ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
আবহমান বাংলার ঋতুচক্রের আবর্তনে আবারও ফিরে এসেছে পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ বাঙালির সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এটি বাঙালির এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। পহেলা বৈশাখ বাঙালির জীবনে এক অনন্য তাৎপর্যময় দিন। এটি কেবল বাংলা নববর্ষের সূচনা নয়, বরং বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক উজ্জ্বল প্রকাশ। ধর্ম, বর্ণ বা শ্রেণি নির্বিশেষে এই দিনটি সকল বাঙালির জন্য আনন্দ, মিলন ও নতুন করে শুরু করার প্রতীক।
এই উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর অসাম্প্রদায়িক চরিত্র। পহেলা বৈশাখ এমন একটি দিন, যেখানে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই একসাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে। এটি প্রমাণ করে যে বাঙালির পরিচয় তার ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত এবং গভীর।
বর্তমান সময়ে কিছু বিতর্ক থাকলেও, পহেলা বৈশাখ মূলত একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐক্যের প্রতীক। মুসলিম সংস্কৃতির সঙ্গে এর সম্পর্কও তাই বিরোধ নয়, বরং পহেলা বৈশাখের সংস্কৃতি মুসলিম জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকেই শুরু হয়েছিল এবং তা বর্তমানে বাংলাদেশে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সহাবস্থানের এক সুন্দর উদাহরণ।
তবে ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হওয়ায় মুমিনের আনন্দ-উৎসবও নির্দিষ্ট আদর্শ ও নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে আবর্তিত হয়। তাই পহেলা বৈশাখের আনন্দ উদযাপনে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি জানা আমাদের জন্য জরুরি।
ঐতিহাসিকভাবে পহেলা বৈশাখ ও ইসলাম
অনেকেই হয়তো জানেন না যে, বর্তমান বঙ্গাব্দের প্রচলনের সাথে ইসলামের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। মোঘল সম্রাট আকবর হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করেই ফসলি সন বা বঙ্গাব্দের সূচনা করেছিলেন যেন কৃষকদের খাজনা আদায়ে সুবিধা হয়। সেই থেকেই পহেলা বৈশাখ অর্থাৎ বৈশাখ মাসের প্রথম দিন কৃষকদের খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য একটি আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে দিনটা পালন করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, এই সনের উৎপত্তিতেই জড়িয়ে আছে মুসলিম ঐতিহ্যের প্রশাসনিক প্রজ্ঞা।
বৈশাখী বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের নামকরণের ইতিহাস
বাংলাদেশে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানটি অর্থাৎ পহেলা বৈশাখের এই আয়োজনটি উৎসবমুখর ও মিলনমেলায় পরিণত করতে বাংলাদেশে বিভিন্ন নামে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে নামকরণ করা হয়। মূলত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ১৯৮৯ সালে প্রথম যে শোভাযাত্রার আয়োজন করে সেটির নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’।
৯০'র স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পটভূমিতে এই শোভাযাত্রা নতুন অর্থ পায়। অশুভের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং শুভ শক্তির আহ্বান—এই বার্তা ধারণ করেই এর নাম হয় 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'। এরপর ধীরে ধীরে এটি শুধু উৎসব নয়, বরং প্রতীকী সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত হয়।
পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করলে এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আরও সুদৃঢ় হয়। তবে গতবছর বাংলা নববর্ষ-১৪৩২ উপলক্ষে আয়োজকরা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র পরিবর্তে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ নাম ব্যবহার করেন। তাদের ভাষ্য—এটি কোনও নতুন নাম নয়, বরং ১৯৮৯ সালের মূল নামের পুনরুদ্ধার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শোভাযাত্রা নাম পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তে দেশজুড়ে মতভেদ তৈরি হয়। এক পক্ষ মনে করে, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ইতোমধ্যেই ঐতিহ্য ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অংশ—এটি পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। অন্যপক্ষের মতে, নামের ভিন্নতা দিয়ে আয়োজনের সার্বজনীনতাকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব।
