জীবনধারণের প্রথম ও প্রধান শর্ত খাবার। প্রতিদিন খেটে খাওয়া মানুষের কঠোর পরিশ্রমের একমাত্র উদ্দেশ্য পরিবারের মুখে দুবেলা নিরাপদ অন্ন তুলে দেওয়া। কিন্তু পাতের সেই ভাত, তরকারি, সকালের জলখাবার কিংবা তৃষ্ণা মেটানোর এক গ্লাস পানি—কোনো কিছুই কি আজ নিরাপদ? উত্তর মিলছে, নিরাপদ তো নয় বরং চরম আতঙ্কের। সরকারি সংস্থার সাম্প্রতিক ল্যাব টেস্ট রিপোর্টে দেখা গেছে, দেশের বাজারে প্রচলিত প্রায় প্রতিটি খাদ্যে ছড়িয়ে আছে বিষাক্ত রাসায়নিক, শিল্পকারখানার রঙ, মরণঘাতী ভারী ধাতু ও বিপজ্জনক জীবাণু।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) প্রকাশিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় নমুনা পরীক্ষা ও ল্যাব রিপোর্টের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেশজুড়ে খাদ্যদূষণের এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। ঢাকাসহ দেশের ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ জেলা থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে, দৈনন্দিন খাদ্যচক্রের প্রতিটি ধাপে বাসা বেঁধেছে মরণঘাতী উপাদান। ফলে ক্যানসার, কিডনি অকেজো, লিভার সিরোসিস এবং হৃদরোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
বলা যায়, দেশের বাজারে এমন কোনো খাদ্য বা খাদ্যপণ্য নেই যেখানে বিষের অস্তিত্ব নেই। সুস্থ ও রোগমুক্তিতে শাকসবজিতেও মিলেছে ক্যাডমিয়াম ও ভারী ধাতু। ‘পানির অপর নাম জীবন’—অথচ সেই পানিতেই মিলেছে মলের জীবাণু। পাশাপাশি শিশুখাদ্যে অতিমাত্রার সিসাসহ একের পর এক ভয়াবহ দূষণ ধরা পড়েছে। সঙ্গে ভোজ্যতেলে অতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট, মুড়িতে ইউরিয়া ও গুড়ে মিলেছে নিষিদ্ধ রাসায়নিক। কোমলমতি শিশুদের নাশতা-বিস্কুট ও কেকজাতীয় পণ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় প্রিজারভেটিভ। এমন পরিস্থিতিতে বিষের ‘সমুদ্রে’ টিকে আছে দেশের মানুষ। জাতির ভবিষ্যৎ পড়ছে হুমকিতে।
ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডায়েটিশিয়ান সিরাজাম মুনিরা বলেন, "যে খাবার খেয়ে মানুষ সুস্থ থাকবেন, সেই খাবারে বিষ! ভাবা যায়! দেশের বর্তমান খাবারে ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিক, অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক বা ভারী ধাতু থাকার বিষয়টি সামনে আসছে। এমনকি শিশুদের বিষমাখা খাবার দেওয়ার ফলে বিভিন্ন ধরনের অ্যালার্জি, সংক্রমণ ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। দুধ থেকে শুরু করে মাছ, মাংস, ফলমূল, শাকসবজি প্রায় সব খাবারেই ভেজালের শঙ্কার ফলে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের রোগ, হৃদরোগ, থাইরয়েডের জটিলতা, শিশুদের বিকাশজনিত সমস্যা এবং পানিবাহিত রোগসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।"
দেশের মানুষ তাদের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে বাজার, দোকানে, ফুটপাতে বা হাতের কাছে প্রয়োজনীয় যা পান তাই কিনে খাচ্ছেন। পাতে ওঠা প্রতিদিনের এসব খাবারের সঙ্গেই মানবদেহে ঢুকছে ‘বিষ’। মাছ, মাংস, ফল, মসলায় অতি মুনাফার লোভে মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান। জিলাপিতে দেওয়া হচ্ছে হাইড্রোজ। ফ্লেভার ও কাপড়ে ব্যবহৃত রং মিশিয়ে বানানো হচ্ছে ফলের জুস। পাশাপাশি অপরিপক্ব ফল পাকাতে ব্যবহার করা হচ্ছে কার্বাইড ও হরমোন।
