❒ রাষ্ট্র সংলাপ
ধ্রুব রিপোর্ট
শীতের স্নিগ্ধ সন্ধ্যায় যশোরের সাংস্কৃতিক প্রাণের কেন্দ্রবিন্দু যশোর ইনস্টিটিউটের ভূপতি মঞ্চে এক অনন্য জ্ঞানতাত্ত্বিক আড্ডা বসেছিল। "রাষ্ট্র মহল, যশোর" এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই 'রাষ্ট্র সংলাপ' এর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানসাধক, দার্শনিক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইবনে সিনা। বিষয়বস্তু ছিল—"গ্রিস থেকে বায়তুল হিকমা: জ্ঞানের অনুবাদ, সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ এবং ইসলামী দর্শনের বিকাশ—ইবনে সিনা এর যুক্তি, অস্তিত্ব ও জ্ঞানচিন্তার ধারাবাহিকতা।"
জ্ঞানের এক নিরবচ্ছিন্ন যাত্রা
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কবি ও গবেষক সেলিম রেজা সেলিম এবং প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় ছিলেন কবি জাহিদ আককাজ। মূল আলোচনায় সেলিম রেজা সেলিম দর্শনের এক দীর্ঘ পথপরিক্রমা তুলে ধরেন। তিনি গ্রিক দর্শনের আদি পুরুষ থেলিস থেকে শুরু করে এরিস্টোটল, পরবর্তীতে আল ফারাবির হাত ধরে কীভাবে সেই জ্ঞানধারা ইবনে সিনার কাছে এসে পূর্ণতা পেয়েছিল, তার একটি মনোজ্ঞ চিত্র আঁকেন।
বক্তারা স্মরণ করিয়ে দেন, ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে বুখারার এক ফার্সিভাষী পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মহামনীষী মাত্র ১০ বছর বয়সেই পবিত্র কুরআনের হাফেজ হয়ে ছিলেন। ১৬ বছর বয়সেই তিনি চিকিৎসক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
‘তৃতীয় শিক্ষক’ ও তার অমর সৃষ্টি
সেলিম রেজা সেলিম তার আলোচনায় ইবনে সিনার অমর কীর্তি ১৮ খণ্ডের ‘আশ শিফা’ এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের কালজয়ী গ্রন্থ ‘কানুন ফিত তিব্ব’ এর গুরুত্ব তুলে ধরেন। উল্লেখ্য যে, ‘কানুন ফিত তিব্ব’ গ্রন্থটি সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপের চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাঠ্যবই হিসেবে অবশ্য পাঠ্য ছিল এবং একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ‘বাইবেল’ বা আকরগ্রন্থ হিসেবে গণ্য করা হতো।
ইবনে সিনার বহুমুখী প্রতিভার কথা উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, তিনি শুধু চিকিৎসক বা দার্শনিকই ছিলেন না, বরং একাধারে গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ, পদার্থবিদ, এমনকি সঙ্গীতজ্ঞ ও কবিও ছিলেন। এরিস্টোটল ও আল ফারাবির পর তাকেই বলা হয় দর্শনের ‘তৃতীয় শিক্ষক’। মজার বিষয় হলো, ডারউইনের বহু আগেই তিনি বিবর্তনবাদ নিয়ে নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করেছিলেন।
আধ্যাত্মবাদ ও আধুনিক মনস্কতা
সঞ্চালক কবি জাহিদ আককাজ ইবনে সিনার ধর্মতাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক দর্শনের ওপর আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, ইবনে সিনা বিশ্বাস করতেন আধ্যাত্মবাদের সর্বোচ্চ চূড়ায় স্বয়ং আল্লাহ বিরাজমান। ফলে যারা তাকে কেবল শুষ্ক যুক্তিবিদ বা অবিশ্বাসী হিসেবে তকমা দিতে চান, তাদের ধারণা যে সঠিক নয়, তা আলোচনায় উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে সংহতি প্রকাশ করে কমরেড উজ্জ্বল বিশ্বাস বলেন, “ইবনে সিনা কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানে যে অভাবনীয় সক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন, তাতেই তিনি মানব ইতিহাসে চিরকাল নমস্য হয়ে থাকবেন।”
তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক এই সংলাপে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কমরেড পলাশ, কবি অনিক মযহার, কবি মনির ও তরুণ শিক্ষার্থী জিসানসহ যশোরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
যশোরের এই রাষ্ট্র সংলাপ কেবল একটি আলোচনা সভার মধ্যে সীমাবদ্ধা না, বরং তা শেকড় থেকে শিখরে পৌঁছানোর এক বুদ্ধিবৃত্তিক পথযাত্রা। গ্রিসের দর্শন কীভাবে মুসলিম মনীষীদের হাত ধরে আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল, ইবনে সিনা তার এক অনন্য জীবন্ত উদাহরণ হয়ে আজও প্রাসঙ্গিক।