কচুর লতি পরিস্কার করছেন এক নারী। ছবি: ধ্রুব নিউজ
সকালের রোদে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার মাঠগুলোতে এখন ভিন্ন ফসলের ব্যস্ততা। মাঠের পর মাঠ কাদা আর পানিতে একাকার। তার মাঝেই সারি সারি লতি কচু গাছের পাতার নিচে ঝুলে আছে লম্বা ও সবুজ লতি। হাঁটু সমান কাদা ভেঙে কৃষকরা গাছ থেকে লতি তুলছেন, কেউ সেগুলো আঁটি বাঁধছেন, আবার কেউ খেত থেকেই তা নিয়ে যাচ্ছেন বাজারে বিক্রির জন্য। সামান্য এই লতি কচুই এখন এ অঞ্চলের অনেক কৃষকের ভাগ্য বদলের চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে।

কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, লতি কচু চাষে খরচ কম অথচ লাভ অনেক বেশি। য্শোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জেলার আটটি উপজেলাতেই কমবেশি লতি কচুর চাষ হচ্ছে। জেলার প্রায় ২৭৫ হেক্টর জমিতে এই ফসলের আবাদ করে প্রায় ৮ হাজার ৭৫১ মেট্রিক টন লতি উৎপাদন করছেন কৃষকরা। এর মধ্যে বাঘারপাড়া উপজেলায় এর চাষ সবচেয়ে বেশি।
বাঘারপাড়ার জোহরপুর এলাকার কৃষক হারুন-অর রশিদ প্রায় ১৫ বছর ধরে লতি কচু চাষ করছেন। চলতি মৌসুমে তিনি তিন বিঘা জমিতে এই আবাদ করেছেন। তিনি জানান, এক বিঘা জমি থেকে প্রতি সপ্তাহে ১০ থেকে ১২ মণ লতি সংগ্রহ করা যায়। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি লতি ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলন ও দাম ভালো থাকায় এ বছর তিনি বেশ লাভবান হয়েছেন।
আরেক কৃষক জাকির হোসেন জানান, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন বেশ ভালো পাওয়া গেছে। পড়াশোনা শেষ করে বেকার না থেকে কৃষিকাজে যুক্ত হয়ে তিনি সাত কাঠা জমিতে লতি চাষ শুরু করেন। এখন প্রতি সপ্তাহে তিনি তিন থেকে সাড়ে তিন মণ লতি বাজারে বিক্রি করছেন। তবে সার ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে চাষের খরচ কিছুটা বেড়েছে বলে জানান তিনি।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে লতি কচু চাষ করতে কৃষকের খরচ হয় প্রায় ২০ হাজার টাকা। আর এই এক বিঘা জমি থেকেই টানা মৌসুমে লতি বিক্রি করে প্রায় এক লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব।
লতি কচু চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর দীর্ঘমেয়াদি ফলন ও ধারাবাহিক আয়। একবার চারা রোপণ করার পর গাছ পূর্ণাঙ্গ রূপ নিলে একটি গাছ থেকে টানা ৭ থেকে ৮ মাস পর্যন্ত নিয়মিত লতি সংগ্রহ করা যায়। এতে সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে লতি তুলে বাজারে বিক্রি করে কৃষকরা নিয়মিত নগদ অর্থের মুখ দেখতে পান।
শুধু লতি বিক্রি করেই আয় সীমাবদ্ধ থাকে না; গাছের কোনো অংশই ফেলনা যায় না। লতির মৌসুম শেষ হলে কচুর ডগা, পুষ্টিকর ফুল এবং গোড়া বা মোথা বাজারে সবজি হিসেবে ভালো দামে বিক্রি হয়। এছাড়া জমিতে নতুন গজিয়ে ওঠা চারা বিক্রি করেও কৃষকরা আলাদা অর্থ উপার্জন করেন।
পাশাপাশি, এই আবাদ গ্রামীণ অর্থনৈতিক চিত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। লতি জমি থেকে তোলার পর বাজারজাতকরণের জন্য পরিষ্কার করা, আঁটি বাঁধা এবং লতি শুকিয়ে গুঁড়া তৈরির প্রক্রিয়ার সাথে এখন এলাকার নারীরাও ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। এর ফলে গ্রামীণ নারীদের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং তাঁরাও সংসারে আর্থিক অবদান রাখার নতুন পথ খুঁজে পাচ্ছেন।
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক জাহিদুল ইসলাম বিশ্বাস জানান, লতি কচু চাষে কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। কৃষি বিভাগ থেকে চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ ও সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। সঠিক পরিচর্যা ও ভালো বাজারদরের কারণে লতি কচু চাষ যশোরের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।