আজকের যুগ বিজ্ঞাপনী বাণিজ্যের। এখানে সাহিত্যের মান নির্ধারিত হয় 'বেস্ট সেলার' তকমা, ফেসবুকের প্রচার কিংবা অনলাইন জরিপের কাটতি দিয়ে। লেখালেখি যখন পেশাগত সুবিধা আদায়ের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন গত শতাব্দীর ত্রিশ-চল্লিশ দশকের কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্মরণ করা কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এক গভীর সামাজিক প্রয়োজন।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটেছিল এমন এক সময়ে যখন বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্র-উত্তর আধুনিকতার জোয়ার বইছে। কবিতার তুলনায় কথাসাহিত্যে সেই আধুনিকতা ছিল অনেক বেশি প্রাচুর্যময় ও মৃত্তিকাসংলগ্ন। মানিক সেই ধারার অগ্রগণ্য সেনানি, যিনি মানুষের বহির্জীবন ও অন্তর্জীবনের বৈচিত্র্য এবং অস্তিত্বের সংগ্রামকে সাহসের সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। মাত্র ৪৮ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি যে ৩৭টি উপন্যাস এবং দুই শতাধিক গল্প উপহার দিয়েছেন, তা বিশ্বসাহিত্যের যেকোনো সমৃদ্ধ সম্ভারের সমতুল্য।
মানিকের সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর বিবর্তন। শুরুর দিকের ‘দিবারাত্রির কাব্য’ বা ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’র মতো উপন্যাসে তিনি ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষাতত্ত্বের আধারে মানুষের অবদমিত কাম ও মনস্তত্ত্বকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। কিন্তু তিনি সেখানে থেমে থাকেননি। সমসাময়িক ইতিহাস ও সমাজের তল খুঁজতে গিয়ে তিনি যুক্ত হন মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষায়। তাঁর এই রাজনৈতিক রূপান্তর সাহিত্যকে দলীয় ইশতেহারে পরিণত করেনি, বরং সমকালীন দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, শ্রমিক ধর্মঘট এবং দেশভাগের যন্ত্রণা ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁকে করেছে আরও বেশি ‘সৎ’ ও জীবনঘনিষ্ঠ। ‘পদ্মানদীর মাঝি’ বা ‘শহরতলি’র মতো সৃষ্টিতে শ্রমজীবী মানুষের যে লড়াই তিনি এঁকেছেন, তা আজও শোষিত শ্রেণির অমর দলিল।
বর্তমান সময়ে যখন রাষ্ট্রের ‘বিরাজনীতিকরণ’ প্রকল্পের মাধ্যমে মানুষকে রাজনীতিবিমুখ করার চেষ্টা চলছে, তখন মানিকের সাহিত্য আমাদের চিন্তাকে জাগ্রত করে। আজকের তথাকথিত ‘জনপ্রিয় ধারা’র সাহিত্য যেখানে মধ্যবিত্তের ফ্যান্টাসি আর পলায়নপর মনোবৃত্তিতে আবদ্ধ, মানিক সেখানে বাস্তবতার রূঢ় নগ্নতাকে উন্মোচিত করেন। মিশেল ফুকোর তত্ত্বে মানুষ যখন বিচ্ছিন্ন ও ‘সমাপ্তির দ্বারপ্রান্তে’, তখন মানিক দেখান মানুষ কীভাবে তার নিজ সমাজেই এক ‘বিদেশি’ হয়ে বেঁচে থাকে।
মানিকের জীবন ছিল চরম আর্থিক সংকটের। লেখক হওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার কারণে তিনি দারিদ্র্যকে বরণ করে নিয়েছেন, কিন্তু আপস করেননি। তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বিনা চিকিৎসায়, এমনকি মৃত্যুর খবরটি ফোনে জানানোর মতো পাঁচ আনা পয়সাও তাঁর পরিবারের কাছে ছিল না। এই আত্মত্যাগ কেবল শিল্পের জন্য নয়, বরং মানুষের মুক্তির দিশা খোঁজার জন্য।
পরিশেষে বলা যায়, মানিকের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি কারণ মানুষের নির্বুদ্ধিতা, শঠতা ও শ্রেণিবৈষম্য আজও বিদ্যমান। সাহিত্যের কাজ যদি কেবল বিনোদন না হয়ে চিন্তার জাগরণ হয়, তবে এই বাজার সংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে বাঁচতে মানিকের কাছে আমাদের বারবার ফিরতেই হবে। তিনি কেবল অতীত নন, বর্তমান সংকটের এক নির্ভীক দিশারি।