সিএনএন
ডোনাল্ড ট্রাম্প ছবি: সংগৃহীত
গত মঙ্গলবারের নির্বাচনে ভোটাররা প্রত্যাখ্যান করার পর, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায়ে পা রাখছেন। এ সময় তিনি মানসিকভাবে কিছুটা ধাক্কা খেলেও ক্ষমতার ওপর নিজের শক্ত নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে নতুন করে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছেন।
তাঁর সহযোগীরাই স্বীকার করছেন যে, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষের এই সময়টা বেশ ঝামেলার মধ্য দিয়ে যাবে। কারণ, ডেমোক্র্যাট দল কথা রেখেছে—তারা এবার ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতির তদন্ত শুরু করবে। এই রাজনৈতিক লড়াইয়ের মধ্যেই রিপাবলিকান দলের ভেতর ট্রাম্পের পরবর্তী উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যাবে, যা হয়তো ট্রাম্পের নিজের ধারণার চেয়েও দ্রুত ঘটবে।
ক্ষমতায় আসা ডেমোক্র্যাটদের সাথে ট্রাম্প কোনো সমঝোতায় যাবেন কি না—সেটি তিনি পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি। কিছু উপদেষ্টা বলছেন, নিজের মেয়াদ ফুরিয়ে আসার এই সময়ে অসম্ভব সব পক্ষের সাথেও হিসাব মিলিয়ে চলার যে দক্ষতা ট্রাম্পের রয়েছে, তা কাজে লাগতে পারে। তাছাড়া ডেমোক্র্যাটরা এখন আর বিরোধী দলে নেই; দেশ চালানোর মূল দায়িত্ব এখন তাদের কাঁধে। তাই তারাও চাইলে ট্রাম্পের সাথে দরকষাকষিতে আসতে বাধ্য হতে পারে।
তবে আইনসভা ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে তিনি তাদের সাথে কেমন আচরণ করবেন, তা বলতে গিয়ে সম্প্রতি নিজেকে “মিস্টার ভেটো” (যিনি সবকিছুতে না বা ভেটো দিতে পারেন) বলে ডেকেছেন। তাছাড়া, তাঁর প্রথম মেয়াদের রেকর্ড বলে বিরোধী দলের সাথে মিলে কাজ করার বা ছাড় দেওয়ার মানসিকতা তাঁর নেই। ভেতরের এক সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের ঠিক পরের মুহূর্তে তাঁকে কিছুটা নমনীয় মনে হলেও সামনের দিনগুলোতে ডেমোক্র্যাটরা তাঁর সাথে কেমন আচরণ করে, ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া মূলত তার ওপরই নির্ভর করবে।
ওই সূত্রটি জানায়, “কংগ্রেস বা আইনসভা যদি আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা করতে চায়, তবে ট্রাম্পও ছাড় দিতে রাজি আছেন। আর যদি তারা এসেই শুধু তদন্ত আর হয়রানিতে নামে—তবে আপনারা ট্রাম্পের একদম ভিন্ন এক রূপ দেখতে পাবেন।”
মঙ্গলবারের এই ফল কেমন হতে পারে, সে বিষয়ে ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টাদের আগে থেকেই একটা ধারণা ছিল। তবুও রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে এবং দলের প্রধান হিসেবে নিজের একক আধিপত্য দেখাতে তিনি রক্ষণশীল রাজ্যগুলোতে মাসব্যাপী ঝটিকা প্রচার চালিয়েছিলেন। আর এই টানা প্রচারের কারণে তিনি নিজেও বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং কিছুটা বিশ্রাম চাচ্ছিলেন।
তা সত্ত্বেও, এই পরাজয়টি ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে খারাপ খবর। রাজনীতিতে আসার ১০ বছর পর আজ তাঁর গায়ে ‘লেম-ডাক’ বা ক্ষমতা ফুরিয়ে আসা নেতার তকমা লাগতে চলেছে। আর এই পরিস্থিতি থেকেই তিনি নিজের গুরুত্ব টিকিয়ে রাখার নতুন সব উপায় খুঁজছেন। যদিও তাঁর দলের অনেকেই এখন তাঁকে বাদ দিয়েই ভবিষ্যতের দল গঠনের কথা ভাবতে শুরু করেছেন।
এর তাৎক্ষণিক প্রভাব হিসেবে দেখা যেতে পারে ইরানের সঙ্গে নতুন করে উত্তেজনা বা সংঘাত শুরুর সম্ভাবনা। মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হলেই ইরান নিয়ে বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত—এমন ইঙ্গিত ট্রাম্প আগেই দিয়ে রেখেছেন। এদিকে মার্কিন ও ইরানি আলোচকরা নতুন কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন।
কংগ্রেসে অভিবাসন বা সরকারি ব্যয়ের মতো বিষয়গুলোতে আর নতুন আইন পাস করানো যাবে না জেনেই, ট্রাম্পের দল গত কয়েক মাস ধরে বিকল্প উপায় খুঁজছিল। রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠরা বলছেন, নিজের লক্ষ্য অর্জনে এবার তিনি নির্বাহী ক্ষমতা বা একক আদেশের সীমা ছাড়িয়ে যেতেও প্রস্তুত।
অতীতে ভোটারদের অভিযোগ ছিল ট্রাম্প বিদেশ নীতি বা নিজের শখের প্রকল্পগুলোতে বেশি সময় দেন। তবে এখন আর সে সবে তাঁর কোনো বাধা নেই। জানা গেছে, তিনি আগামী সপ্তাহগুলোতে বেশ কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেবেন এবং ওয়াশিংটনে তাঁর নানা নির্মাণকাজে আরও বেশি সময় দেবেন। নির্বাচনের ঠিক পরের দিনই তিনি হোয়াইট হাউসের নতুন বলরুমের কাজ দেখানোর জন্য হঠাৎ এক সংবাদ সম্মেলনের ডাক দিয়েছিলেন।
দুটি কক্ষই ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ার পরও ট্রাম্প নিজের ঘাড়ে এই পরাজয়ের দায় নিতে নারাজ। তিনি বরাবরই বলে আসছেন, মার্কিন রাজনীতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের হেরে যাওয়ার ইতিহাস পুরোনো। যদিও তিনি অনেক প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব বা তহবিল সংগ্রহের দুর্বলতার সমালোচনা করেছেন—অথচ এই প্রার্থীগুলোকেই তিনি নিজে পছন্দ করে টিকিটে এনেছিলেন।
যাঁরা মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ‘ট্রাম্প-কেন্দ্রিক’ করার কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, ব্যক্তিগত আলাপে তাঁদের ওপর ক্ষোভ ঝেড়েছেন তিনি। অতীতের ভুল স্বীকার করার বা শুধরে নেওয়ার স্বভাব তাঁর কদাচিৎই আছে; বরং পরাজয়ের জন্য তিনি অন্যদের ভুল বা জালিয়াতিকেই দায়ী করে থাকেন।
তদন্তের ভয়ে প্রশাসনের অন্দরে প্রস্তুতি ডেমোক্র্যাটরা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেয়েই ট্রাম্প ও তাঁর লোকজনের বিরুদ্ধে সমন জারি করবে এবং একের পর এক শুনানির আয়োজন করবে। নির্বাচনী প্রচারের সময়ই ট্রাম্প হুশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, তাঁকে আবারও অভিশংসনের মুখে পড়তে হতে পারে। জরিপগুলোও বলছে, নির্বাচনের আগে সাধারণ মানুষের মনে দুর্নীতি নিয়ে উদ্বেগ অনেক বেড়ে গিয়েছিল।
ডেমোক্র্যাট নেতা রবার্ট গার্সিয়া হাউস ওভারসাইট কমিটির নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর এক টুইটে কেবল দুই শব্দের এক বার্তা দিয়েছেন—“আইনজীবী ধরুন” (Lawyer up)।
প্রশাসনের আইনি টিম অবশ্য সম্ভাব্য এই তদন্তের প্রস্তুতি মাস কয়েক ধরেই নিচ্ছিল। তবে হোয়াইট হাউসের ভেতরের কিছু কর্মকর্তা যেমন বড় ধরনের প্রস্তুতি আশা করেছিলেন, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেভাবে কাজ শুরু হয়নি। যদিও কিছু কর্মকর্তা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ব্যক্তিগতভাবে আইনজীবী ঠিক করে রেখেছেন।
হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি উইলস প্রথম থেকেই প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এই সম্ভাব্য তদন্তের আলোচনা এড়িয়ে চলতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, এসব নিয়ে মাথা ঘামালে নির্বাচনী প্রচার থেকে মনোযোগ নষ্ট হবে।
ঘনিষ্ঠদের মতে, সুসি উইলস সবসময় বলতেন, “আমরা জিতব এবং আমাদের সমস্ত শক্তি জয়েই ঢেলে দেব।”