পানি : বিএফএসএর পরীক্ষায় পানীয় জলে ক্ষতিকর ‘ফিকাল কলিফর্ম’ বা মলের জীবাণুর ভয়াবহ চিত্র ধরা পড়েছে। দিনাজপুরের প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে ১২০ সিএফইউ, খাগড়াছড়িতে ৬০ সিএফইউ এবং বাগেরহাটে ৪৩ সিএফইউ ফিকাল কলিফর্ম পাওয়া গেছে। অথচ বিশুদ্ধ পানির মানদণ্ড অনুযায়ী এই জীবাণুর উপস্থিতি হতে হবে সম্পূর্ণ ‘শূন্য’।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ জানান, মলের জীবাণুযুক্ত এই পানি পানের ফলে মানবদেহে আমাশয়, টাইফয়েড, ক্রনিক ডায়রিয়া ও জন্ডিসের মতো পানিবাহিত রোগ তীব্র আকার ধারণ করে। বিশেষ করে শিশু ও প্রবীণদের অনাক্রম্যতা (ইমিউনিটি) দ্রুত ভেঙে পড়ে।
শাকসবজি : সুস্থ থাকতে পুষ্টিবিদরা প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় সবজি রাখার পরামর্শ দেন। অথচ বিভিন্ন বাজার থেকে সংগৃহীত সবজির নমুনায় ১.১৬ থেকে ২.৩৭ পিপিএম সিসা মিলেছে, যেখানে সর্বোচ্চ সহনশীল মাত্রা মাত্র ০.৩ পিপিএম। পাশাপাশি নমুনায় ০.৩৩ পিপিএম ক্যাডমিয়াম এবং ই-কোলাই ও সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব মিলেছে। সিসা ও ক্যাডমিয়াম রক্তপ্রবাহে মিশে সরাসরি মানুষের স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্ক পঙ্গু করে দেয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি মানসিক বিকাশ স্তব্ধ করা, বুদ্ধিমত্তা (IQ) হ্রাস এবং আচরণগত সমস্যার জন্ম দেয়। বড়দের ক্ষেত্রে এটি কিডনি বিকল, যকৃৎ নষ্ট করা ও উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম প্রধান কারণ।
গুড় ও মুড়ি : রাজশাহী ও গাজীপুর এলাকার গুড়ের নমুনায় খাদ্যে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ‘সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট’ (যা সাধারণত কাপড়ের শিল্পে ব্যবহৃত হয়) পাওয়া গেছে। এটি গুড়কে দ্রুত উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় দেখায়। অন্যদিকে রংপুর, বান্দরবান, নরসিংদী, সুনামগঞ্জ, বগুড়া, মুন্সীগঞ্জ, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর ও সাতক্ষীরার মুড়ির নমুনায় অবাধে ইউরিয়া সার ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।
টেক্সটাইলের বিষাক্ত রাসায়নিক ও ইউরিয়া পেটে গিয়ে পরিপাকতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করে, যা ক্রনিক গ্যাস্ট্রিক, আলসার এবং দীর্ঘমেয়াদে পাকস্থলীর ক্যানসারের দিকে ঠেলে দেয়।
বিস্কুট, চানাচুর : কুমিল্লা, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও হবিগঞ্জের প্রক্রিয়াজাত বিস্কুটে খাদ্যের মানদণ্ডবহির্ভূত প্রিজারভেটিভ ও কেমিক্যাল পাওয়া গেছে। চানাচুরের নমুনায় মিলেছে অননুমোদিত মাত্রাতিরিক্ত লবণ এবং লিভার ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান ‘অ্যাফ্লাটক্সিন’।
