কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি
হামলার স্বীকার গৃহবধূ নাজমা খাতুন। ছবি: সংগৃহীত
কুপ্রস্তাবে রাজি না হয়ে প্রতিবাদ করায় প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তার ওপর বিবস্ত্র করে একজন মাকে শারীরিক নির্যাতন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুরের জয়দিয়া পালপাড়ায় ৪৫ বছর বয়সী এক মায়ের সাথে মধ্যযুগীয় ভাবে এ বর্বরতা চালানো হয়েছে। ঘটনার বিচার চেয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করা হলে অর্থ-বিত্তের প্রভাব খাটিয়ে রাতে ভুক্তভোগীর বাড়ি ভাংচুর করা হয়েছে। এ ঘটনায় অসহায় দিনমজুর গৃহবধূর সম্ভ্রম ও নিরাপত্তার ওপর নেমে এসেছে চরম হুমকি।
জানা গেছে, পালপাড়ার মল্লিক মন্ডলের ছেলে বিষে মন্ডল দীর্ঘদিন ধরে এলাকার ভুক্তভোগী গৃহবধূ মোছা. নাজমা খাতুনকে (৪৫) কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিল। এর প্রতিবাদ করায় বিষে মন্ডল তার তিন ছেলে— হিলাল, আমির হোসেন ও ইবরাহীম পরিকল্পিতভাবে দেশীয় অস্ত্র ও লাঠি নিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে নাজমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা লাঠিসোঁটা দিয়ে পিটিয়ে নাজমাকে রক্তাক্ত জখম করে পরনের কাপড় ছিঁড়ে ফেলে। এ সময় তার কান ছিঁড়ে দুল, গলার চেইন এবং হাতের মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে উল্লাস করতে করতে চলে যায়।
এ ঘটনায় রক্তাক্ত শরীরে থানায় বিচার চাইতে যান নাজমা খাতুন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে গভীর রাতে বিষে মন্ডল তার দলবল নিয়ে ওই গৃহবধূর বসতভিটায় সশস্ত্র তাণ্ডব চালায় ভাংচুর চালায় একমাত্র ঠাঁই ঘরটুকুতে। এ সময় বোনকে বাঁচাতে ছুঁতে এলে বখাটেদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ভাইকে গুরুতর জখম করা হয়।
গতকাল শুক্রবার (২২ মে) বিকেলে এ পৈশাচিকতায় এলাকাজুড়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন মানুষ। ভুক্তভোগী গৃহবধূ মোছা. নাজমা খাতুন এলাকার নুর আলমের স্ত্রী।
স্থানীয় ও ভুক্তভোগীর পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, জয়দিয়া পালপাড়ার মল্লিক মন্ডলের ছেলে বিষে মন্ডল দীর্ঘদিন ধরেই নাজমা খাতুনকে একা পেলেই নানা রকম কুপ্রস্তাব ও কু-ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল। লোকলজ্জা আর চরম দারিদ্র্যের কারণে এতদিন মুখ বুজে অশ্রু বিসর্জন দিলেও গত শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে নাজমা ধৈর্য হারিয়ে মুখে প্রতিবাদ করলে এ ঘটনা ঘটানো হয়।
নাজমা ফুফাতো বোনের বাড়ি যাবার পথে রাস্তার মোড়ে বিষে মন্ডল তার পথরোধ করে নোংরা ভাষা ব্যবহার শুরু করে। নাজমা এর প্রতিবাদ করতেই বিষে মন্ডলের তিন ছেলে— হিলাল, আমির হোসেন ও ইবরাহীম পরিকল্পিতভাবে ছুটে আসে। চারজন মিলে প্রকাশ্য দিবালোকে নাজমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, লাঠিসোঁটা দিয়ে পিটিয়ে শরীর রক্তাক্ত করার পাশাপাশি ছিঁড়ে ফেলা হয় তার পরনের কাপড়। এ সময় তার কান ছিঁড়ে দুল, গলার চেইন এবং হাতের মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে উল্লাস করতে করতে চলে যায় নরপশুরা।
রক্তাক্ত ও বিধ্বস্ত অবস্থায় নাজমা খাতুন ওই বিকেলে স্থানীয় সাফদারপুর পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে অশ্রুভেজা চোখে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু অভিযোগ দিয়ে ফাঁড়ি থেকে বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই বিষে মন্ডল ও তার বখাটে ছেলেরা বাড়ি ভাঙ্গার ঘটনা ঘটায়।
নির্যাতিতা নাজমা খাতুন বলেন, "আমি গরিব দিনমজুরের বউ বলে লম্পট বিষে মন্ডল দীর্ঘদিন ধরে আমার ইজ্জতের ওপর নজর দিয়েছিল। লোকলজ্জায় কাউকে বলিনি। কিন্তু কাল যখন আল্লাহর দরবারে বিচার দিয়ে ওর মুখের ওপর প্রতিবাদ করলাম, ওরা আমাকে রাস্তার মাঝে বিবস্ত্র করে মারল। থানায় গেলাম বিচারের আশায়, ফিরে আসার পর রাতে ঘরবাড়ি ভেঙে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে ওরা। আমার ভাইয়ের রক্তে উঠান ভেসে গেছে। আমরা গরিব বলে কি বিচার পাব না? আমি এই জানোয়ারদের ফাঁসি চাই!"
ঘটনার পর প্রধান অভিযুক্ত বিষে মন্ডলের সাথে যোগাযোগ করা হলে সে অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে পুরো ঘটনাটিকে অস্বীকার করে এবং সাংবাদিকদের বলেন, "আমাদের সাথে সামান্য কথা কাটাকাটি হয়েছিল, মারধর বা ভাঙচুরের কোনো ঘটনা ঘটেনি। পারিবারিক শত্রুতার জেরে আমাদের ফাঁসাতে এসব নাটক সাজানো হচ্ছে।"
তবে জয়দিয়া পালপাড়ার ক্ষুব্ধ প্রতিবেশীরা বিষে মন্ডলের এই দাবিকে চরম মিথ্যাচার বলেছেন। এলাকাবাসী জানান, ভুক্তভোগী পরিবারটি অত্যন্ত নিরীহ ও দিনমজুর। অন্যদিকে অভিযুক্তরা অর্থ ও পেশী শক্তিতে প্রভাবশালী হওয়ায় এলাকায় প্রায়ই এমন ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। একজন নারীর শ্লীলতাহানি ও পুরো পরিবারকে রক্তাক্ত করার এই ঘটনার পর অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে এখন ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী।
সাফদারপুর পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত ভয়াবহ। একজন নারীর ওপর এই বর্বরতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই আসামিরা পলাতক রয়েছে, তবে তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত আছে।
ধ্রুব/এস.আই