বর্ষবরণের নানা রকম বর্ণাঢ্য আয়োজন
পহেলা বৈশাখে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন শহর উৎসব আনন্দে ভরে যায়। রাজধানী ঢাকা যেনএকেবারে উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়। এই দিনটি বাংলা নববর্ষের সূচনা, আর রাজধানীতে নানা রঙিন ও ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান হয়। নিচে প্রধান কিছু আয়োজন তুলে ধরা হলো-
১. বৈশাখী শোভাযাত্রা
সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো মঙ্গল শোভাযাত্রা, যা আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইনস্টিটিউট। এবং এটাকেই পহেলা বৈশাখের জাতীয় ও মূল আয়োজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশাল মুখোশ, পাখি, বাঘ, মাছের প্রতিকৃতি,লোকসংস্কৃতির প্রতিফলন।ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখানে একটি বিষয় আপত্তিকরভাবে লক্ষ্যণীয় হল এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের দাড়ি-টুপিকে ব্যঙ্গ করে বিভিন্ন ধরনের মুখোশ ও নানা প্রতিকৃতি তৈরি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে দাড়ি-টুপি পরিহিত লোকজনকে বিভিন্ন মুখোশে রাজাকার বা স্বাধীনতা বিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। যাতে করে নতুন প্রজন্ম অর্থাৎ ছোট্ট ছোট্ট সোনামণিদের কাছে দাড়ি-টুপি ওয়ালাদেরকে রাজাকার বলে একটি নেতিবাচক অবস্থানে দেখানো হয় ।এটা অনেক সময় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত অথবা দেশের মধ্যে সহ অবস্থানরত বিভিন্ন গোষ্ঠী, ধর্ম, বর্ণ ও জাতির মধ্যে একটি বিভাজন তৈরি করে দেওয়া হয় যা কোনভাবেই কাম্য নয়।
বাঙালি সংস্কৃতি ও ইসলামী মূল্যবোধের কোনো বিরোধ নেই, যদি সেই সংস্কৃতি ইসলামের মৌলিক আকিদাকে আঘাত না করে। আমরা পহেলা বৈশাখে পরিবারের সাথে হালাল বিনোদনে অংশ নিতে পারি। সামাজিকভাবেএকে অপরের সাথে কুশল বিনিময় ও সদ্ভাব বজায় রাখতে পারি। কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে উৎসবকে সার্থক করতে পারি।
২. রমনার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান
রমনা পার্ক এর বটমূলে রবীন্দ্রসংগীত ও দেশাত্মবোধক গান দিয়ে ছায়ানট আয়োজন করে ভোরবেলার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
৩. বৈশাখী মেলা
ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয় যেখানে স্থানীয় হস্তশিল্প, মাটির জিনিস, খেলনাপিঠা-পুলি, নাগরদোলা ইত্যাদি নানা দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য স্থান পায়।
৪. ঐতিহ্যবাহী খাবার
মানুষজন উপভোগ করে বাঙালির চেয়ে অচেনা পান্তা-ইলিশ, নানা রকমেরভর্তা, শুঁটকি, পায়েস ইত্যাদি।
৫. সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, টিএসসি, শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে গান, নাচ, নাটক বিভিন্ন টিভি চ্যানেলেও বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়।
৬. ঐতিহ্যবাহী পোশাক
পুরুষ: পাঞ্জাবি
নারী: লাল-সাদা শাড়ি
রাজধানী শহর ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন শহরে এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে।
৭. আলপনা ও সজ্জা
রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তাঘাট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নানা ধরনেররঙিন আলপনা,চারুকলার শিক্ষার্থীদের আঁকা নানান শিল্পকর্ম।সব মিলিয়ে পহেলা বৈশাখে ঢাকা শহর হয়ে ওঠে সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর আনন্দের মিলনমেলা।
বৈশাখী উৎসব পালনে ইসলামের মূলনীতি
