Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

কবি নজরুল: সম্প্রীতির বাতিঘর

ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
প্রকাশ : রবিবার, ২৪ মে,২০২৬, ০৯:০৬ এ এম
আপডেট : রবিবার, ১৭ মে,২০২৬, ০৯:২৭ পিএম
কবি নজরুল: সম্প্রীতির বাতিঘর

কবি নজরুল ইসলামকে নিয়ে আমরা দুই পর্বে এই লেখাটি নিবেদন করছি। আজ পড়ুন প্রথম কিস্তি। বাংলা সাহিত্যের অদম্য ও দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার এই মহান অগ্রদূত ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট (১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর কালজয়ী জীবন, সাহিত্যকর্ম ও চিরবিদ্রোহী চেতনার ওপর আলোকপাত করে আমাদের এই বিশেষ নিবেদন। - বি.স

বাঙালির মনন, সাহিত্য ও জাতীয় জীবনের এক উত্তাল ও অদম্য ধূমকেতুর নাম কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর আবির্ভাব ছিল পরাধীনতার ঘোর অমাবস্যায় এক তীব্র আলোকবর্তিকার মতো, যা বাঙালির শৃঙ্খলিত চেতনাকে এক লহমায় নাড়া দিয়েছিল। তবে নজরুলের ক্ষোভ ও দ্রোহ কেবল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ছিল না; তাঁর আজীবনের সংগ্রাম ছিল মানুষের তৈরি কৃত্রিম ভেদাভেদ, ধর্মীয় অন্ধত্ব ও সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পের বিরুদ্ধে। আজ যখন বিশ্বজুড়ে অসহিষ্ণুতা ও সংকীর্ণতার কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে, তখন নজরুলের কালজয়ী মানবিক আহ্বান আমাদের পথপ্রদর্শক হয়ে দাঁড়ায়। তিনি কেবল একজন সাধারণ কবি নন, বরং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবিক মেলবন্ধনের এক অবিনাশী বাতিঘর।

জন্ম ও বংশ পরিচয়

কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন তাঁর বাবা-মায়ের ষষ্ঠ সন্তান। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্মের পর অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছিলেন বলে তাঁর ডাকনাম রাখা হয়েছিল 'দুখু মিয়া'।

নজরুলের জন্মস্থান বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে।

 পিতা: কাজী ফকির আহমদ। তিনি স্থানীয় মাজারের খাদেম এবং মসজিদের ইমাম ছিলেন।

মাতা: জাহেদা খাতুন।

নজরুলের পূর্বপুরুষেরা মুঘল আমলে বিচারক বা 'কাজী' হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন, যেখান থেকে তাঁদের বংশীয় পদবি 'কাজী' এসেছে। চুরুলিয়া গ্রামেই নজরুলের শৈশব কেটেছে। বাবার অকাল মৃত্যুর পর অভাবের তাড়নায় তিনি এখানকার স্থানীয় মাজার ও মসজিদে খাদেম ও মুয়াজ্জিনের কাজও করেছেন। বর্তমানে তাঁর জন্মস্থানে একটি সংগ্রহশালা এবং 'নজরুল একাডেমি' রয়েছে, যা দর্শনার্থীদের জন্য অত্যন্ত দর্শনীয় একটি স্থান।

শিক্ষা জীবন (১৯০৯ - ১৯১৭)

নজরুলের শিক্ষা জীবন ছিল বেশ অগোছালো কিন্তু রোমাঞ্চকর। অভাবের কারণে তিনি বারবার পড়াশোনা ছেড়ে কাজে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছেন।

প্রাথমিক শিক্ষা: গ্রামের মক্তব থেকে তিনি নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষা পাস করেন। সেখানে তিনি কুরআন, ইসলাম ধর্ম, দর্শন এবং পারস্য সাহিত্য সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান লাভ করেন।

