপক সুরাইয়া শরীফের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তাঁর স্ত্রী বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যশোর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তী সময়ে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের পরিবারে মানবিকতা, যুক্তিবাদ, সাংস্কৃতিক চর্চা ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের চর্চা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বড় ছেলে আসিফ আকবর নিপ্পন আলোকচিত্রী ও গণমাধ্যমকর্মী; তিনি নাট্যচর্চার সঙ্গেও যুক্ত এবং উদীচী যশোর জেলা সংসদের সহসাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। ছোট ছেলে রেশাদ আকবর প্রত্যয় ছিলেন বিজ্ঞানী। রাশিয়ার কাজান ফেডারেল ইউনিভার্সিটিতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পিএইচডি অধ্যয়নকালে ২০২৩ সালে তাঁর অকালমৃত্যু পরিবারে গভীর শোকের সৃষ্টি করে।
রাজনীতি ও সাংগঠনিক দায়িত্বের বাইরে কমরেড ইলাহদাদ খানের জীবনে সংগীত ও প্রকৃতির বিশেষ স্থান ছিল। গান শুনতে ভালোবাসতেন, নিজের হাতে গাছ লাগাতেন এবং ফুল-ফলের বাগান পরিচর্যা করতেন। যশোর শহরের বেজপাড়ায় ছায়াবীথি সড়কের বাড়িটি সাজিয়েছিলেন নানা প্রজাতির গাছপালায়। ‘Simple Living, High Thinking’—সরল জীবনযাপন ও মহৎ চিন্তার এই দর্শন তাঁর ব্যক্তিজীবনেও প্রতিফলিত হয়েছিল।
কমরেড ইলাহদাদ খান ছিলেন প্রচারের আলোয় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার মানুষ নন; বরং কাজের মধ্য দিয়ে সংগঠন ও মানুষের পাশে দাঁড়ানো একজন দায়িত্বশীল সংগঠক। ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে দায়িত্ব, আত্মকেন্দ্রিকতার চেয়ে মানুষের কল্যাণ এবং সাময়িক সাফল্যের চেয়ে আদর্শিক অঙ্গীকারকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
তাঁর মৃত্যুতে একটি কর্মময় জীবনের অবসান হলেও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, সমাজতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কমরেড ইলাহদাদ খানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, যশোর জেলা কমিটি তাঁকে লাল সালাম জানিয়েছেন।
কারণ সভায় বক্তব্য রাখেন, সিপিবি নেতা আবু হাসানের সভাপতিত্বে অনিশ্চিত সাধারণ সভায় বক্তব্য রাখেন, সিপি নেতা অ্যাডভোকেট আবুল হোসেন, অ্যাডভোকেট আমিনুর রহমান বাসদ নেতা কমরেড হাসিনুর রহমান, কমরেড তসলিমুর রহমান, কমরেড শাহজাহান আলী প্রমুখ।