ধ্রুব ডেস্ক
❒ সৌদি আরবের রাস তানুরায় সৌদি আরামকোর তেল শোধনাগার ও তেল টার্মিনালফাইল ছবি: সংগৃহীত
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের নেপথ্যে যে মূল কারিগর হিসেবে কাজ করেছে দেশটির বিশাল জ্বালানি তেলের ভাণ্ডার, তা এখন বিশ্ববাসীর কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো সেই সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করছে। মাদুরোকে আটকের পর ট্রাম্প সরাসরি ঘোষণা করেছেন যে, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো এখন ভেনেজুয়েলায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে এবং ধ্বংসপ্রায় অবকাঠামো সংস্কার করে তেলের নিয়ন্ত্রণ নেবে। মূলত, ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করাই যে এই অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, তা নিয়ে এখন আর সন্দেহের অবকাশ নেই।
এখন পর্যন্ত পাওয়া প্রমাণিত তথ্য অনুযায়ী, লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলাতেই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেলের মজুত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান মজুতের তুলনায় এটি প্রায় ৫ থেকে ৬ গুণ বেশি। অথচ বিপুল এই প্রাকৃতিক সম্পদ দেশটির অর্থনীতিতে খুব সামান্যই অবদান রাখতে পেরেছে। কারিগরি দক্ষতার অভাব, অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেনেজুয়েলা তার এই ‘কালো সোনা’ কাজে লাগাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
সাপ্তাহিক ‘অয়েল অ্যান্ড গ্যাস জার্নাল’ এবং ওপেকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ ১০টি তেল সমৃদ্ধ দেশের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

ভেনেজুয়েলার কাবিমাসের মারাকাইবো হ্রদে একটি তেল উত্তোলন যন্ত্র দেখা যাচ্ছে। ছবিটি ২০২২ সালে তোলাছবি: সংগৃহীত
১
ভেনেজুয়েলা
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রমাণিত জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে ভেনেজুয়েলায়, যার পরিমাণ ৩০৩ বিলিয়ন (৩০ হাজার ৩০০ কোটি) ব্যারেলের বেশি। ভেনেজুয়েলায় সবচেয়ে বেশি তেলের মজুত রয়েছে দেশটির অরিনাকো বেল্ট অঞ্চলে। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভারী তেল সংরক্ষণ এলাকা। ঘন ও গাঢ় এ অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে ডিজেল, কেরোসিন ও জেট ফুয়েল তৈরি করা হয়।
কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। এতে কারাকাসের তেল রপ্তানি, অর্থপ্রবাহ ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে গুরুতর প্রভাব পড়েছে, মারাত্মক চাপে পড়ে আছে দেশটির অর্থনীতি।
গত শনিবার সামরিক অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার তিন দিনের মাথায় মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তাঁর প্রশাসন কারাকাসের সঙ্গে ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলার সমমূল্যের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি চুক্তিতে পৌঁছেছে।

সৌদি আরবের রাস তানুরায় সৌদি আরামকোর তেল শোধনাগার ও তেল টার্মিনালফাইল ছবি: সংগৃহীত
২
সৌদি আরব
ভেনেজুয়েলার পরেই আছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দেশ সৌদি আরব। দেশটির হাতে ২৬৭ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত জ্বালানি তেল মজুত আছে। সৌদি আরবের অর্থনীতি মূলত তেল রপ্তানিনির্ভর। পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠনের (ওপেক) নেতৃত্বে থাকা দেশটি একই সঙ্গে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ তেল উত্তোলনকারী দেশ।
২০২৭ সালের মধ্যে সৌদি আরব দৈনিক তেল উৎপাদন ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করতে চায়। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, সৌদি আরব এ লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
সৌদি আরবের তেল ভেনেজুয়েলার মতো নয়। তাদের তেল হালকা। তাই বিশ্ববাজারে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেলের চাহিদা বেশি। এ তেল সহজে পরিশোধন করা যায় এবং পেট্রল, ডিজেল ও কেরোসিন পাওয়া যায়।