যদিও হোয়াইট হাউসের আইনি দলকে তিনি গোপনে বলে রেখেছিলেন ডেমোক্র্যাটদের যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে, তবে কর্মীদের তিনি সাফ নির্দেশ দিয়েছিলেন মূল লক্ষ্যের বাইরে চোখ না রাখতে। ভবিষ্যতে যেকোনো আইনি ঝামেলা বা তদারকি থেকে প্রশাসনকে বাঁচাতে সাম্প্রতিক সময়ে আইনি টিমে আরও ১৫ জন নতুন আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের এক ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা বলেন, “পাগল হয়ে যাওয়া ডেমোক্র্যাটরা যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে শুধু আমাদের জীবন দুর্বিষহ তোলার চেষ্টা করে, তবে তাদের মনে রাখা উচিত—ফেডারেল সরকার এবং এর সমস্ত ক্ষমতা এখনও আমাদের হাতেই রয়েছে।”
অবস্থা বেগতিক দেখে হোয়াইট হাউসের অনেক জুনিয়র কর্মীও নিজেদের আইনি বীমা বা নিজস্ব আইনজীবী খোঁজা শুরু করেছেন। এর আগে ক্যাপিটল হিলে জানুয়ারির ঘটনার তদন্তে পড়ে অনেক চুনোপুঁটি কর্মী যেভাবে হয়রানির শিকার হয়েছিলেন, তা দেখে অনেকে এখন এই চাকরি টিকিয়ে রাখা নিয়েই সংশয়ে আছেন।
কর্মীদের আগাম আইনি সুরক্ষা (প্রেমেপটিভ পার্ডন) দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে হোয়াইট হাউসের আইনজীবী উইল শার্ফ ও ট্রাম্পের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। যদিও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে ট্রাম্প এই সম্ভাবনা উড়িয়েও দেননি।
হোয়াইট হাউসের অন্দরের অনেকেই বিশ্বাস করেন, ডেমোক্র্যাটদের এই তদন্ত নিয়ে ট্রাম্প নিজেও ভেতরে ভেতরে বেশ খারাপ কিছু আশঙ্কা করছেন। কারণ তাঁর প্রথম মেয়াদের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি জানেন অভিশংসনের খড়্গ কাকে বলে।
সংশ্লিষ্ট এক সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, “তিনি তো এর আগেও এটার মুখোমুখি হয়েছেন, তাই খারাপ কিছুর আশঙ্কা তিনি করবেন এটাই স্বাভাবিক।”
খাস কামরায় বিশ্বস্তদের সাথে আলাপে ট্রাম্পও স্বীকার করেছেন যে, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় তাঁর শেষ দুই বছর বেশ কঠিন কাটতে পারে। এক কর্মকর্তা জানান, “তাঁর পরিবার ও সহযোগীদের অতীতে যেভাবে হেনস্তা করা হয়েছে এবং দুটি অভিশংসনের ধকল তাঁকে সইতে হয়েছে, সেগুলোর স্মৃতি তাঁর ভালো করেই মনে আছে।”
তবে প্রকাশ্যে ট্রাম্প বুধবার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, আরেকটি অভিশংসন নিয়ে তাঁর মনে “বিন্দুমাত্র ভয় বা দুশ্চিন্তা নেই।”
হোয়াইট হাউসের বলরুমের সামনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “তারা যদি কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে আবারও অভিশংসন করতে যায়, তবে তা উল্টো ডেমোক্র্যাট দলটাকেই ধূলিসাৎ করে দেবে। কিসের জন্য অভিশংসন? দেশটাকে সফলভাবে গড়ে তোলার অপরাধে?”
অভিবাসন, বাজেট আর শুল্কে একক সিদ্ধান্তই ভরসা হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা ভালোভাবেই জানেন যে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বিরোধীদের হাতে চলে যাওয়ায় বড় কোনো নতুন আইন বা সংস্কার পাস করানো আর সম্ভব নয়। তবে তাঁরা এও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে বেশিরভাগ কাজই কংগ্রেসের তোয়াক্কা না করে সরাসরি নির্বাহী আদেশ বা একাই নিজের ক্ষমতায় করে এসেছেন।
উপদেষ্টারা বলছেন, ডেমোক্র্যাটদের হাতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ যাওয়ার পর এই এককভাবে ক্ষমতা দেখানোর প্রবণতা আরও বাড়বে।
ট্রাম্পের এই নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার বা এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনের মূল চালিকাশক্তি হলেন উপ-চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার এবং বাজেট প্রধান রাসেল ভৌত। অভিবাসন দমন বা সরকারি বড় বড় খাতে বাজেট ছাঁটাইয়ের মতো ট্রাম্পের শুরুর আমলের সেই বিতর্কিত ও কড়া সিদ্ধান্তগুলোর মূল পরিকল্পনা এরাই করেছিলেন।