লেটো দল: শৈশবেই তিনি লেটো (লোকসংগীতের দল) দলে যোগ দেন। সেখানে নাটক লেখা এবং গান বাঁধার মাধ্যমে তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভার হাতেখড়ি হয়।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক

তিনি বর্ধমানের মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন (যেখানে শিক্ষক হিসেবে কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিককে পেয়েছিলেন)।

পরবর্তীতে ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়েন।

সবশেষে আসানসোলের রানীগঞ্জ সিয়ারসোল রাজ স্কুল থেকে ১৯১৭ সালে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তবে এন্ট্রান্স (এসএসসি সমমান) পরীক্ষার আগেই তিনি পড়াশোনা ছেড়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।

ব্রিটিশ-বিরোধী ভূমিকা

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে কাজী নজরুল ইসলামের ভূমিকা ছিল একজন বীর যোদ্ধার মতো, তবে তাঁর মূল অস্ত্র ছিল কলম এবং সুর। তৎকালীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি ছিলেন প্রধান ‘বিদ্রোহী’ কণ্ঠস্বর। নিচে তাঁর প্রধান ভূমিকাগুলো আলোচনা করা হলো:

১. লেখনীর মাধ্যমে গণজাগরণ

নজরুল যখন সাহিত্য অঙ্গনে আসেন, তখন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির ক্ষোভ তুঙ্গে। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার পর সারা ভারতবর্ষে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার জন্য তাঁর কবিতা যুবসমাজকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাঁর কবিতায় ব্রিটিশ রাজকে 'অত্যাচারী' হিসেবে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল।

২. ‘ধূমকেতু’ ও ‘লাঙল’ পত্রিকার সম্পাদনা

১৯২২ সালে নজরুল ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই পত্রিকার মাধ্যমে তিনি সরাসরি ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তোলেন। এটি ছিল অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ, কারণ তখন অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই স্বায়ত্তশাসনের কথা বলত। পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যায় তিনি ব্রিটিশ সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিতেন। এছাড়া ‘লাঙল’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি শোষিত কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণির অধিকার নিয়ে সোচ্চার ছিলেন।

৩. রাজদ্রোহের অপরাধে কারাবরণ

তাঁর ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটিকে ব্রিটিশ সরকার রাজদ্রোহী ঘোষণা করে। এই কবিতার জন্য নজরুলকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন (যা ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে পরিচিত), তা ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক দলিল। সেখানে তিনি বলেছিলেন:

“আমার হাতের বাঁশি কেড়ে নিলেই গানের মৃত্যু হয় না।”

৪. সংগীতের মাধ্যমে বিপ্লব

নজরুলের গান ছিল আন্দোলনের প্রাণশক্তি। তাঁর গানগুলো বিপ্লবীদের মাঝে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়াত। ‘কারার ঐ লৌহকবাট’, ‘শিকল পরা ছল’, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’—এই গানগুলো গেয়ে হাজার হাজার তরুণ হাসিমুখে জেলখানায় গিয়েছেন এবং ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই ‘বিপ্লবী চারণকবি’।

৫. সাম্যবাদ ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা

ব্রিটিশরা যখন 'ভাগ করো এবং শাসন করো' (Divide and Rule) নীতি অনুসরণ করে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বা বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করত, নজরুল তখন তাঁর লেখনীর মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ডাক দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ছাড়া ব্রিটিশদের তাড়ানো সম্ভব নয়। তাঁর ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ বা ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ কবিতাগুলো ছিল ঐক্যের প্রতীক।

পুনর্জাগরণে নজরুল

কাজী নজরুল ইসলামকে বলা হয় ‘ইসলামী রেনেসাঁ’ বা মুসলিম জাগরণের কবি। বিশ শতকের শুরুতে যখন বাঙালি মুসলমান সমাজ শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগছিল, তখন নজরুল তাঁর লেখনীর মাধ্যমে তাদের সুপ্ত চেতনাকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। ইসলামী রেনেসাঁ পুনর্জাগরণে তাঁর মূল ভূমিকাগুলো নিচে তুলে করা হলো-

