ফাহিম ফারহাদ
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল মজুদ থাকা সত্ত্বেও ভেনিজুয়েলার তেল খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় তেল কোম্পানিগুলো। বর্তমানে শেভরণ ছাড়া আর কোনো বড় আমেরিকান কোম্পানি দেশটিতে সক্রিয়ভাবে বিনিয়োগে আগ্রহী নয়। এক্সনমোবিল, কনোকোফিলিপস, টোটাল এনার্জিসসহ শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেনিজুয়েলাকে কার্যত “বিনিয়োগের অযোগ্য” দেশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
এই কোম্পানিগুলোর মতে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগ নিরাপত্তার অভাবের কারণে ভেনিজুয়েলায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র তেলের মজুদ থাকলেই বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়; স্থিতিশীল নীতিমালা ও নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশও জরুরি।
ভেনিজুয়েলার তেলের আরেকটি বড় সমস্যা হলো এর মান। দেশটির প্রধান তেলক্ষেত্র অরিনকো বেল্ট থেকে উত্তোলিত ক্রুড অত্যন্ত ভারী ও টক (উচ্চ সালফার ও ভারী ধাতুসমৃদ্ধ)। এই তেল প্রক্রিয়াজাত করতে অতিরিক্ত ও ব্যয়বহুল পরিশোধন ধাপ প্রয়োজন হয়। যুক্তরাষ্ট্রে সীমিত সংখ্যক রিফাইনারিতে এ ধরনের ভারী তেল পরিশোধনের সক্ষমতা থাকলেও আইনি ও নিষেধাজ্ঞাজনিত জটিলতার কারণে ভেনিজুয়েলা থেকে সরাসরি তেল এনে পরিশোধন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধ ভেনিজুয়েলার তেল উৎপাদন ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। চীনের সহায়তা ছাড়া দেশটির পক্ষে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল উত্তোলন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় আমেরিকান কোম্পানিগুলোর জন্য সেখানে বিনিয়োগ করা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রেসিডেন্সি চলাকালে বড় তেল কোম্পানিগুলোকে ভেনিজুয়েলায় বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, সম্ভাব্য বিদ্রোহের ঝুঁকি, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে আইনি ও রাজনৈতিক বাধা এবং ভেনিজুয়েলার উপর চীনের বিপুল ঋণের বোঝা—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এক্সনমোবিলসহ বড় কোম্পানিগুলো দেশটিকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য অনুপযুক্ত বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অরিনকো বেল্টের তেল প্রাকৃতিক অবস্থায় প্রায় রাস্তার পিচের মতো ঘন ও ব্যবহার অনুপযোগী। চীন এই তেল গ্রহণের আগে ডাইলুট করে, যার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান ইরান থেকে সরবরাহ করা হয়। এরপর বিভিন্ন ছদ্মনাম—যেমন “ব্রাজিলিয়ান ক্রুড” বা “মালয়েশিয়ান অয়েল”—ব্যবহার করে তেল চীনে পাঠানো হয়। এই পরিবহনের সময় ট্যাংকারগুলোর ট্র্যাকিং এড়াতে রেডিও যোগাযোগ বন্ধ রাখা হয় বলে জানা যায়।
চীনে পৌঁছানোর পর এই তেল সাইনোপেকের মতো বড় রাষ্ট্রীয় কোম্পানির পরিবর্তে শানডং ও গুয়াংডং প্রদেশের বিভিন্ন বেসরকারি ‘টিপট’ রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, চীন ভেনিজুয়েলায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করে যে অবকাঠামো গড়ে তুলেছে, তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রণ বা প্রবেশাধিকার নেই। ফলে ভেনিজুয়েলার তেল খাতে চীনের প্রভাব খর্ব করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
(বিভিন্ন অন্তর্জাল ঘেটে লেখাটি তৈরি করা)