ধ্রুব ডেস্ক
লাখো কণ্ঠে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে সৌদি আরবের ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দান। ছবি: সংগৃহীত
লাখো কণ্ঠে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে সৌদি আরবের ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দান। সৌদি আরবের স্থানীয় সময় অনুযায়ী আজ মঙ্গলবার (৯ জিলহজ) পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইসলামের মূল পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম এই ইবাদতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আরাফাতের ময়দানে হাজিদের অবস্থান। গতকাল সোমবার থেকেই মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে তাঁবুর নগরী মিনায় সমবেত হতে শুরু করেন আল্লাহর মেহমানরা। সেখান থেকে আজ ফজরের নামাজের পর তারা রওনা হন হজের মূল কেন্দ্রবিন্দু আরাফাতের ময়দানের দিকে। সেখানে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করে হাজিরা আল্লাহর জিকির, কোরআন তিলাওয়াত এবং অশ্রুভেজা কণ্ঠে নিজেদের ও মুসলিম উম্মাহর জন্য ক্ষমা ও কল্যাণ প্রার্থনা করবেন।
সৌদি হজ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ১৫ লাখের বেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমান হজ পালনে মক্কায় জড়ো হয়েছেন, যাদের সাথে যোগ দিয়েছেন সৌদির আরও কয়েক লাখ নাগরিক। বাংলাদেশ থেকে এবার সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় মোট ৭৮ হাজার ৫০০ জন হজযাত্রী সৌদি আরব গেছেন। এবারের হজ এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যার পটভূমিতে রয়েছে ইরান যুদ্ধের একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এবং বিশ্বজুড়ে চলমান তীব্র জ্বালানি সংকট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা নিয়ে আলোচনা চললেও, এই ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝেই হাজিরা সম্পূর্ণভাবে নিজেদের বিশ্বাসের ওপর ভরসা রাখছেন। হজের পাসপোর্ট ফোর্সের কমান্ডার সালেহ বিন সাদ আল-মুরাব্বা জানিয়েছেন, শুক্রবারের মধ্যেই ১৫ লক্ষাধিক হজযাত্রী সৌদিতে প্রবেশ করেছেন। তীব্র গরমের মাঝে হাজিদের স্বস্তি দিতে স্বেচ্ছাসেবীরা নিরলসভাবে পানি ও কুয়াশা ছড়ানো ফ্যান বিতরণ করছেন। বহু হাজতির কাছে এই যাত্রা একই সাথে শারীরিক কষ্টের এবং আধ্যাত্মিক রূপান্তরের। মিনায় অবস্থানরত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইউসেফ চৌহুদ জানান, অধিকাংশ হাজির জন্যই এটি জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজ, তবে এত অর্থবহ কোনো কিছু কখনোই সহজ হতে পারে না।
ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, আজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থিত মসজিদে নামিরা থেকে হজের বিশেষ খুতবা দেওয়া হবে। এবার মসজিদে নববির প্রবীণ ইমাম ও খতিব শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফির এই খুতবা দেওয়ার কথা রয়েছে। খুতবা ও যৌথভাবে জোহর ও আসরের নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে এই বিস্তীর্ণ ময়দানে হাজিরা সারা দিন পার করবেন। হাদিস অনুযায়ী, আরাফাহর দিন আল্লাহ সবচেয়ে বেশি মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিয়ে নিষ্পাপ ঘোষণা করেন। সূর্যাস্তের পর হাজিরা আরাফাত থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে মুজদালিফায় যাবেন এবং সেখানে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়ে মিনায় শয়তানের প্রতিকৃতিতে নিক্ষেপের জন্য পাথর সংগ্রহ করবেন।
১০ জিলহজ (আগামীকাল বুধবার) মুজদালিফায় ফজরের নামাজ আদায় করে হাজিরা ট্রেন, গাড়ি বা হেঁটে আবার মিনায় ফিরবেন। সেখানে বড় শয়তানকে সাতটি পাথর মারার পর পশু কোরবানি দিয়ে, মাথার চুল ছেঁটে এবং ইহরামের কাপড় বদল করে স্বাভাবিক পোশাক পরবেন। এরপর মক্কায় গিয়ে পবিত্র কাবা শরিফ তাওয়াফ এবং সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে ‘সাঈ’ করবেন। হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১১ ও ১২ জিলহজ মিনায় অবস্থান করে প্রতিদিন তিন শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন হাজিরা। পরিশেষে বিদায়ী তাওয়াফের মাধ্যমে হাজিরা নিজ নিজ দেশে ফেরার প্রস্তুতি নেবেন এবং অনেকেই মদিনায় গিয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারত করবেন। হজ মৌসুম সফল করতে সৌদি হজ মন্ত্রণালয় মাঠপর্যায়ে ৮৩ হাজারের বেশি পরিদর্শন সম্পন্ন করেছে এবং হাজিদের আবাসন, যাতায়াত ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে একটি সমন্বিত তদারকি ব্যবস্থা চালু রেখেছে।