ক্রীড়া ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা মাঠ ছাড়িয়ে প্রায়ই ডিজিটাল দুনিয়ায় হিংসা ও বিদ্বেষের রূপ নেয়। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার এক আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে বিষয়টি পুনরায় স্পষ্ট হলো। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার তিন মাসের কম সময়ের মধ্যে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, টুর্নামেন্ট চলাকালীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি কটূক্তি ও নেতিবাচক বার্তার নিশানা হতে হয়েছে টুর্নামেন্টের রানার্সআপ দল আর্জেন্টিনাকে।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসকে সামনে রেখে ফিফার 'সোশ্যাল মিডিয়া প্রটেকশন সার্ভিস' (এসএমপিএস) এই বিস্তারিত বিশ্লেষণটি প্রকাশ করে। টুর্নামেন্ট শুরুর সময় ৯ জুন থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত এক্স (সাবেক টুইটার), ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের প্রায় ১ কোটি ৭১ লাখের বেশি পোস্ট ও মন্তব্য গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এই তথ্য উপাত্ত তুলে ধরে সংস্থাটি।
অনলাইন আক্রমণের শীর্ষে যারা
ফাইনালে স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে ফেরান তোরেসের গোলে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয় আলবিসেলেস্তেদের। মাঠের সেই ব্যর্থতার পাশাপাশি সাইবার বিশ্বেও তীব্র আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। দলগতভাবে নেতিবাচক বার্তার তালিকায় আর্জেন্টিনার পরেই অবস্থান করছে ইংল্যান্ড, স্পেন, ব্রাজিল এবং নরওয়ে।
আর্জেন্টিনার প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনিকেও ট্রোল ও সমালোচনার বড় লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ফুটবলপ্রেমীদের অনেকের দাবি ছিল—মাঠে রেফারিদের কাছ থেকে বাড়তি সুবিধা পেয়েছে আর্জেন্টিনা। এই বিতর্ককে কেন্দ্র করেই মূলত তাঁর দিকে সামাজিক মাধ্যমে বিষোদগার ও বর্ণবাদী/বিদেশিবিদ্বেষমূলক মন্তব্য ছুড়ে দেওয়া হয়।
খেলোয়াড়দের ওপর ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বর্ণবাদ
ব্যক্তিগতভাবে ফুটবলারদের ওপর আক্রমণের দিক থেকে আর্জেন্টিনা চতুর্থ স্থানে রয়েছে। একক খেলোয়াড়দের ট্রোলিং ও অনলাইন হেনস্তার ক্ষেত্রে শীর্ষে ছিল ফ্রান্স, ইংল্যান্ড এবং পর্তুগালের ফুটবলাররা। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যক্তি আক্রমণের সিংহভাগই ছিল বর্ণবাদী চেতনার। বিশেষ করে আফ্রিকা বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের লক্ষ্য করে সবচেয়ে বেশি বর্ণবৈষম্যমূলক মন্তব্য করা হয়েছে।
ফিফা নিরাপত্তাজনিত কারণে নির্দিষ্টভাবে কোনো একজন খেলোয়াড়ের নাম প্রকাশ না করলেও জানিয়েছে, টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হওয়া ওই ফুটবলারকে একই সাথে বর্ণবাদ, সমকামিতাবিদ্বেষ, নারীবিদ্বেষ এবং ট্রান্সজেন্ডারবিদ্বেষী আক্রমণের মোকাবিলা করতে হয়েছে।
আঞ্চলিক চিত্র ও ডক্সিংয়ের শিকার রেফারিরা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদেশিবিদ্বেষী বার্তার প্রধান শিকার ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। জাতীয় পরিচয়, অভিবাসন এবং জাতীয় দলে খেলোয়াড় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এসব ঘৃণা ছড়ানো হয়। তবে একই সাথে এটাও উঠে এসেছে যে, অশালীন ও বর্ণবাদী বার্তা ছড়ানোর ক্ষেত্রে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ভূমিকাও ছিল শীর্ষে। ভৌগোলিক বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি সাইবার আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে ইউরোপে, যার ঠিক পরপরই দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থান।
তবে টুর্নামেন্টে সবচেয়ে জীবননাশী ও মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হতে হয়েছে ম্যাচ পরিচালনাকারী রেফারিদের। খেলায় দুর্নীতি ও পাতানো ম্যাচের কাল্পনিক অভিযোগ এনে অনেক রেফারির ব্যক্তিগত গোপন তথ্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে (যা 'ডক্সিং' নামে পরিচিত) তাঁদের পরিবারসহ হেনস্তা করার মারাত্মক চেষ্টা চালানো হয়েছে।
স্পোর্টস জগতে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফিফার এই জরিপ বিশ্ব ফুটবল প্রেমীদের আচরণগত দিক নিয়ে নতুন করে ভাববার খোরাক জোগাল।