পারস্য উপসাগরের উত্তরে ইরানের একটি তেল ও গ্যাসক্ষেত্রফাইল ছবি:সংগৃহীত
৩
ইরান
মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ ইরানেও প্রচুর পরিমাণে জ্বালানি তেলের মজুত আছে। ইরানের প্রমাণিত জ্বালানি তেল মজুতের পরিমাণ ২০৮ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি। কিন্তু ভেনেজুয়েলার মতো ইরানের তেলের ওপরও যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা আছে। দেশটির অর্থনীতিতে যা মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে।
ইরানের দৈনিক তেল উৎপাদন গড়ে ২৩ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল। তবে দেশটি দৈনিক ৭ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেলের কিছু বেশি অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করতে পারে। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে এটা হচ্ছে।
ইরানের তেল মূলত মাঝারি বা ভারী ঘনত্বের। এ তেল পরিশোধন করে সাধারণত ডিজেল, কেরোসিন ও হেভি ফুয়েল অয়েল পাওয়া যায়।

কানাডার আলবার্টা প্রদেশের কাছে একটি তেল শোধনাগারফাইল ছবি: সংগৃহীত
৪
কানাডা
উত্তর আমেরিকা অঞ্চলে জ্বালানি তেলের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী দেশ কানাডা। দেশটিতে প্রমাণিত তেল মজুতের পরিমাণ ১৬৩ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি। কানাডার তেলসম্পদের বড় অংশই আসে আলবার্টা প্রদেশ থেকে।
কানাডা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম তেল উত্তোলনকারী দেশ। দেশটি দিনে দৈনিক গড়ে ৫৮ থেকে ৬০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল উত্তোলন করে, যা বিশ্বে প্রতিদিন মোট উত্তোলিত তেলের প্রায় ৬ শতাংশ।
কানাডার তেলের সিংহভাগই আসলে বিটুমিন। এটিকে অয়েল স্যান্ডও বলা হয়। বালু ও পানিমিশ্রিত এ তেল অত্যন্ত ভারী এবং পরিশোধনের প্রক্রিয়া জটিল।

ইরাকের বসরায় জুবাইর তেলক্ষেত্র। ড্রোন ব্যবহার করে ছবিটি তোলাফাইল ছবি: সংগৃহীত
৫
ইরাক
তেল মজুতের তালিকায় পাঁচ নম্বরে আছে ইরাক। দেশটিতে প্রমাণিত তেল মজুতের পরিমাণ প্রায় ১৪৫ বিলিয়ন ব্যারেল। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে তেল উত্তোলনে সৌদি আরবের পরেই আছে ইরাক।
ওপেকভুক্ত এ দেশ দৈনিক গড়ে ৪৪ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল তেল উত্তোলন করে। বিশ্বে মোট উত্তোলিত তেলের ৪ শতাংশ আসে ইরাক থেকে। দেশটি তাদের উত্তোলিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ রপ্তানি করে।
ইরাকের তেল হালকা থেকে মাঝারি ঘনত্বের, সালফারের পরিমাণও কম। ফলে এ তেল পরিশোধন অপেক্ষাকৃত সহজ এবং পরিবেশের জন্য কম ক্ষতিকর।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের মোট তেলের প্রায় ৯৬ শতাংশ আসে আবুধাবি থেকেফাইল ছবি: সংগৃহীত
৬
সংযুক্ত আরব আমিরাত
আবুধাবিকেন্দ্রিক তেলক্ষেত্রগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বিশ্বের শীর্ষ তেলসমৃদ্ধ দেশে পরিণত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশেতে প্রমাণিত তেল মজুতের পরিমাণ ১১৩ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি।
তেল উত্তোলনেও আরব আমিরাত শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। দেশটি দৈনিক গড়ে ৪১ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল উত্তোলন করে।
আরব আমিরাতের মোট তেলের প্রায় ৯৬ শতাংশ আসে আবুধাবি থেকে। দেশটি তাদের উত্তোলিত তেলের ৬৬ শতাংশই রপ্তানি করে।

