ফিচার ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
ধান, পাট, মুগডাল ও দিয়াশলাইয়ের কাঠির পর এবার মুক্তাপুঁথি দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা সাজানো হচ্ছে সাতক্ষীরায়। জেলার আশাশুনি উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরে ৩৫ হাজার মুক্তাপুঁথির কারুকাজে সাজানো হচ্ছে প্রতিমা। ব্যতিক্রমী এই আয়োজন দেখতে পূজার আগেই মন্দিরে ভিড় করছেন উৎসুক দর্শনার্থীরা।
মন্দির কমিটির সদস্যরা জানান, গত বছর মাটির প্রতিমা তৈরি করা হয়েছিল। এবার দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে প্রতিমায় মুক্তাপুঁথির কারুকাজ করা হচ্ছে। প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষ। এখন চলছে রং করা ও অলংকার সাজানোর শেষ মুহূর্তের কাজ।
মন্দির কমিটি সূত্রে জানা গেছে, প্রতিমার শরীর ও অলংকারে নিপুণভাবে বসানো হচ্ছে মুক্তাপুঁথি। এ কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমাশিল্পী ও কারিগরেরা। ১৪টি প্রতিমা তৈরিতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় চার লাখ টাকা। ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি প্রতিবছর দর্শনার্থীদের নতুন কিছু উপহার দেওয়ার লক্ষ্যেই এবার মুক্তাপুঁথির কারুকাজ বেছে নেওয়া হয়েছে।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর ষষ্ঠীর বোধনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব। বিজয়া দশমীতে বড়দল ইউনিয়নে অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী বুড়িয়া আড়ং মেলা। এ সময় বড়দল বাজার, মধ্যম বড়দল, দক্ষিণ বড়দল, বিষ্ণুপুর, ফাকরাবাদ পূর্বপাড়া, কইসিটি ও বুড়িয়াসহ আশপাশের প্রায় ১০টি মণ্ডপের প্রতিমা একত্র করে বিসর্জন দেওয়া হবে।
দর্শনার্থী সুরের কর্মকার, টুম্পা মণ্ডল, পবিত্র সরকার, অর্পিতা সরকার ও শিখা রাণী বলেন, প্রতিবছর দুর্গোৎসব ঘিরে এলাকায় উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। এবার মুক্তাপুঁথির প্রতিমার কথা শুনে তা দেখতে এসেছেন তারা। সবাইকে মন্দিরে এসে প্রতিমা দেখা ও উৎসবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
প্রতিমাশিল্পী প্রকাশ মণ্ডল বলেন, প্রায় আড়াই মাস ধরে চারজন শিল্পী প্রতিমার কাঠামো তৈরি, মাটির কাজ, রং ও মুক্তাপুঁথির কারুকাজ ফুটিয়ে তোলার কাজ করছেন। মুক্তাপুঁথি সংগ্রহ করা হয়েছে রাজধানীর সদরঘাট এলাকা থেকে। এ কাজে প্রায় এক লাখ টাকার পুঁথি ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিবছরই প্রতিমায় নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেন তারা। এবার দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় দেখা কয়েকটি মূর্তির নকশা ও নিজেদের পরিকল্পনা মিলিয়ে প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে। চারজন শিল্পীর ৫২ দিনের পরিশ্রমে ১৩টি প্রতিমায় প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তাপুঁথি ব্যবহার করা হচ্ছে। কাজের প্রায় ৯৭ শতাংশ শেষ হয়েছে। এখন চলছে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ।
বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি অর্ধেন্দু মণ্ডল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ মন্দিরে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবার ভারতের প্রতিমার থিম অনুসরণ করে ভাস্করদের পরামর্শে ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছে। এ জন্য প্রতিমাশিল্পীর পেছনে প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি প্রতিবছর নতুন কিছু করার চেষ্টা করা হয়। এবার মুক্তাপুঁথির কারুকাজ প্রতিমায় ভিন্নতা এনেছে।
কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রবীর মণ্ডল বলেন, প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে পূজার আগেই অনেকে মণ্ডপে আসছেন। পূজার পাঁচ দিন সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। মণ্ডপের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
আশাশুনি উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রনজিত কুমার বৈদ্য বলেন, এ বছর উপজেলায় ১০৬টি মন্দিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। বিভিন্ন মণ্ডপে ব্যতিক্রমী প্রতিমা ও নান্দনিক সাজসজ্জার আয়োজন করা হয়েছে। বড়দল ইউনিয়নের বুড়িয়ায় মুক্তাপুঁথির কারুকাজের পাশাপাশি ঘুঘুমারীতে ঝরনার আদলে এবং বুধহাটা কাছারিবাড়ি ও দক্ষিণ বড়দলে ডাল দিয়ে প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্যে বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের মুক্তাপুঁথিতে সাজানো প্রতিমা দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শ্যামানন্দ কুন্ডু বলেন, উপজেলার ১০৬টি মণ্ডপে দুর্গোৎসব সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করতে প্রশাসনিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পূজা চলাকালে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, সাদাপোশাকের বিশেষ দল ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।