❒ মুক্তগদ্য
সৈয়দ আহসান কবীর
কবি টিটো জামান। আমার মামা। ছেলেবেলায় মামা একদিন তার কাঁধে চড়িয়েছিলেন। কাঁধে চড়িয়ে তারই লেখা অনেকগুলো ছড়াও শুনিয়েছিলেন। ভালো লেগেছিল। সেই ভালো লাগাই এক সময় আমাকে শব্দসাধনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। যদ্দুর মনে পড়ে, তখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি।
এরপর স্কুলের শিক্ষক-বন্ধুরা কবি বলে ডাকলে ভালো লাগতো। সেই থেকেই লেখায় থেকে যাওয়া। মনে হয়, এ কারণেই লিখতাম।
তারপর যখন শব্দকে উপলব্ধি করা শুরু করলাম, যখন কবিতাকে বুঝতে শুরু করলাম, যখন মানুষ হয়ে কেন বাঁচতে হবে জানলাম, তখন থেকে বেঁচে থাকার জন্য লিখি। এরপর আর থামিনি।
আমি সব সময় চিন্তা করেছি, মানুষ মারা যায়। মরে গিয়ে মরেই যায়। আবার কেউ কেউ শরীর ত্যাগ করেও বেঁচে থাকেন! ইতিহাস থেকে ইতিহাসে পৌঁছে যান। আজ যার হাসি, কাল তার কান্না; আজ যে মানুষ ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, কাল সে হয়তো অনুপস্থিত। কিন্তু কিছু শব্দ থেকে যায়। কিছু কবিতা, কিছু গল্প, কিছু উচ্চারণ সময়ের ভেতর দিয়েও বেঁচে থাকে। তখন মনে হয়েছে, একজন লেখক আসলে নিজের জীবনের চেয়েও বড় কিছু নির্মাণ করতে চান। তিনি জানেন, শব্দের মধ্যে নিজের অস্তিত্বের অংশ বিদ্যমান। আর আমি তো কবি! আমি তখন থেকে বরেণ্যরা কারা, কেন, কীভাবে—প্রশ্ন খুঁজতে চেষ্টা করেছি, বুঝতে চেয়েছি, উত্তর পেয়েছি, তখন থেকেই কলমকে খুব জব্দ করে ধরে রেখেছি। কারণ, কলম যে শক্তি দিয়ে যুগ থেকে যুগান্তরে মনকে পৌঁছে দিতে পারে, তা আর কোনো কাজ পারে না।
এরপর ধীরে ধীরে বুঝলাম, লেখা শুধু শব্দ সাজানো নয়; লেখা মানে নিজের ভেতরের মানুষটিকে আবিষ্কার করা। একসময় দেখলাম, চারপাশের মানুষ, সমাজ, প্রেম, অভিমান, বঞ্চনা, স্বপ্ন—সবকিছুই আমাকে ভেতর থেকে নাড়া দেয়। সেই নাড়া থেকেই জন্ম নেয় শব্দ। কিছু কথা মুখে বলা যায় না, কিছু অনুভূতি কাউকে বোঝানো যায় না; কিন্তু কাগজের কাছে সেগুলো অকপটে স্বীকার করা যায়। তাই লেখা আমার কাছে এক ধরনের আশ্রয়ও। কারণ, লেখার একটি হৃদয় আছে, সেই লেখা সমাজের প্রতি, সময়ের প্রতি দায় বহন করে মানুষকে স্বপ্ন দেখায়। সময়ের সাক্ষী হয়ে আরও কিছু মানুষকে বাঁচিয়ে নেয়, বাঁচিয়ে রাখে।
এককথায় বলতে গেলে, আমি বেঁচে থাকার জন্য লিখি, সময়কে বাঁচিয়ে রাখার জন্য লিখি।
লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক