ছবি: এআই প্রণীত
পকেটে থাকা ফোনটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। স্ক্রিনটা অন করতেই ফেসবুকের নোটিফিকেশন, ইনবক্সের মেসেজ আর রিলসের অন্তহীন দুনিয়া চোখের সামনে ভেসে ওঠে। চারপাশে কত মানুষ! কেউ পোস্টে কমেন্ট করছে, কেউ লাইক দিচ্ছে। কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তেও ঘরের এক কোণে কিংবা নিঝুম রাতে বালিশে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকা মানুষটার বুকজুড়ে কেমন যেন একটা ফাঁকা ফাঁকা লাগা। হাজারটা চেনা মুখের ভিড়েও সে আজ ভীষণ একা।
মাঝে মাঝে নিজের অদ্ভুত একটা মায়া লাগে। যোগাযোগ তো এখন হাতের মুঠোয়, তাহলে আমরা দিন দিন এত একা হয়ে পড়ছি কেন?
সত্যি বলতে, প্রযুক্তি আমাদের জীবনটা অনেক সহজ করে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে মানুষের সাথে মানুষের আসল টান। আমরা এখন সেকেন্ডের মধ্যে আটলান্টিক পারের বন্ধুকে মেসেজ পাঠাতে পারি, অথচ পাশের ঘরে বসা মানুষটার মন কেমন আছে, তা জানার ফুরসতটুকুও নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চ্যাট করা, ইমোজি দেওয়া বা রিলস শেয়ার করাই এখন আমাদের ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যম। কিন্তু এই অন্ধ যোগাযোগের ভিড়েই হারিয়ে যাচ্ছে মনের সাথে মনের আসল সংযোগ। ফলস্বরূপ, হাজারটা ভার্চুয়াল বন্ধুও বুক চিরে বেরিয়ে আসা সেই নিঃসঙ্গতার হাহাকার দূর করতে পারছে না।
যা দেখছি, তার কতটুকুই বা সত্যি? সোশ্যাল মিডিয়া এখন যেন একটা সাজানো শো-কেস। সেখানে কেবল মানুষের সাফল্য, উপচে পড়া হাসি আর নিখুঁত জীবনের ছবিগুলোই ঝিলমিল করে। নিজের সাদামাটা, ক্লান্তিকর বা একটু কঠিন বাস্তব জীবনের সাথে অন্যের সেই ফিল্টার করা জীবনের তুলনা করতে গিয়ে আমরা নিজেরাই নিজেদের ছোট করে ফেলি। মনে মনে ভাবি—‘সবাই কি দারুণ সুখে আছে, শুধু আমার ভাগ্যটাই খারাপ!’
অথচ আমরা সবাই জানি যে অনলাইন দুনিয়ায় মানুষ কেবল তার জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলোই দেখায়। তবুও মন মানে না! ওই সাজানো মিথ্যার জালের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা লাইক, কমেন্ট আর দৃশ্যমানতার মাপকাঠিতে নিজেদের মূল্য জুড়তে শুরু করি। আর এখানেই আমরা সবচেয়ে বড় ভুলটা করে বেলি, যাকে একধরনের বোকামি ছাড়া আর কীইবা বলা চলে!
স্মার্টফোন তো খারাপ কিছু নয়, কিন্তু এটার অতিরিক্ত নেশা আমাদের মুখোমুখি বসা মানুষটার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। এখন তো কোনো রেস্টুরেন্টে বা ডাক্তারের অপেক্ষাকক্ষে বসে থাকলেও মানুষ স্ক্রিনে আঙুল চালায়, পাশের মানুষটার সাথে দুটো মিষ্টি কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও আর কাজ করে না। এভাবে পাশাপাশি থেকেও আমরা হয়ে পড়েছি একে অপরের অচেনা।
নিঃসঙ্গতা মানেই কি কোনো দুর্বলতা? আমাদের সমাজে আজও একাকীত্ব বা মনের কষ্টের কথা খোলাখুলি বলাটা একটা বড় ট্যাবু। ‘লোকে কী বলবে’—এই ভয়ে মানুষ মনের ক্লান্তি বা কাজের প্রচণ্ড চাপ হাসিমুখে লুকিয়ে রাখে। অথচ ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে ব্যস্ত চাকরিজীবী বা সামলানোর দায়িত্ব নেওয়া অভিভাবক—কমবেশি সবাইকেই এই নীরব নিঃসঙ্গতার মুখোমুখি হতে হয়।
বিজ্ঞান কিন্তু অন্য কথা বলে। নিঃসঙ্গতা কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা, অযোগ্যতা বা বোকামি নয়। আদিমকাল থেকেই মানুষ দলবদ্ধভাবে থাকতে অভ্যস্ত। অন্যের সাথে সত্যিকারের মিলমিশ না থাকলে মস্তিষ্কে যে ব্যথা অনুভূত হয়, তা শারীরিক ব্যথার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। দীর্ঘস্থায়ী এই একাকীত্ব শুধু মনকে বিষণ্ণই করে না, বরং রাতে ঘুম কেড়ে নেয় এবং শরীরের ভেতর বড় কোনো রোগের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।
দীর্ঘদিন একা থাকতে থাকতে মানুষের মনে একটা অদ্ভুত দেয়াল তৈরি হয়। তখন মনে হয়, কার কাছেই বা যাবো, সবাই তো দূরে সরে যাবে। এই ভয় থেকে মানুষ আরও বেশি করে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, আর নিঃসঙ্গতার গোলকধাঁধাও আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
তাহলে মুক্তির পথ কোথায়? এই সম্পর্কহীন যুগে দাঁড়িয়ে একটা কথা খুব করে মনে রাখা দরকার—নিঃসঙ্গ বোধ করার মানে এই নয় যে আপনি জীবনে হেরে গেছেন বা কোনো অযোগ্য মানুষ। এটি কেবল একটা স্বাভাবিক জৈবিক সংকেত, যা আমাদের মন ও শরীরকে মনে করিয়ে দেয় যে আমাদের একটু সত্যিকারের ছোঁয়া প্রয়োজন।
ভার্চুয়াল দুনিয়ার এই কৃত্রিম ঝিলমিল থেকে এবার একটু চোখ ফিরিয়ে বাস্তব দুনিয়াটার দিকে তাকানোর সময় এসেছে। হাজারটা লাইক-কমেন্টের ঠুনকো দুনিয়ার চেয়ে মোমের আলোর মতো উষ্ণ, একজন বা দুজন মানুষের সাথে একদম খাঁটি ও গভীর সম্পর্ক তৈরি করাই তো আসল জীবন। যে সমাজ আজ মানুষের মন বুঝতে ভুলে গেছে, সেখানে একাকী বোধ করা কোনো অপরাধ বা ত্রুটি নয়—বরং তা আপনার ভেতরে বেঁচে থাকা এক সংবেদনশীল মানুষের স্বাভাবিক আর্তনাদ।