রাশিয়ার তাতারস্তানে একটি তেলক্ষেত্রফাইল ছবি: সংগৃহীত
৭
কুয়েত
মধ্যপ্রাচ্যের ছোট্ট দেশ কুয়েতের অর্থনীতি পুরোপুরি তেলনির্ভর। আয়তনে ছোট হলেও কুয়েতের হাতে রয়েছে তেলের বিশাল ভান্ডার। দেশটিতে প্রমাণিত তেল মজুতের পরিমাণ ১০১ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি।
কুয়েত দৈনিক গড়ে ২৯ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল উত্তোলন করে। এ তেলের প্রায় ৭১ শতাংশই রপ্তানি হয়। পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠনের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য কুয়েত।
কুয়েত নিজেদের তেল ও গ্যাস উত্তোলন সক্ষমতা আরও বাড়াতে চায়। এ কারণে এ খাতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে। দেশটি নিজেদের তেল পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়াতেও কাজ করছে।

কুয়েতের আহমাদি নর্থ পিয়ারে কাজিমাহ-৩ তেলবাহী জাহাজে অপরিশোধিত তেল তোলার কাজ তদারক করছেন কুয়েত অয়েল ট্যাংকার কোম্পানির কর্মীরাফাইল ছবি: সংগৃহীত
৮
রাশিয়া
জ্বালানি তেল নিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রভাবশালী দেশগুলোর অন্যতম রাশিয়া। দেশটিতে প্রমাণিত তেল মজুতের পরিমাণ ৮০ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি।
তেল মজুতের তালিকায় ৮ নম্বরে হলেও তেল উত্তোলনের তালিকায় ৩ নম্বরে রাশিয়া। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দেশটিকে তেল নিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে। রাশিয়া প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন করে। এটা বিশ্বে প্রতিদিন মোট উত্তোলিত তেলের প্রায় ১১ শতাংশ।
ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দেশটির অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে চাইছে; যদিও এ সুযোগে চীন ও ভারত সস্তায় রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কিনছে। শাস্তিস্বরূপ শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে রাশিয়ার তেল কেনা থামাতে বাধ্য করতে চাইছে।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে একটি তেলক্ষেত্রফাইল ছবি: সংগৃহীত
৯
যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রে প্রমাণিত তেল মজুতের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৭৪ বিলিয়ন ব্যারেল; যদিও দেশটিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুত ঠিক কত, তা নিয়ে তথ্যগত ভিন্নতা রয়েছে। ভেনেজুয়েলায় দেশটির চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ তেল মজুত আছে। তবে মজুত যা-ই হোক, বিশ্বের শীর্ষ তেল উত্তোলনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র।
ইআরএর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি ১২ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন করে। এটা বিশ্বে প্রতিদিন মোট উত্তোলিত তেলের প্রায় ২২ শতাংশ। শুধু শীর্ষ তেল উত্তোলনকারী দেশ নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি তেলের ভোক্তা দেশের তালিকাতেও ১ নম্বরে।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেলের প্রয়োজন পড়ে, যা বিশ্বজুড়ে প্রতিদিনের তেলের চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ।

ড্রোন ব্যবহার করে তোলা ছবিতে লিবিয়ার জাখাররাহ এলাকায় নাফুরা তেলক্ষেত্র। ২৭ আগস্ট, ২০২৪ ছবি: সংগৃহীত
১০
লিবিয়া
উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ায় তেলের মজুত আছে প্রায় সাড়ে ৪৮ বিলিয়ন ব্যারেল। তা সত্ত্বেও তেলের বিশ্ববাজারে তাদের অবদান খুবই সামান্য।
লিবিয়া প্রতিদিন গড়ে ১২ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন করতে পারে। কম তেল উত্তোলনের পেছনে বড় কারণ দেশটিতে এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা।
তবে ইউরোপ আবার উত্তর আফ্রিকার এ দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে। এতে লিবিয়ার তেল ব্যবসা আবারও ফুলেফেঁপে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।