Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

বিশ্বজুড়ে ব্যাংক জালিয়াতি : সুরক্ষায় যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে

ড. মো. মেসবাই উদ্দীন ড. মো. মেসবাই উদ্দীন
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই,২০২৬, ০৯:০২ এ এম
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই,২০২৬, ১২:০৪ এ এম
বিশ্বজুড়ে ব্যাংক জালিয়াতি : সুরক্ষায় যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে

​আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে যে ব্যবস্থার জন্ম, তার নাম ব্যাংকিং। অথচ আধুনিক সভ্যতায় এই আস্থার দেয়ালেই সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসছে ভেতর থেকে। যুগে যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে ঘটে যাওয়া বড় বড় জালিয়াতি এবং লুটপাট কেবল বিপুল অঙ্কের অর্থই গ্রাস করেনি, বরং ধস নামিয়েছে একেকটি দেশের অর্থনীতিতে। ২০০৮ সালের যুক্তরাষ্ট্রের লেম্যান ব্রাদার্স পতন কিংবা বার্নি ম্যাডফের পনজি স্কিম থেকে শুরু করে মালয়েশিয়ার ওয়ান-এমডিবি তহবিল কেলেঙ্কারি—প্রতিটি ঘটনাই প্রমাণ করেছে যে, লোভ আর নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করার সংস্কৃতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তবে ইতিহাস শুধু পতনের গল্প বলে না, তা ঘুরে দাঁড়ানোর শিক্ষাও দেয়। এসব বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে বৈশ্বিক ব্যাংকিং খাত তাদের সুরক্ষার দেয়াল শক্ত করতে কী ধরনের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সেখানে কী বার্তা লুকিয়ে আছে, তা আজ গভীরভাবে খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।

​বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত এবং বড় কিছু ব্যাংকিং ও আর্থিক জালিয়াতির বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

 লেম্যান ব্রাদার্স পতন (যুক্তরাষ্ট্র, ২০০৮)

​ক্ষতির পরিমাণ : প্রায় ৬০০ বিলিয়ন (৬০,০০০ কোটি) মার্কিন ডলার।

​এটি কেবল একটি ব্যাংকের পতন ছিল না, বরং পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা (Great Recession) ডেকে এনেছিল। ১৮৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের চতুর্থ বৃহত্তম এই বিনিয়োগ ব্যাংকটি আবাসন খাতে (Subprime Mortgage) অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ দিয়েছিল।

​লুটপাট ও জালিয়াতির কৌশল : ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তারা তাদের আর্থিক সংকটের আসল রূপ লুকাতে "Repo 105" নামক একটি অ্যাকাউন্টিং কৌশলের আশ্রয় নেন। এর মাধ্যমে তারা সাময়িকভাবে তাদের বিপুল পরিমাণ ঋণ বা দায়কে (Liabilities) 'সম্পদ বিক্রি' হিসেবে ব্যালেন্স শিটে দেখাতেন, যাতে বিনিয়োগকারীরা মনে করেন ব্যাংকটি লাভজনক অবস্থানে আছে।

​পরিণতি : ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যখন ব্যাংকটি দেউলিয়া ঘোষণা করে, তখন বিশ্ব শেয়ার বাজারে ধস নামে এবং লাখ লাখ মানুষ চাকরি ও বাসস্থান হারায়।

বার্নি ম্যাডফ-এর পনজি স্কিম (যুক্তরাষ্ট্র, ২০০৮)

​ক্ষতির পরিমাণ : প্রায় ৬৫ বিলিয়ন (৬,৫০০ কোটি) মার্কিন ডলার।

​বার্নার্ড ম্যাডফ (Bernie Madoff) ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক (NASDAQ) স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক চেয়ারম্যান এবং একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পনজি স্কিম (আগের বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য নতুন বিনিয়োগকারীদের টাকা ব্যবহার করা) পরিচালনা করেছিলেন।

