এম জামান
পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে জমে উঠেছে যশোরের পশুর হাটগুলো। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পশুর ডাক, ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম আর গাড়িভর্তি পশুর আনাগোনায় মুখর জেলার ছোট-বড় সব হাট। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, হাটে পশুর সরবরাহ ও ক্রেতাদের ভিড় ততই বাড়ছে।
জেলার বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা গেছে দেশি ও বিদেশি জাতের হাজার হাজার গরু, মহিষ, খাসি ও ভেড়ার সমাগম। তবে বিক্রেতাদের অভিযোগ—হাটে দর্শনার্থী ও স্থানীয় ক্রেতার অভাব না থাকলেও বড় পাইকারদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। ফলে কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন খামারি ও ব্যবসায়ীরা।
হাটে গিয়ে দেখা যায় সারিবদ্ধভাবে বাঁধা রয়েছে দেশি, শাহীওয়াল, নেপালি ও বিভিন্ন উন্নত শঙ্কর জাতের গরু। কোথাও মাঝারি আকারের দেশি গরু ঘিরে চলছে ব্যাপক দরদাম, আবার কোথাও বিশাল আকৃতির ষাঁড় দেখতে ভিড় করছেন উৎসুক দর্শনার্থীরা।
কেনাবেচার উপযোগী ছোট আকারের গরু বিক্রি হচ্ছে ৬৫ হাজার থেকে ৮৫ হাজার টাকার মধ্যে। মাঝারি আকারের গরুর দাম ১ লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা এবং বড় গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া কয়েকটি বিশাল আকৃতির গরুর দাম ৬ থেকে ৮ লাখ টাকাও চাওয়া হচ্ছে।
শুধু গরুই নয়, ছাগল ও ভেড়ার বাজারেও রয়েছে ব্যাপক সরগরম পরিবেশ। বাজারে মাঝারি আকারের ছাগলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন রঙ ও জাতের ছাগলের দাম হাঁকা হচ্ছে ৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
যশোর জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৮টি উপজেলায় মোট ১৯টি পশুর হাট বসেছে। এর মধ্যে যশোর সদরে ৬টি, মণিরামপুরে ৬টি, বাঘারপাড়ায় ৪টি, অভয়নগরে ২টি এবং কেশবপুর, চৌগাছা, ঝিকরগাছা ও শার্শায় একটি করে হাট রয়েছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানায়, জেলায় বর্তমানে ১৩ হাজার ৬৪০টি গবাদিপশুর খামারে মোট ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৭৭টি কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে। এর মধ্যে গরুর সংখ্যা ৩৬ হাজার ২৫৯টি, ষাঁড় ২৮ হাজার ৮৪৪টি, বলদ ৯৫৭টি এবং গাভী ৬ হাজার ৪৫৮টি। এছাড়া ছাগল রয়েছে ৮১ হাজার ২৭৬টি এবং ভেড়া রয়েছে ৪১২টি।
এ বছর যশোর জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ১২৮টি। চাহিদার তুলনায় জেলায় প্রায় ১৪ হাজার ৮৪৯টি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এই উদ্বৃত্ত পশু দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে যশোরের গরুর ভালো চাহিদা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
হাট ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। কোরবানি দিতে আসা ক্রেতা ইমরানুর বাহার বলেন, “দেশি গরুর সরবরাহ এবার অনেক ভালো এবং দেখতেও সুন্দর। তবে দামটা এখনো সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে আসেনি। দরদামে মিললে কিনে ফেলব।”
আরেক ক্রেতা অলিউজ্জামান ওয়ালিদ বলেন, “যাচাই-বাছাই করে পছন্দের গরু খুঁজছি। আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোরবানি দেব, তাই সাধ্যের মধ্যে ভালো মানের পশুই আমাদের লক্ষ্য।”
বিক্রেতাদের অনেকেই কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় কিছুটা হতাশ। যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, খুলনা ও সাতক্ষীরা থেকে বড় ও মাঝারি গাড়ি এবং স্থানীয় নানা যানবাহনে করে পশু নিয়ে আসা খামারিরা জানান, তারা অনেক যত্ন করে পশু লালন-পালন করলেও বাজারে উপযুক্ত দাম পাচ্ছেন না।
হাফেজুর রহমান নামের এক বিক্রেতা জানান, “ছয়টি গরু এনে দুটি বিক্রি করেছি। ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার গরুর দাম উঠছে ১ লাখ ৩০ হাজার। তবে আশা করছি ভারতীয় গরু সীমান্ত দিয়ে না ঢুকলে শেষের দিকে বাজার ভালো হবে।” আরেক বিক্রেতা জাহাঙ্গীর আলমও একই আশা প্রকাশ করে বলেন, “বাজার এখন কিছুটা মন্দা হলেও ঈদের দুই-একদিন আগে বিক্রি জমে উঠবে।”
এদিকে হাটের শৃঙ্খলা ও পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। প্রতিটি হাটে স্থাপন করা হয়েছে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র।
যশোর সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. ফারুক হোসেন বলেন, “কোনো পশু অসুস্থ হলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসার জন্য আমাদের পশু চিকিৎসক দল সার্বক্ষণিক কাজ করছে। এছাড়া গরমে পশুর জন্য পর্যাপ্ত ঠান্ডা পানির ব্যবস্থা রাখতে হাট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
যশোর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. সিদ্দীকুর রহমান জানান, “সীমান্ত দিয়ে যাতে অবৈধভাবে ভারতীয় গরু প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। খামারিরা যাতে তাদের পশুর ন্যায্য মূল্য পান, আমরা তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।”