ক্রীড়া ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
জিম্বাবুয়ে আর জয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে তখন কেবল মেহেদী হাসান মিরাজ। বাংলাদেশের শেষ আশাও তিনিই। কিন্তু পারলেন না সেই আশার প্রতিদান দিতে। বাংলাদেশের অধিনায়ককে ফিরিয়ে সতীর্থদের নিয়ে বাঁধনহারা উদযাপনে মেতে উঠলেন জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক রিচার্ড এনগারাভা। গ্যালারিতে বয়ে গেল উল্লাসের জোয়ার। টিভি ক্যামেরায় ফুটে উঠল বাংলাদেশের ড্রেসিং রুমের ব্যালকনিও। সবাই সেখানে স্তব্ধ, একেকজন যেন মূর্তি!
অথচ শেষের ওই নাটকীয়তার আগেই ম্যাচটি জিততে পারত বাংলাদেশ। জেতার ক্ষেত্রও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু যতবারই মনে হচ্ছিল ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে, ততবারই একজন করে ব্যাটসম্যান উইকেট হারান হঠকারী শটে। সেটিই ডেকে আনে পতন। উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে দারুণ লড়াইয়ে ১৩ রানে জিতে সিরিজও জিতে নেয় জিম্বাবুয়ে।
আগের ম্যাচে ১৪২ রান তাড়ায় মিরাজের দল হেরে গিয়েছিল ২৫ রানে। জিম্বাবুয়ের কাছে এই নিয়ে টানা দুটি সিরিজে হারল বাংলাদেশ। হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে বৃহস্পতিবার জিম্বাবুয়ে ৫০ ওভারে তোলে ২৪৭ রান। বাংলাদেশ ১১ বল আগে গুটিয়ে যায় ২৩৪ রানে। বোলিং-ব্যাটিং দুই ইনিংসেই একসময় লাগাম ছিল পুরোপুরি বাংলাদেশের কাছে। জিম্বাবুয়ের রান এক পর্যায়ে ছিল ৬ উইকেটে ১৪৮। সেখান থেকে ৮৩ বলে ৯৯ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়েন বেন কারান ও ব্র্যাড ইভান্স। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খেলে ১৩৫ বলে ১১১ রানে অপরাজিত থাকেন কারান। যার মূল কাজ বোলিং, সেই ইভান্স আটে নেমে পাঁচ ছক্কায় করেন ৩৩ বলে ৫৮ রান। বলার অপেক্ষা রাখে না, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার প্রথম ফিফটি এটি।
রান তাড়ায় বাংলাদেশের সংগ্রহ ৩৬ ওভার শেষে ছিল ৩ উইকেটে ১৬৯। এমনকি এক পর্যায়ে ৪৯ বলে প্রয়োজন ছিল ৪১ রান, উইকেট বাকি ৫টি। সেখান থেকেই পথ হারিয়ে জয়ের ঠিকানায় আর পৌঁছতে পারেনি তারা।
বাংলাদেশের রান তাড়া শুরু হয় সৌম্য সরকারের (৫) আরেকটি ব্যর্থতা দিয়ে। ব্লেসিং মুজারাবানির দুর্দান্ত ডেলিভারিতে ধরা পড়েন তিনি স্লিপে। এই নিয়ে টানা তিন ওয়ানডেতে আউট হলেন তিনি দু অঙ্ক ছোঁয়ার আগে। দ্রুত তাকে অনুসরণ করেন নাজমুল হোসেন শান্তও (৯)।
ধাক্কা সামলে দলকে এগিয়ে নেন তানজিদ হাসান ও তাওহিদ হৃদয়। তৃতীয় উইকেটে ৮৪ রানের জুটি গড়েন দুজন।