​জালিয়াতির কৌশল : ম্যাডফ তার বিনিয়োগকারীদের বছরের পর বছর ধরে নিশ্চিত এবং অস্বাভাবিক উচ্চ মুনাফা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতেন। বাস্তবে তিনি কোনো শেয়ার বাজারে ব্যবসাই করতেন না। নতুন গ্রাহকরা যে টাকা জমা রাখতেন, তা দিয়েই পুরানো গ্রাহকদের 'লভ্যাংশ' দিতেন। প্রভাবশালী ও বিশ্বস্ত ভাবমূর্তির কারণে বড় বড় ব্যাংক, দাতব্য সংস্থা এবং ধনী ব্যক্তিরা তাকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করেছিলেন।

​পরিণতি : ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার সময় অনেক বিনিয়োগকারী একসাথে তাদের আসল টাকা তুলতে গেলে এই বিশাল মিথ্যা ফাঁস হয়ে যায়। ম্যাডফকে ১৫০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং ২০২১ সালে তিনি কারাগারেই মারা যান।

ওয়ান-এমডিবি (1MDB) কেলেঙ্কারি (মালয়েশিয়া, ২০১৫)

​ক্ষতির পরিমাণ: প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন (৪৫০ কোটি) মার্কিন ডলার।

​এটি ছিল একটি রাষ্ট্রীয় তহবিল লুটপাটের ঘটনা, যার সাথে মালয়েশিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক এবং গোল্ডম্যান স্যাকসের মতো বৈশ্বিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা সরাসরি জড়িত ছিলেন। '১মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বারহাদ' (1MDB) নামক এই তহবিলটি গঠন করা হয়েছিল দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য।

​লুটপাটের কৌশল : বন্ড বা ঋণ জারির মাধ্যমে সংগৃহীত কোটি কোটি ডলার বিভিন্ন ভুয়া শেল কোম্পানি (কাগুজে প্রতিষ্ঠান) এবং অফশোর ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পাচার করা হয়। এই টাকা দিয়ে বিলাসবহুল রিয়েল এস্টেট, নামী দামী পেইন্টিং, ব্যক্তিগত বিমান এবং এমনকি হলিউডের সিনেমা (যেমন: The Wolf of Wall Street) অর্থায়ন করা হয়েছিল।

​পরিণতি : এই কেলেঙ্কারির জেরে প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের পতন ঘটে এবং পরবর্তীতে তাকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গোল্ডম্যান স্যাকস ব্যাংককে আন্তর্জাতিক তদন্তের মুখে বিলিয়ন ডলার জরিমানা দিতে হয়।

 ব্যারিংস ব্যাংক ধস (যুক্তরাজ্য/সিঙ্গাপুর, ১৯৯৫)

​ক্ষতির পরিমাণ : প্রায় ১.৩ বিলিয়ন (১৩০ কোটি) মার্কিন ডলার।

​১৭৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ রাজপরিবারের পছন্দের ব্যাংক 'ব্যারিংস ব্যাংক' (Barings Bank) মাত্র একজন মানুষের জালিয়াতির কারণে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। সেই ব্যক্তির নাম ছিল নিক লিসন (Nick Leeson)।

​জালিয়াতির কৌশল : নিক লিসন সিঙ্গাপুর শাখায় ব্যাংকের ফিউচার ট্রেডিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ব্যাংকের অনুমতি ছাড়াই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অননুমোদিত ফিউচার মার্কেটে বাজি ধরতে শুরু করেন। যখন তার বিশাল লস হতে থাকে, তখন তিনি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে "88888" নামের একটি গোপন অ্যাকাউন্টে সেই লোকসান লুকিয়ে রাখেন।

​পরিণতি : ১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে জাপানের কোবে ভূমিকম্পের কারণে লিসনের শেষ আশাটুকুও শেষ হয়ে যায় এবং ব্যাংকের লোকসান কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ব্রিটেনের অন্যতম প্রাচীন এই মার্চেন্ট ব্যাংকটি মাত্র ১ পাউন্ডের বিনিময়ে ডাচ ব্যাংক আইএনজি (ING)-এর কাছে বিক্রি হয়ে যেতে বাধ্য হয়।

