আলজাজিরা
রাশিয়ায় 'সেন্টার-২০২৬' মহড়ার পার্শ্বে সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র প্রদর্শনীতে আফগান প্রতিনিধিদল ছবি: সংগৃহীত
২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত রাশিয়ার বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ও অঞ্চলে অনুষ্ঠিত বৃহৎ কৌশলগত সামরিক মহড়া 'সেন্টার-২০২৬'-এ মস্কোর অফিশিয়াল আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের আফগান সামরিক প্রতিনিধি দল অংশ নেয় ।
এই মহড়ায় প্রায় ৪৭,০০০ সামরিক সদস্য অংশগ্রহণ করেন এবং এর চূড়ান্ত ধাপে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন ।মহড়ার মূল লক্ষ্য ছিল সামরিক বাহিনীকে বড় আকারের কৌশলগত অভিযান পরিচালনা এবং কমান্ড, কন্ট্রোল ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ প্রদান করা । আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দলটি মহড়ার ব্যবহারিক ও মাঠ পর্যায়ের সামরিক অনুশীলন পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি সেখানে আয়োজিত একটি আধুনিক প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শনী ঘুরে দেখে ।
আফগান প্রতিনিধি দলটির নেতৃত্বে ছিলেন আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের 'আবদুল্লাহ বিন মাসুদ যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ কমান্ড'-এর প্রধান মওলাভি নসিবুল্লাহ মাদানী । আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সদিকুল্লাহ নুসরাত জানান যে, প্রতিনিধি দলটি প্রদর্শনীতে ভারী অস্ত্রশস্ত্র, চালকবিহীন বিমান বা ড্রোন ব্যবস্থা, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং আধুনিক স্বয়ংসক্রিয় রোবোটিক ব্যবস্থা পরিদর্শন করে । সামরিক বিশেষজ্ঞ আখতার মোহাম্মদ রাসেখ উল্লেখ করেন যে, এই ধরনের বৃহৎ আন্তর্জাতিক সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণ আফগান সামরিক নেতৃত্বকে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র, নতুন কৌশল, কমান্ড ব্যবস্থাপনা এবং সামরিক প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনকে কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে । বিশেষ করে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও রোবোটিক্সের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা বোঝার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে ।
মস্কোর সাথে কাবুলের বর্তমান প্রতিরক্ষা যোগাযোগের মূল ভিত্তি কোনো নিরাপত্তা জোট নয়, বরং সামরিক-প্রযুক্তিসংক্রান্ত সহযোগিতা । ২০২৬ সালের মে মাসে মস্কো সফর শেষে আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ ইয়াকুব মুজাহিদ স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, রাশিয়ার সাথে কাবুলের চুক্তিটি কেবল সামরিক-প্রপ্রযুক্তিগত সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ, এটি কোনো যৌথ প্রতিরক্ষা বা নিরাপত্তা চুক্তি নয় । আফগান সশস্ত্র বাহিনীর ব্যবহৃত বিমান, হেলিকপ্টার এবং ভারী অস্ত্রের একটি বড় অংশই ঐতিহ্যগতভাবে রুশ নির্মিত, যার নিয়মিত খুচরা যন্ত্রাংশ, কারিগরি সাহায্য, মেরামত ও সচল রাখার জন্য আধুনিকায়ন প্রয়োজন । ফলে এই মহড়ায় আফগান দলের উপস্থিতি সেই প্রযুক্তিগত সহযোগিতা অক্ষুণ্ণ রাখারই একটি প্রতিফলন ।
সামরিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইউসুফ আমীন জাজাই মনে করেন যে, 'সেন্টার-২০২৬'-এ আফগানিস্তানের উপস্থিতি তাদের ঘোষিত নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের নীতির সাথে সংগতিপূর্ণ । আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে এবং বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক করতে চায়। জাজাই উল্লেখ করেন, সামরিক সম্পর্ক কেবল অস্ত্র কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্যে রয়েছে বিশেষায়িত সামরিক শিক্ষা, দক্ষতা বৃদ্ধি, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি জ্ঞান স্থানান্তর, যা আফগান সামরিক কাঠামো পুনর্গঠনে সহায়তা করতে পারে ।
মহড়াকালে আফগান প্রতিনিধি দল কেবল রাশিয়ার মধ্যেই তাদের দ্বিপাক্ষিক তৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং সেখানে অংশ নেওয়া চীন, ভারত, উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম, কলম্বিয়া, উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান সহ বিভিন্ন দেশের সামরিক প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনায় অংশ নেয়। প্রদর্শনী চত্বরে আফগান প্রতিনিধি প্রধান মওলাভি নসিবুল্লাহ মাদানী উত্তর কোরিয়ার সামরিক অ্যাটাশে রু কি চোল-এর সাথে বিশেষ সাক্ষাতে মিলিত হন । তবে আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই আলোচনার বিশদ বিবরণ প্রকাশ করেনি এবং নতুন কোনো সামরিক সমঝোতার কথাও ঘোষণা করেনি ।
সমগ্র মহড়াকালে নতুন কোনো অস্ত্র কেনার চুক্তি কিংবা অন্য কোনো দেশের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি বলে আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে । বর্তমানে মস্কো ও কাবুলের মধ্যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে যোগাযোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার অংশ হিসেবে সম্প্রতি মস্কোতে আফগানিস্তান বিষয়ক 'মস্কো ফরম্যাট' পরামর্শ সভার অষ্টম রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয় । শেষ পর্যন্ত, কাবুল মস্কোর কাছ থেকে মূলত তাদের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সচল রাখার কারিগরি সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তিতে সামরিক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর সাথে নিজেদের প্রতিরক্ষা কূটনীতি বিস্তৃত করার সুযোগ চাচ্ছে ।