রানের গতি ধরে রাখেন তানজিদ, উইকেট আগলে রাখেন হৃদয়। কোনো বোলারই তাদেরকে খুব একটা অস্বস্তিতে ফেলতে পারেনি। জুটি ভাঙতে পার্ট টাইমার ব্রায়ান বেনেটকে আনেন জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক। কাজ হয় তাতেই।
৫৭ বলে ফিফটি ছুঁয়ে কোনো উদযাপন করেননি তানজিদ। মনে হচ্ছিল, বড় কিছুর জন্য তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু সেটি ভুল প্রমাণিত একটু পরই। ৫৫ রানে সিকান্দার রাজার বলে আউট হয়েই গিয়েছিলেন বলে মনে হচ্ছিল। আউট দেননি আম্পায়ার। ৫৭ রানে তিনি বোল্ড হয়ে যান সাদামাটা অফ স্পিনে স্লগ করার চেষ্টায়। প্রথম ওয়ানডে উইকেটের স্বাদ পান বেনেট।
তখনও ঠিক বিপদ আসেনি। হৃদয় ও নুরুল হাসান সোহান গড়েন তোলেন আরেকটি জুটি। অনায়াসেই লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছিল দল। ৮৩ বলে ফিফটি করেন হৃদয়।
তার প্রয়োজন ছিল শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা। কিন্তু আউট হয়ে যান সাধারণ এক ডেলিভারিতে। ওয়েসলি মাধেভেরের ডেলিভারিটি ছিল একদমই শর্ট, অন সাইডে যে কোনো জায়গায় খেলার মতো। কিন্তু হৃদয় ক্যাচ তুলে দেন সোজা ফিল্ডারের হাতে (৯০ বলে ৬০)।
পরের ওভারে মোসাদ্দেক হোসেন বাজে শটে আউট হয়ে বিপদে ফেলে দেন দলকে। মিরাজও ক্রিজে গিয়ে ঠিক একই ধরনের শটে আউট প্রায় হয়েই যাচ্ছিলেন। তবে টিকে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন সোহানের সঙ্গে। আবারও মনে হচ্ছিল, ম্যাচ বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে।
কিন্তু তানজিদ-হৃদয়দের পথেই হাঁটেন সোহান। রিচার্ড এনগারাভাকে পুল করে চার মারার পরের বলে আবার একই শট খেলেন। তবে আগের ডেলিভারি ছিল রাউন্ড দা উইকেটে করা, পরেরটি ওভার দা উইকেটে। সেই অ্যাঙ্গলেই সর্বনাশ। ধরা পড়েন তিনি ফাইন লেগে (৪১ বলে ৩৮)।
রিশাদ হোসেনের কাজ ছিল মিরাজকে সঙ্গ দেওয়া। কিন্তু তিনি উইকেট ছুড়ে দেন বড় শটের চেষ্টায়। অধিনায়ককে ভরসা জোগাতে পারেননি তাসকিন আহমেদও।
শরিফুল ইসলাম গিয়ে একটি বাউন্ডারি মারেন। কিন্তু দারুণ ডেলিভারিতে তাকে বোল্ড করে দেন ইভান্স। দল তাকিয়ে ছিল তখন মিরাজের ব্যাটে। কিন্তু ১২ বলে যখন প্রয়োজন ১৪ রান, তখনই আউট হয়ে যান তিনি এনগারাভার বল পুল করে।
২৭ রানে শেষ ৫ উইকেট হারায় বাংলাদেশ।
ম্যাচের শুরুটা বাংলাদেশের ছিল দুর্দান্ত। প্রথম ওভারেই তাসকিনের ভেতরে ঢোকা ডেলিভারিতে ডিগবাজি খায় ব্রায়ান বেনেটের মিডল স্টাম্প। অভিজ্ঞ পেসারের পরের ওভারেই বাজে শটে উইকেট হারান ইনোসেন্ট কাইয়া।