আরও পড়ুন-

ব্যাংকিং খাতে  সংকট,  উত্তরণে যা করণীয় ব্যাংকিং খাতে  সংকট,  উত্তরণে যা করণীয়

 

ওয়্যারকার্ড স্কিম (জার্মানি, ২০২০)

​ক্ষতির পরিমাণ : প্রায় ২ বিলিয়ন ইউরো।

​ওয়্যারকার্ড (Wirecard) ছিল জার্মানির একটি শীর্ষস্থানীয় ফিনটেক ও ডিজিটাল পেমেন্ট প্রসেসিং ব্যাংক। এটিকে জার্মানির প্রযুক্তির জগতের "পোস্টার চাইল্ড" মনে করা হতো।

​জালিয়াতির কৌশল : ব্যাংকটির ব্যালেন্স শিটে দেখানো হয়েছিল যে ফিলিপাইনের বিভিন্ন ব্যাংকের ট্রাস্ট অ্যাকাউন্টে তাদের প্রায় ১.৯ বিলিয়ন ইউরো ক্যাশ রিজার্ভ জমা আছে। কিন্তু ২০২০ সালে অডিট করতে গিয়ে দেখা যায়, আসলে ফিলিপাইনের সেই ব্যাংকগুলোতে ওয়্যারকার্ডের কোনো অস্তিত্বই নেই! পুরো টাকাটাই ছিল স্রেফ কাগজ-কলমে বানানো ভুয়া সম্পদ।

​পরিণতি : কোম্পানিটি সাথে সাথে দেউলিয়া হয়ে যায়, এর সিইও গ্রেফতার হন এবং চিফ অপারেটিং অফিসার ক্রিস্টাল জানমারশেক কোটি কোটি টাকা নিয়ে রাতারাতি হাওয়া হয়ে যান (যার খোঁজ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি)।

বিশ্বের এই বড় বড় ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরে কড়া নিয়মকানুন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারি এবং শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে যেকোনো মুহূর্তেই আমানতকারীদের টাকা লুট হয়ে যেতে পারে।

ব্যাংক কেলেঙ্কারি ও লুটপাটের পর গৃহীত ব্যবস্থা 

বিশ্বের এই বড় বড় ব্যাংকিং কেলেঙ্কারি এবং ধসের পর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বিচার বিভাগ তীব্র ধাক্কা খেয়েছিল। ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, সেজন্য তারা আইনি কাঠামো পরিবর্তন, কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করেছিল।

 রাষ্ট্র ও ব্যাংকগুলো যে  পদক্ষেপ নিয়েছিল-

লেম্যান ব্রাদার্স পতন ও ২০০৮-এর মন্দার পর যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ 

​যুক্তরাষ্ট্র সরকার এবং ফেডারেল রিজার্ভ (केंद्रीय ব্যাংক) এই ধসের পর পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিয়মকানুন আমূল বদলে ফেলে।

​ডড-ফ্রাঙ্ক ওয়াল স্ট্রিট রিফর্ম আইন (Dodd-Frank Act, 2010): এটি যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ইতিহাসের অন্যতম কঠোর আইন। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর ওপর নজরদারি বহুগুণ বাড়ানো হয়।

​ভলকার রুল (Volker Rule) : ডড-ফ্রাঙ্ক আইনের অধীনে এই নিয়মটি তৈরি হয়। এর মূল কথা হলো—বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাধারণ মানুষের আমানতের টাকা দিয়ে শেয়ার বাজার বা ঝুঁকিপূর্ণ ডেরিভেটিভস মার্কেটে নিজেদের লাভের জন্য কোনো বাজি (Proprietary Trading) ধরতে পারবে না।

​স্ট্রেস টেস্ট (Stress Test) : কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতি বছর বড় বড় ব্যাংকগুলোর "স্ট্রেস টেস্ট" নেওয়া শুরু করে। এর উদ্দেশ্য হলো—ভবিষ্যতে যদি আবার বড় কোনো অর্থনৈতিক মন্দা আসে, তবে সেই ধাক্কা সামলানোর মতো পর্যাপ্ত ক্যাশ বা মূলধন ব্যাংকের কাছে আছে কি না, তা পরীক্ষা করা।

