ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
এসএসসি পাসের পর উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পার হওয়ার আগেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে হারিয়ে গেছে সোয়া সাত লাখের বেশি শিক্ষার্থী। দুই বছর আগে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনো এই বিশাল সংখ্যক কিশোর-কিশোরী কাল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় বসছে না। হঠাৎ এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ার এই ঘটনাকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছে খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কেন এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থী হারিয়ে গেল, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল ১৬ লাখ ৭২ হাজার ১৫৩ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছিল ১৪ লাখ ৯১ হাজার ৯৩২ জন। অর্থাৎ, এসএসসি পাস করার পরও ১ লাখ ৮০ হাজার ২২১ জন শিক্ষার্থী আর একাদশ শ্রেণিতে পা-ই রাখেনি। অপরদিকে, যারা ভর্তি হয়েছিল, তাদের মধ্যেও একটি বড় অংশ মাঝপথে হারিয়ে গেছে। এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট অংশ নিচ্ছে ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী, যার মধ্যে নিয়মিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৩ জন। ফলে দেখা যাচ্ছে, একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পরও ৫ লাখ ৪৩ হাজার ৯৮৯ জন নিয়মিত শিক্ষার্থী পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেনি। এসএসসি পাসের পর ভর্তি না হওয়া এবং ভর্তি হয়েও ফরম পূরণ না করা—এই দুই হিসাব মেলালে মোট ৭ লাখ ২৪ হাজার ২১০ জন শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিকের চূড়ান্ত পরীক্ষার আগেই ঝরে পড়েছে।
বুধবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরীক্ষার্থীদের এই বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন বিভাগের সচিব আবদুল খালেক। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষে জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা আবদুল্লাহ শিবলী সাদিক সাংবাদিকদের কাছে এ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান সরবরাহ করেন।
বোর্ডভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে একাদশ শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করেছিল ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন। এদের মধ্যে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে ফরম পূরণ করেছে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন। অর্থাৎ, ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ নিয়মিত শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেনি। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে আলিম স্তরে রেজিস্ট্রেশন করা ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ জনের মধ্যে ফরম পূরণ করেছে মাত্র ৭৮ হাজার ২৬৯ জন, যা নিয়মিত শিক্ষার্থীর ৪৪ দশমিক ০৭ শতাংশ। সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে। এখানে এইচএসসি ভোকেশনাল ও বিএমটিসহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষাক্রমে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪২ জন রেজিস্ট্রেশন করলেও পরীক্ষা দিচ্ছে মাত্র ৭৫ হাজার ১৯৭ জন। অর্থাৎ, কারিগরি স্তরের অর্ধেকেরও বেশি—৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ নিয়মিত শিক্ষার্থী পরীক্ষার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি।
উচ্চমাধ্যমিক স্তরের এই আশঙ্কাজনক ঝরে পড়ার পেছনে বেশ কিছু গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট কাজ করছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদেরা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. আজম খান জানান, তীব্র আর্থিক অনটন, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ে এই ছিটকে পড়ার প্রধান কারণ। দেশে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেও বেকারত্বের হার এতটাই প্রবল যে, নতুন প্রজন্ম পড়াশোনার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে। ফলে কোনোমতে এসএসসি পাসের পরই অনেকে উপার্জনের তাগিদে বিভিন্ন কাজে ঢুকে পড়ছে। এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়াকে তিনি জাতির জন্য এক অশনি সংকেত হিসেবে উল্লেখ করে তাদের পুনরায় শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে সরকারের জরুরি উদ্যোগের তাগিদ দেন।
অবশ্য ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের বর্তমান সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার মনে করেন, এই সোয়া সাত লাখ শিক্ষার্থীর সবাই হয়তো চিরতরে শিক্ষা থেকে ছিটকে যায়নি। এদের বড় একটি অংশ হয়তো আর্থিক বা অন্য সংকটে পরে ভর্তি হবে, কিংবা নির্বাচনী পরীক্ষায় খারাপ করায় বা প্রস্তুতি ঠিক না থাকায় এবার ফরম পূরণ করেনি। তবে এর বাইরেও যে একটি বড় অংশ স্থায়ীভাবে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে পড়ালেখার ইতি টেনেছে, সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
শিক্ষার্থীরা কেন উচ্চমাধ্যমিক পার হওয়ার আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে একটি গবেষণামূলক উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার। তিনি জানান, ইতিমধ্যে একটি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে, যার আওতায় আগামী আগস্ট মাস থেকে শিক্ষা বোর্ডগুলোর মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ ও তা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু হবে।
এই সামগ্রিক বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, "শিক্ষার্থীরা ড্রপ করে কেন? এর উত্তর কে দেবে? নিশ্চয় আমাদের দিতে হবে।" তিনি আরও জানান, বর্তমান সরকারের সময় বাড়ার সাথে সাথে এই দুর্বলতাগুলো সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা হবে এবং প্রাপ্ত ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে আগামী দিনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনের পর এই ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।