বাঁকড়া (যশোর) প্রতিনিধি
পুরো পরিবারকে হারিয়ে নির্বাক শহিদুল ইসলাম ছবি: ধ্রুব নিউজ
ভিডিও রিপোর্ট দেখতে ক্লিক করুন
যে বাড়িতে এত বছর পর ফেরা ছেলেকে নিয়ে বিয়ের ধুমধাম আয়োজন হওয়ার কথা ছিল, নতুন পুত্রবধূ ঘরে তোলার আনন্দ থাকার কথা ছিল—সেখানে এখন সারিবদ্ধ চার-চারটি খাটিয়া। স্বজনদের আহাজারি আর চারপাশের স্তব্ধতা ছেয়ে গেছে পুরো গ্রামে। প্রবাসী ছেলেকে বরণ করার সব পারিবারিক প্রস্তুতি মুহূর্তেই রূপ নিয়েছে জানাজা আর দাফনের গভীর বিষাদে।
এ সংক্রান্ত নিউজ -[আরো পড়ুন]
পারিবারিক অভাব-অনটন ঘোচাতে প্রায় ১০ বছর আগে মালয়েশিয়ায় পাড়ি দিয়েছিলেন আরিফ ইসলাম (২৫)। ঋণের বোঝা চুকানো আর ঘরবাড়ির কাজ শেষ করতে গিয়ে দীর্ঘ এক এক দশকে আর বাড়ি ফেরা হয়নি। এবার ৩ মাসের ছুটিতে দেশে ফিরছিলেন চিরতরে পরবাসের ক্লান্তি মুছে নতুন জীবনে পা রাখতে, বিয়ে করতে। সোমবার রাতে যখন ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রাখেন আরিফ, তখন তাকে জড়িয়ে ধরে মা নুর জাহানের চোখ থেকে ঝরেছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার আনন্দের অশ্রু। কিন্তু কে জানত, সেই পরম আনন্দের মুহূর্তটিই হতে যাচ্ছে পুরো পরিবারের এক শেষ যাত্রা!
আজ মঙ্গলবার (২ জুন) ভোর পৌনে চারটার দিকে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের মালিগ্রাম নামক স্থানে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মা, ভাই ও বোনসহ প্রাণ হারিয়েছেন সেই প্রবাসী তরুণ আরিফ। একই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন তার ছোট ভাই রাকিব (১৮), মা নুর জাহান (৫০), বোন আয়েশা খাতুন (২৮) এবং মনিরামপুর উপজেলার গৌরীপুর গ্রামের প্রাইভেটকার চালক জাহিদ হাসান (৩৫)। এক নিমিষেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে একটি পরিবারের সব স্বপ্ন। ইজিবাইক চালক বৃদ্ধ বাবা শহিদুল ইসলাম ছাড়া পরিবারের আর কেউ বেঁচে নেই। এই নির্মম ঘটনায় আয়েশা খাতুনের দুই অবুঝ শিশু আশরাফুল হোসাইন (৭) ও তাসফিয়া (৩) গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
ভাঙ্গা থানায় নিহত আয়েশার স্বামী ইলিয়াছের দায়ের করা এজাহার থেকে জানা যায়, ঢাকা থেকে যশোরগামী প্রাইভেটকারটি (ঢাকা মেট্রো-গ-২৫-৩১৫৫) এক্সপ্রেসওয়ের ভাঙ্গামুখী লেনের মালিগ্রাম নামক স্থানে পৌঁছালে অন্ধকার সড়কে কোনো ব্যারিয়ার বা সংকেত ছাড়া অবৈধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গ্যাস সিলিন্ডার ভর্তি ট্রাকের (ঢাকা মেট্রো-ট-১৮-১১৫৮) পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার তীব্রতায় প্রাইভেটকারটি দুমড়ে-মুচড়ে ট্রাকের নিচে ঢুকে যায়। ঘটনাস্থলেই আয়েশা, নুর জাহান, আরিফ ও চালক জাহিদ মারা যান। গুরুতর আহত ছোট শ্যালক রাকিবকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকেও মৃত ঘোষণা করেন। দুর্ঘটনার পরপরই অজ্ঞাতনামা ট্রাক চালক গাড়ি রেখে পালিয়ে যায়।
নিহত আয়েশার স্বামী ও মামলার বাদী ইলিয়াছ বাকরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, "অভাব ঘোচাতে আরিফ মালয়েশিয়ায় ছিল। এবার দেশে ফিরে বিয়ে করবে বলে পুরো আয়োজন চলছিল। তাকে আনতে ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে শাশুড়ি, আমার স্ত্রী, দুই শ্যালক ও আমার দুই শিশুসন্তান বিমানবন্দরে যায়। গাড়িতে জায়গা না হওয়ায় আমি সঙ্গে যেতে পারিনি। আমার শ্বশুর ছাড়া এই সংসারে আর কেউ বেঁচে রইল না। পথেই সব শেষ হয়ে গেল।"
ওদিকে ঝিকরগাছা উপজেলার বালিযাডাঙ্গা (উজ্জ্বলপুর) গ্রামে বাড়ির কর্তা শহিদুল ইসলাম অধীর আগ্রহে পথ চেয়ে বসেছিলেন। ছেলে ফিরবে, পুরো ঘর আলো করে সবাই একসাথে বসবে—কত শত পরিকল্পনা! কিন্তু ভোরের আলো ফুটতেই সেই আনন্দের বাড়ি পরিণত হলো এক মহাশূন্যতায়। এক যাত্রায় স্ত্রী, দুই ছেলে আর একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে স্তব্ধ পিতা এখন বাড়ির উঠোনে বসে শুধু লাশের অপেক্ষা করছেন। নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস, যে সন্তানদের বরণ করে ঘরে তোলার কথা ছিল, আজ তাদের চিরবিদায় দেওয়ার জন্য খাটিয়া প্রস্তুত করতে হচ্ছে এই বৃদ্ধ পিতাকে। এই নির্মম ট্র্যাজেডিতে পুরো ঝিকরগাছা জুড়ে নেমে এসেছে এক বাকরুদ্ধ শোকের ছায়া। কোনো সান্ত্বনাতেই থামছে না প্রতিবেশীদের চোখের পানি।