​বেইল-আউট ও তারল্য সহায়তা : সরকার 'TARP' (Troubled Asset Relief Program) ফান্ডের মাধ্যমে অন্যান্য ডুবন্ত ব্যাংককে বাঁচাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের জরুরি তহবিল সরবরাহ করে, যাতে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে না পড়ে।

বার্নি ম্যাডফ কেলেঙ্কারির পর ব্যবস্থা 

​ম্যাডফের পনজি স্কিমটি ধরতে না পারায় যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা SEC (Securities and Exchange Commission) তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।

​SEC-এর ভেতরের সংস্কার : ম্যাডফ কাণ্ডের পর SEC তাদের অডিট এবং তদন্ত দল পুরোপুরি পুনর্গঠন করে। তারা আধুনিক প্রযুক্তি এবং ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার শুরু করে, যাতে অস্বাভাবিক কোনো মুনাফার গ্রাফ দেখলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরা পড়ে।

​হুইসেলব্লোয়ার (Whistleblower) বা তথ্যদাতার পুরস্কার : কোনো প্রতিষ্ঠানের ভেতরের জালিয়াতি যদি কেউ এসে সরকারকে আগে জানায়, তাকে পুরস্কৃত করার এবং আইনি সুরক্ষা দেওয়ার নিয়ম কঠোর করা হয়।

​সম্পদ পুনরুদ্ধার : মার্কিন আদালত একজন ট্রাস্টি নিয়োগ করে ম্যাডফের ফ্রিজ করা সম্পদ, বিলাসবহুল বাড়ি, গাড়ি এবং নৌকা নিলামে তোলে। প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার পুনরুদ্ধার করে প্রতারিত বিনিয়োগকারীদের আংশিকভাবে ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।

ওয়ান-এমডিবি (1MDB) কেলেঙ্কারির পর মালয়েশিয়া ও বৈশ্বিক পদক্ষেপ 

​এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করায় একাধিক দেশ একসঙ্গে ব্যবস্থা নিয়েছিল।

​রাজনৈতিক ও বিচারিক ব্যবস্থা (মালয়েশিয়া) : ২০১৮ সালে সরকার পরিবর্তনের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ এই জালিয়াতির তদন্ত গতিশীল করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং আদালত তাকে ১২ বছরের কারাদণ্ড ও বিপুল জরিমানা দেয়।

​গোল্ডম্যান স্যাকস-এর জরিমানা : মার্কিন বিচার বিভাগ (DOJ) এবং মালয়েশিয়া সরকারের তদন্তের মুখে মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস নিজেদের দোষ স্বীকার করতে বাধ্য হয়। তারা মালয়েশিয়াকে ৩.৯ বিলিয়ন ডলার এবং মার্কিন সরকারকে ২.৯ বিলিয়ন ডলার জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়।

​ব্যাংক বন্ধ ও নিষেধাজ্ঞা : সিঙ্গাপুরের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই অর্থ পাচারের সাথে জড়িত থাকার দায়ে সুইজারল্যান্ডের দুটি ব্যাংক (BSI এবং Falcon Bank)-এর সিঙ্গাপুর শাখা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়।

 ব্যারিংস ব্যাংক ধসের পর যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের পদক্ষেপ 

​মাত্র একজন ট্রেডারের কারণে পুরো ব্যাংক ধসে যাওয়ার এই ঘটনাটি ব্যাংকিং জগতের চোখ খুলে দিয়েছিল।

​ফ্রন্ট অফিস ও ব্যাক অফিসের বিভাজন : আগে নিক লিসন নিজেই ট্রেড করতেন (ফ্রন্ট অফিস) এবং নিজেই সেই ট্রেডের হিসাব রাখতেন (ব্যাক অফিস)। এই ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে নিয়ম করা হয় যে—যিনি ট্রেড করবেন, তিনি কোনোভাবেই ব্যাক অফিসের হিসাব বা সেটেলমেন্টের দায়িত্বে থাকতে পারবেন না। দুটি সম্পূর্ণ আলাদা দল হতে হবে।

​ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা (Risk Management) : ব্যাংকগুলো একজন 'চিফ রিস্ক অফিসার' (CRO) নিয়োগ করা বাধ্যতামূলক করে, যার কাজই হলো প্রতিদিন ব্যাংক কত টাকা ঝুঁকির মধ্যে রাখছে তা তদারকি করা।

​অপরাধীর সাজা : নিক লিসনকে সিঙ্গাপুরের আদালত সাড়ে ৬ বছরের কারাদণ্ড দেয়।

ওয়্যারকার্ড স্কিমের পর জার্মানির ব্যবস্থা 

​জার্মানির আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা BaFin এই জালিয়াতি ধরতে না পারায় দেশের ভাবমূর্তি ভীষণভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছিল।

​নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধানের পদত্যাগ : তীব্র সমালোচনার মুখে BaFin-এর তৎকালীন প্রধান ফেলিক্স হুফেল্ড পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। জার্মান সরকার BaFin-কে আরও বেশি ক্ষমতা দেয়, যাতে তারা যেকোনো কোম্পানির অ্যাকাউন্টে সরাসরি ঢুকে ফরেনসিক অডিট করতে পারে।

​অডিট ফার্মের ওপর কড়াকড়ি : ওয়্যারকার্ডের অডিটর ছিল বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান EY (Ernst & Young)। তারা বছরের পর বছর ভুয়া অ্যাকাউন্ট ধরতে না পারায় জার্মানির অ্যাকাউন্টিং ওয়াচডগ তাদের ওপর বড় অঙ্কের জরিমানা এবং নতুন কোনো বড় কোম্পানির অডিট করার ক্ষেত্রে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

বিশ্বজুড়ে ব্যাংকিং খাতের ৩টি প্রধান পরিবর্তন

​১. কঠোর ক্যাশ রিজার্ভ (Basel III) : আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি 'নিরাপদ মূলধন' বা ক্যাশ রিজার্ভ রাখতে হয়, যেন হুট করে কোনো সংকট হলে ব্যাংক দেউলিয়া না হয়।

​২. মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ (AML/KYC) : যেকোনো ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে বা বড় লেনদেন করতে এখন KYC (Know Your Customer) এবং AML (Anti-Money Laundering) নিয়ম অত্যন্ত কড়াকড়িভাবে পালন করা হয়, যাতে ভুয়া কোম্পানি খুলে টাকা পাচার করা কঠিন হয়।

​৩. অটোমেটেড নজরদারি : বর্তমানে আধুনিক ব্যাংকগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে প্রতি সেকেন্ডের লেনদেন ট্র্যাক করে। কোনো অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন দেখলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ট জারি হয়।

এতক্ষণ আমরা দেখলাম, ব্যাংক জালিয়াতি কোনো একক দেশের বা একক সময়ের সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক ব্যাধি। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যরিংস ব্যাংকের পতন বা জার্মানির ওয়্যারকার্ড কেলেঙ্কারির মতো ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো যেভাবে তাদের অডিট ব্যবস্থা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আইনি কাঠামোকে আমূল বদলে ফেলেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। 'ডড-ফ্রাঙ্ক আইন' বা 'বাসেল-৩'-এর মতো বৈশ্বিক নীতিমালাগুলো তৈরিই হয়েছে এমন ক্ষত থেকে শিক্ষা নিয়ে। আজ যখন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশ তাদের ব্যাংকিং খাতের ক্ষত নিরাময়ে নতুন করে সংস্কারের লড়াই করছে, তখন এই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাগুলোই হতে পারে আমাদের পথপ্রদর্শক। শুধু লোকদেখানো আইন কিংবা সাময়িক তদন্ত কমিটি গঠন করে এই লুটপাট ঠেকানো যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর ও স্বাধীন নজরদারি এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। আমানতকারীদের প্রতিটি টাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন অসম্ভব। তাই বিশ্বজুড়ে নেওয়া সফল পদক্ষেপগুলোর আলোকেই আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা অনিয়ম দূর করে আস্থার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে হবে।"

লেখক: গবেষক ও একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)