১. হীনম্মন্যতা দূরীকরণ ও গৌরবময় ইতিহাস তুলে ধরা

তৎকালীন মুসলমান সমাজ তাদের অতীত ঐতিহ্য ভুলে হীনম্মন্যতায় ভুগছিল। নজরুল তাঁর কবিতায় খালিদ বিন ওয়ালিদ, উমর ফারুক (রা.), তারিক বিন জিয়াদ এবং মহররমের আত্মত্যাগের বীরত্বগাথা তুলে ধরেন। ‘খেয়াপারের তরণী’, ‘মহররম’, ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজদহম’ এবং ‘আনোয়ার পাশা’-র মতো কবিতায় তিনি মুসলিম বীরদের শৌর্য-বীর্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে বাঙালি মুসলমানদের শির উঁচু করে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেন।

২. ইসলামী সংগীত ও গজল

বাংলার সংগীত জগতে নজরুলই প্রথম সার্থকভাবে ইসলামী ভাবধারার গান ও গজল প্রবর্তন করেন। এর আগে মুসলমানদের কোনো নিজস্ব রুচিশীল সংগীতের ধারা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। তিনি প্রায় ৫০০-র বেশি ইসলামী গান ও গজল রচনা করেছেন।

‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’ গানটি ছাড়া আজও যেন বাঙালির ঈদ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

·তাঁর হামদ ও নাত (যেমন: ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ’) সাধারণ মানুষের হৃদয়ে আধ্যাত্মিক চেতনার জোয়ার এনেছিল।

৩. ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ

নজরুল কেবল ঐতিহ্য প্রচার করেননি, বরং ধর্মের নামে চলা ভণ্ডামি, কুসংস্কার এবং মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন ইসলাম যেন তার মূল উদার ও মানবিক রূপে ফিরে আসে। তাঁর মতে, প্রকৃত ধর্ম হচ্ছে মানুষের সেবা করা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করা।

৪. আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের সমন্বয়

নজরুল মুসলমানদের বুঝিয়েছিলেন যে, ধর্ম পালন করার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়া জরুরি। তিনি ধর্মীয় পরিভাষাকে বাংলা সাহিত্যে শৈল্পিক উপায়ে ব্যবহার শুরু করেন। তাঁর রচনায় সালাত, সিয়াম, তৌহিদ ও জাঁকজমকহীন জীবনবোধের চিত্র ফুটে উঠেছে, যা শিক্ষিত মুসলিম সমাজকে তাদের শেকড়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলে।

এই এই লেখকের লেখা আরও-

নীরব মেধা পাচার : গভীর সংকটে আগামীর বাংলাদেশ নীরব মেধা পাচার : গভীর সংকটে আগামীর বাংলাদেশ

৫. সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের জয়গান

ইসলামের সাম্যবাদী চেতনাকে তিনি সমাজ সংস্কারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। শোষিত-বঞ্চিত মানুষের পক্ষে তিনি যে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন, তাঁর মূল অনুপ্রেরণা ছিল ইসলামের সাম্যের আদর্শ। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক সমাজ যেখানে রাজা-প্রজা বা ধনী-দরিদ্রের কোনো কৃত্রিম বিভেদ থাকবে না।

অসাম্প্রদায়িক নজরুল

নজরুলের জীবন ও দর্শনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল ধর্মীয় সম্প্রীতি। তিনি কেবল মুখে অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলেননি, বরং তাঁর চিন্তা, লেখা এবং ব্যক্তিগত জীবনে হিন্দু-মুসলিম মিলনের এক অভূতপূর্ব সেতু তৈরি করেছিলেন। অসাম্প্রদায়িকতার ক্ষেত্রে নজরুলের অবস্থান ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ় ও অনন্য। তাঁর কাছে অসাম্প্রদায়িকতা মানে ধর্মহীনতা ছিল না, বরং তা ছিল নিজ ধর্মের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রাখা এবং অন্য ধর্মের প্রতি কোনো বিদ্বেষ পোষণ না করা।

১. ‘মানুষ’ পরিচয়কে সবার উপরে স্থান দেওয়া

নজরুলের কাছে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল সে একজন ‘মানুষ’। তিনি মনে করতেন, ধর্ম মানুষের জন্য, মানুষ ধর্মের জন্য নয়। তাঁর বিখ্যাত ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় তিনি লিখেছেন:

“হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?