কারানের উইকেট ধরা দিতে পারত এরপরই। কিন্তু মুস্তাফিজুর রহমানের বদলে একাদশে ফেরা শরিফুল ইসলামের বলে কঠিন ক্যাচটি নিতে পারেননি তাওহিদ হৃদয়। একটু পর সরাসরি থ্রোয়ে কারানকে রান আউট করার সুযোগও হাতছাড়া করে বাংলাদেশ।
কারান টিকে গেলেও তৃতীয় উইকেট আসতে দেরি হয়নি খুব। নাহিদ রানার ফুল লেংথ বলে উড়ে যায় ক্রেইগ আরভিনের স্টাম্প।
৩২ রানে ৩ উইকেট হারানো জিম্বাবুয়েকে কিছুটা টেনে নেন কারান ও ওয়েসলি মাধেভেরে। এই জুটি থামে ৩৪ রানে। মেহেদী হাসান মিরাজের বলে ছক্কার চেষ্টায় উইকেট উপহার দেন মাধেভেরে (১৫)।
পরের জুটিতে এর দ্বিগুণ রান যোগ করেন কারান ও সিকান্দার রাজা।
বাউন্ডারির দিকে ঝোঁক খুব একটা ছিল না কারানের। রান বাড়ান তিনি সিঙ্গলস-ডাবলস নিয়ে। ধীরস্থির ব্যাটিংয়ে তাকে সঙ্গ দেন সিকান্দার রাজা।
হুট করেই একটু মনোযোগ হারিয়ে মিরাজের নীরিহ এক ডেলিভারিতে শর্ট কাভারে ক্যাচ দিয়ে বসেন রাজা (৫৩ বলে ৩৩)।
এরপর রিশাদ হোসেন যখন ফেরালেন ক্লাইভ মাডান্ডেকে, দুইশ রান তখন জিম্বাবুয়ের জন্য অনেক দূরের পথ। কারান টিকে থাকলেও স্বীকৃত ব্যাটসম্যান ছিল না আর একজনও।
কিন্তু দলের প্রয়োজনে ব্যাটসম্যান হয়ে উঠলেন ইভান্স। গড়ে উঠল দারুণ জুটি।
তাসকিনকে টানা দুটি বাউন্ডারিতে কারান শতরানে পা রাখেন ১২২ বলে। ইংল্যান্ডের টম ও স্যাম কারানের মেজো ভাই জিম্বাবুয়ের হয়ে দুটি সেঞ্চুরি করলেন ১০ ওয়ানডেতেই।
শতরানের পর সেভাবে ঝড় তুলতে পারেননি কারান। তবে আরেকপ্রান্তে পুষিয়ে দেন ইভান্স। নাহিদ রানাকে ছক্কা মারেন তিনি, চার মারেন শরিফুলকে। শেষ ওভারে তিনি পেয়ে বসেন তাসকিনকে। তিন ছক্কা ও এক চারে ওই ওভার থেকে নেন ২২ রান!
বাংলাদেশ ম্যাচ হেরেছে ১৩ রানে। বলা যেতেই পারে, ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে ওই ওভারও।
সিরিজের শেষ ম্যাচ শনিবার।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
জিম্বাবুয়ে: ৫০ ওভারে ২৪৭/৬ (বেনেট ০, কারান ১১১*, কাইয়া ৪, আরভিন ৯, মাধেভেরে ১৫, রাজা ৩৩, মাডান্ডে ৪, ইভান্স ৫৮*; তাসকিন ১০-২-৫৭-২, শরিফুল ১০-০-৫০-০, নাহিদ ১০-১-৪৮-১, মিরাজ ১০-১-৩২-২, রিশাদ ৮-০-৪০-১, মোসাদ্দেক ২-০-১৩-০)
বাংলাদেশ: ৪৮.১ ওভারে ২৩৪ (তানজিদ ৫৭, সৌম্য ৫, শান্ত ৯, হৃদয় ৬০, সোহান ৩৮, মোসাদ্দেক ৭, মিরাজ ২৭, রিশাদ ৮, তাসকিন ০, শরিফুল ৬, নাহিদ ০*; এনগারাভা ৯.১-০-৫৫-৩, মুজারাবানি ১০-২-৩৩-২, ইভান্স ৯-০-৪৮-২, নিয়ামুরি ৪-০-২০-০, রাজা ৯-০-৫১-১, বেনেট ৩-০-১৩-১, মাধেভেরে ৪-১-১২-১)।
ফল: জিম্বাবুয়ে ১৩ রানে জয়ী।
সিরিজ: তিন ম্যাচ সিরিজে জিম্বাবুয়ে ২-০তে এগিয়ে।
ম্যান অব দা ম্যাচ: বেন কারান।