অ্যাফ্লাটক্সিন হলো ছত্রাক থেকে উৎপন্ন অতিমাত্রার বিষ, যা সরাসরি যকৃতের ডিএনএ পরিবর্তন করে ক্যানসার সৃষ্টি করে। এছাড়া অতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ শিশুদের অ্যালার্জি, হাঁপানি এবং কিডনির ছাঁকন ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
লবণ, হলুদ ও মরিচের গুঁড়া: সংগৃহীত লবণের নমুনায় দেখা গেছে বৈষম্য—কোথাও আয়োডিনের চরম ঘাটতি, আবার কোথাও ক্ষতিকর মাত্রায় অতিরিক্ত আয়োডিন। অন্যদিকে হলুদ ও মরিচের গুঁড়ার নমুনায় অতিমাত্রায় ‘অ্যাশ’ বা ভস্ম মিলেছে, যা কৃত্রিম রং, ক্ষতিকর কাঠের গুঁড়া ও নিম্নমানের উপাদানের উপস্থিত নির্দেশ করে।
লবণে সঠিক মাত্রার আয়োডিন না থাকলে থাইরয়েডের সমস্যা ও গলগণ্ড রোগ হয়। আর মসলায় মেশানো টেক্সটাইল রং ও ভস্ম ধীরে ধীরে রক্তদূষণ ও অন্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টি করে।
তেল: পরীক্ষায় সরিষার তেলে উচ্চমাত্রার ক্ষতিকর অ্যাসিড ধরা পড়েছে, যা তেলের পচন ও নিম্নমানের উৎপাদনের নির্দেশক। সয়াবিন তেলে ভিটামিন ‘এ’-এর তীব্র ঘাটতি পাওয়া গেছে। তদুপরি ভোজ্যতেলে মাত্রার চেয়ে বেশি মিলছে ‘ট্রান্সফ্যাট’।
ট্রান্সফ্যাট রক্তের খারাপ কোলেস্টেরল বাড়িয়ে দেয় এবং ভালো কোলেস্টেরল কমিয়ে দেয়। ফলে খুব অল্প বয়সেই মানবদেহে রক্তনালী ব্লক হয়ে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়।
দুগ্ধজাত পণ্য, মধু ও কোমল পানীয় : বরিশালের মিল্ক পাউডারের নমুনায় ভয়াবহ সিসা ধরা পড়েছে। খুলনার মধুতে সুক্রোজের বাড়াবাড়ি এবং রাজবাড়ী ও চট্টগ্রামের ঘিতে ‘মিল্ক ফ্যাট’-এর অনুপস্থিতি পাওয়া গেছে—অর্থাৎ ঘিয়ের নামে সস্তা হাইড্রোজেনেটেড ফ্যাট বিক্রি হচ্ছে। সফট ড্রিংকস ও ফলের জুসে অনুমোদিত সীমার কয়েক গুণ বেশি বেনজোয়িক অ্যাসিড, ক্যাফেইন ও টারট্রাজিন কাপড়ের রং মেশানো হচ্ছে।
শিশুদের দুধে সিসা থাকা মানে সরাসরি তাদের ভবিষ্যৎ পঙ্গু করে দেওয়া। আর কৃত্রিম জুসে ব্যবহৃত কেমিক্যাল ও ক্যাফেইন শিশুদের অতিচঞ্চলতা (Hyperactivity), স্থূলতা এবং কিডনির রোগ বাড়িয়ে তুলছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, প্রতিনিয়ত খাদ্যের মাধ্যমে এসব বিষ গ্রহণে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন জানান, দেশে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৫, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ এবং ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকা সত্ত্বেও কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাবে অসাধু চক্র পার পেয়ে যাচ্ছে।
বিএফএসএ চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম জানান, জেলা পর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ ও নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। যৌথ অভিযানের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে।
সম্প্রতি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে এবং এসব তদারকি সংস্থার কার্যক্রম গতিশীল করতে তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতি দ্রুত মাঠপর্যায়ে কঠোর আইন প্রয়োগ ও বাজারের সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা না আনলে এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে পুরো দেশ।