কাণ্ডারী! বলো ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার!”

এখানে তিনি বিপন্ন মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে তাঁর ‘মানুষ’ পরিচয়কে গুরুত্ব দিয়ে সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ পেশ করেছেন।

২. হিন্দু-মুসলিম মিলনের চারণকবি

নজরুল বিশ্বাস করতেন, ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য হিন্দু ও মুসলমানের ঐক্য অপরিহার্য। তিনি তাঁর গানে ও কবিতায় এই দুই সম্প্রদায়কে ‘একই বৃন্তের দুটি কুসুম’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখেছেন:

“মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান,

মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।”

৩. দুই ধর্মের সাহিত্য ও সংগীত সাধনা

বাংলা সাহিত্যে নজরুলই একমাত্র কবি, যিনি সমান দক্ষতায় ইসলামী গান (হামদ ও নাত) এবং হিন্দু ধর্মের শ্যামাসঙ্গীত ও কীর্তন রচনা করেছেন। তিনি একদিকে যেমন লিখেছেন— “ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়”, অন্যদিকে পরম মমতায় লিখেছেন— “শোন রে শোন মহাকালের শঙ্খ বাজে” বা “বল রে জবা বল”। তাঁর এই সাহিত্য সাধনা প্রমাণ করে যে, তিনি সকল ধর্মের সৌন্দর্যের প্রতি সমানভাবে শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

এই লেখকের লেখা আরও-

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মানবাধিকার ও বিশ্বশান্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ : ইসলামী দৃষ্টিকোণ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মানবাধিকার ও বিশ্বশান্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ : ইসলামী দৃষ্টিকোণ

৪. সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান

যখনই সমাজ বা রাজনীতিতে ধর্মীয় বিভেদ বা দাঙ্গা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, নজরুল তাঁর শাণিত কলম চালিয়েছেন। তাঁর ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ কবিতায় তিনি ধর্মের নামে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টিকারীদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করতেন, স্রষ্টা সবার এবং তাঁর সৃষ্টিকে কৃত্রিমভাবে ভাগ করা মহাপাপ।

৫. ব্যক্তিগত জীবনে উদারতা

নজরুলের ব্যক্তিগত জীবন ছিল অসাম্প্রদায়িকতার এক জীবন্ত দলিল। তাঁর বিয়ে এবং সন্তানদের নামকরণের ক্ষেত্রেও তিনি কোনো ধর্মীয় গোঁড়ামিকে প্রশ্রয় দেননি। তাঁর বন্ধুদের একটি বিশাল অংশ ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তিনি কোনো বিশেষ ধর্মের গণ্ডিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে চিরকাল সত্য এবং সুন্দরের উপাসনা করেছেন।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, কাজী নজরুল ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নন; তিনি মানবতার এক সর্বজনীন কণ্ঠস্বর। তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা কেবল কাব্যিক অলংকার বা আকস্মিক আবেগ ছিল না, বরং তা ছিল তাঁর সামগ্রিক জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি। বর্তমানের জটিল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এবং ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে নজরুলের সাম্যবাদী আদর্শ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও অনিবার্য। সেই বাতিঘর থেকে বিচ্ছুরিত আলোকশিখা যদি আমরা আমাদের হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, তবেই একটি বৈষম্যহীন, সংঘাতমুক্ত ও সম্প্রীতিময় আগামী পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)