❒ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পরিচালন বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ১৫ কোটি টাকা গুণতে হচ্ছে সরকারকে
ধ্রুব নিউজ ডেস্ক
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের স্থাপনা ছবি: সংগৃহীত
কাঁচামাল ফসফরিক অ্যাসিডের অভাবে দেশের একমাত্র ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার কারখানাটির উৎপাদন চার মাসেরও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। কাঁচামাল আমদানিতে বারবার দরপত্র আহ্বান করা হলেও একক দরদাতা, পুনঃদরপত্রের বাধ্যবাধকতা এবং সরকারি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় স্থবিরতা কাটছে না। এদিকে কারখানা সচল না থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পরিচালন বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ১৫ কোটি টাকা গুণতে হচ্ছে সরকারকে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত ‘ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড’ (ডিএপিএফসিএল)-এর উৎপাদন বন্ধ রয়েছে গত ২৮ জুন থেকে। ২০০৬ সাল থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে থাকা দৈনিক ৬০০ টন সক্ষমতার এ কারখানাটিতে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে প্রায় ৮০০ কর্মী কর্মরত আছেন।
ডিএপি সার উৎপাদনের প্রধান দুই কাঁচামাল হলো অ্যামোনিয়া ও ফসফরিক অ্যাসিড। অ্যামোনিয়ার চাহিদা স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সিইউএফএল এবং কাফকো থেকে মেটানো গেলেও ফসফরিক অ্যাসিডের পুরোটাই আমদানিনির্ভর। এতদিন মরক্কো, জর্ডান, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে এ কাঁচামাল আনা হলেও বর্তমানে চীন রপ্তানি বন্ধ রেখেছে। ফলে মরক্কো ও জর্ডানের ওপর নির্ভরতা বেড়ে গেছে।
বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, কাঁচামালের দাম বিশ্ববাজারে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বছরের শুরুতে প্রতি টন ফসফরিক অ্যাসিডের দাম ৭৫০ থেকে ৭৭০ ডলার থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার পর তা বেড়ে ১ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। বিসিআইসি ২০ হাজার টন করে ফসফরিক অ্যাসিড আমদানির যে দরপত্র আহ্বান করেছিল, তাতে প্রতি টনের সর্বনিম্ন দর উঠেছে ১,০৭১.৯০ থেকে ১,০৮৭ ডলার পর্যন্ত।
আমদানির দরপত্র প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রথমে দুই দফা টেন্ডার ডেকেও কোনো সাড়া মেলেনি। পরবর্তীতে টেন্ডারে কেবল একজন দরদাতা অংশ নেন। সার্বিক প্রস্তাবনা মূল্যায়নের পর গত সেপ্টেম্বরের শেষভাগে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হলেও এখনো অনুমোদন পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান জানান, সরকার কেনাকাটার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সঠিক যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করতে চায়। একক দরদাতা অংশ নেয়ায় প্রতিযোগিতা বাড়াতে রি-টেন্ডার বা পুনঃদরপত্রের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, একটি সূত্রের দাবি—কাঁচামাল এনে সার উৎপাদন করার চেয়ে সরাসরি ডিএপি সার আমদানি করা বেশি সাশ্রয়ী হতে পারে। অতিরিক্ত দামে কাঁচামাল এনে সার প্রস্তুত করলে টনপ্রতি ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি খরচ হতে পারে। এই হিসাব বিবেচনায় নিয়ে আপাতত সরকার ফসফরিক অ্যাসিড আমদানির অনুমোদন দিচ্ছে না।
উৎপাদন দীর্ঘদিন থমকে থাকায় চলতি অর্থবছরে সারের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ টন থেকে কমিয়ে ৮০ হাজার টনে নামিয়ে আনা হয়েছে। গত অর্থবছরে ৮২ হাজার টন এবং তার আগের অর্থবছরে ১ লাখ ১৯ হাজার টন সার উৎপাদন করেছিল কারখানাটি। কিন্তু চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও সংশয় দেখা দিয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে দেশে মোট ১৫ লাখ টন ডিএপি সারের চাহিদা রয়েছে, যার ১৪ লাখ টনই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করার কথা। সরকারি সংস্থা বিএডিসি মূলত চীন, সৌদি আরব ও মরক্কো থেকে সারের এ ঘাটতি মেটায়। তবে দেশীয় উৎপাদন বন্ধ থাকায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতায় বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে সামান্যতম ব্যাঘাত ঘটলেও বাজারে ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।