ইসলাম আনন্দ প্রকাশ করতে নিষেধ করে না, তবে সেই আনন্দের বহিঃপ্রকাশ যেন অশ্লীলতা বেহায়াপনা অথবা বি জাতীয় সংস্কৃতির সংশ্লিষ্টতায় না হয় অথবা ইসলামী সংস্কৃতির বিপরীতে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে বলে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে পহেলা বৈশাখ পালনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়:
শিরকমুক্ত সংস্কৃতি
ইসলামে তাওহীদ বা একত্ববাদ মূল ভিত্তি। তাই বৈশাখী মেলা বা উৎসবে যদি এমন কোনো আচার যুক্ত থাকে যা অন্য ধর্মের উপাসনার অংশ বা কোনো মূর্তিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়, তবে মুসলিম হিসেবে তা পরিহার করা আবশ্যক।
অপচয় ও অশ্লীলতা পরিহার
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, "নিশ্চয়ই অপচয়কারী শয়তানের ভাই।" উৎসবের নামে অতিরিক্ত অর্থ অপচয় বা পর্দা ও শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করা ইসলাম সমর্থন করে না।
শুভ-অশুভের ধারণা
অনেকে মনে করেন নতুন বছরের প্রথম দিনটি ভালো কাটলে পুরো বছর ভালো কাটবে। ইসলামে এমন কোনো অলৌকিক বা রাশিফল ভিত্তিক ধারণার স্থান নেই। কল্যাণ-অকল্যাণ একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছাধীন।
হালখাতা ও নতুন সংকল্প
পহেলা বৈশাখের একটি সুন্দর দিক হলো 'হালখাতা'। বকেয়া পরিশোধ করে নতুন উদ্যমে ব্যবসা শুরু করা ইসলামের আমানতদারিতা ও স্বচ্ছতার নীতির সাথে চমৎকারভাবে মিলে যায়। এছাড়া নতুন বছরে সুন্দর ও নেক আমল করার নিয়ত করা একজন মুমিনের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে।
বৈশাখী আয়োজন হোক সর্বজনীন
বাঙালি সংস্কৃতি ও ইসলামী মূল্যবোধের কোনো বিরোধ নেই, যদি সেই সংস্কৃতি ইসলামের মৌলিক আকিদাকে আঘাত না করে। আমরা পহেলা বৈশাখে পরিবারের সাথে হালাল বিনোদনে অংশ নিতে পারি। সামাজিকভাবেএকে অপরের সাথে কুশল বিনিময় ও সদ্ভাব বজায় রাখতে পারি। কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে উৎসবকে সার্থক করতে পারি। ২৪ এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে বৈশাখী আয়োজন হোক ধর্ম বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে সকলের জন্য সমান গ্রহণযোগ্য ও সার্বজনীন একটি সুন্দর পরিবেশে। সাধুবাদ জানাই এবারের বর্ষবরণ আয়োজনের পূর্ব প্রস্তুতিতে মাননীয় সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেছেন আনন্দ বা মঙ্গল শোভাযাত্রা নয় এবার পহেলা বৈশাখে শোভাযাত্রার নাম হবে বৈশাখী শোভাযাত্রা।মন্ত্রী বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ উদযাপনের লক্ষ্যে শোভাযাত্রার নাম আনন্দ কিংবা মঙ্গল নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। এই বিতর্কের কোনো মানে হয় না।’তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কোনো বিভাজন চাই না। বৈচিত্র্যের মাধ্যমে আমরা ঐক্য চাই। এ অবস্থায় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবারের পহেলা বৈশাখে শোভাযাত্রা আনন্দ কিংবা মঙ্গল নামে নয়, বৈশাখী শোভাযাত্রা নামে হবে। বৈশাখী আয়োজন যে নামেই হোক না কেন বাংলা নববর্ষের এই দিনটি হোক এ দেশে অবস্থানরত সকল ধর্ম ও বর্ণ ও শ্রেণী পেশার মানুষের কাছে সার্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য । এটাই আমাদের প্রত্যাশা ।
শেষকথা
পহেলা বৈশাখ আমাদের শেকড়ের সন্ধান দেয়, যা মুসলিম ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থেকে সৃষ্ট।তবে নানা শোভাযাত্রার নামে আয়োজিত বর্ষবরণের এই সমস্ত উৎসব গুলো যেন আমাদের ঈমানি চেতনা থেকে বিচ্যুত না করে। অপসংস্কৃতি ও বিজাতীয় অনুকরণ বর্জন করে নিজের স্বকীয়তা এবং ধর্মীয় গাম্ভীর্য বজায় রেখে আমরা যদি এই দিনটি উদযাপন করি, তবেই তা হবে প্রকৃত অর্থেই বাঙালির প্রাণের উৎসব। বাঙালি জাতির এই প্রাণীর উৎসব হোক জাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের কাছে একটি অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সেতুবন্ধন যেখানে থাকবে না কোন প্রকার জাতিগত বৈষম্য অথবা একে অপরের প্রতি ঘৃণা বিদ্বেষ অথবা পারস্পরিক জাতিগত পার্থক্য করনের কোন অনুষঙ্গ। গড়ে উঠুক একটি সুন্দর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। এটাই হোক আমাদের এবছরের পহেলা বৈশাখের প্রত্যাশা ও অঙ্গীকার।
লেখক: গবেষক, কলামিস্ট ও ব্যাংকার