Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

উপলব্ধি বনাম পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি

সিদ্দিকা লাকী সিদ্দিকা লাকী
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর,২০২৬, ১০:১৯ পিএম
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর,২০২৬, ১১:০৩ পিএম
উপলব্ধি বনাম পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি

১.মধ্যদুপুরে...

অফিসের মধ্যদুপুর,অত্যাবশ্যকীয় মিটিং,গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে টানটান উত্তেজনা নিয়ে নিজ অফিস কক্ষে ফেরার জন্য লিফটের ভেতর কিছু সময়। হঠাৎ করেই আমার একজন প্রিয় পুরুষ সহকর্মী বলে উঠলেন, আপা আপনার হাতের ঘড়িটা তো খুব সুন্দর। আমি সবিনয়ে ধন্যবাদ জানালাম। কথা এখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু হলো না। তিনি আরো বলেন, এই ঘড়ি তো আপনার হাতে মানাচ্ছে না, মনে হচ্ছে এটা পুরুষদের ঘড়ি। আমি অপ্রস্তুতভাবে খানিকটা হেসে উত্তর দিলাম, ভাই, এটা পুরুষদের নয় এটা লেডিস ঘড়ি, ফসিল ব্র্যান্ডের লেডিস ঘড়ি। বাড়তি তথ্য দিয়ে বললাম যিনি উপহার দিয়েছেন তিনিও একজন মহিলা। সুদূর আমেরিকা থেকে নিয়ে এসেছে। আমার এসব কথা ভদ্রলোককে কোনোভাবেই কনভিন্স করতে পারলো না। লিফ্ট থেকে নেমে তিনি কন্টিনিউ করলেন যে, আজকাল মেয়েদের জন্য অনেক জিনিস বানানো হচ্ছে, যা আসলে ছেলেদের জন্য। আমি কেন জানি তার সাথে এসব নিয়ে কোনো কথা বাড়ালাম না। তারপর নিজ অফিস কক্ষে এসে ভদ্রলোকের কথাগুলো নিরালায় বসে বিশ্লেষণ করলাম। আমি ভেবে দেখলাম তিনি তো প্রথমদিকে আমাকে পজিটিভলি উইশ করলেন। কিন্তু সামান্য একটা হাত ঘড়ি নিয়ে এত বিশ্লেষণ করলেন কেন? কারণ হিসেবে আমি বুঝতে পারলাম, তার মধ্যে সাধারণ যেকোনো বিষয় নিয়ে এন্টি ফেমিনিজম মনোভাবের একটি প্রভাব রয়েছে। তা না হলে  তিনি আমাকে একটি ঘড়ি নিয়ে এতগুলো কথা কোনো কারণ ছাড়াই শুধুমাত্র সহকর্মী হিসেবে ক্যাজুয়ালি শুনিয়ে দিতেন না। ভাগ্য ভালো আমার পরনের পোশাক ছিল এদেশের সাধারণ নারীদের অফিস কালচারে যে মার্জিত পোশাক অনুমোদিত, ঠিক সেরকমই একটি তিন টুকরো জামা। এখন বলি, কেন এই ঘটনাটা তুলে ধরলাম? কর্মস্থলে আপনারা অনেকেই নারী পুরুষ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বা আচরণ সমস্যায় পড়ে থাকেন কিংবা বুলিংয়ের শিকার হন। মনে রাখবেন, আমি আমার যে পুরুষ সহকর্মীর উদাহরণ তুলে ধরলাম, ঠিক এমন গোছের কাউকে যদি আপনি ফেস করেন, তাহলে আপনাকে এমন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগের তথা বুলিংয়ের শিকার হতে হবে। আমার কাছে মনে হয় প্রাথমিকভাবে এধরনের সহকর্মীকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে পারলে কিংবা বিনা প্রয়োজনে মিথস্ক্রিয়া না করলে তারা আপনার প্রতি এসব সস্তা বাক্য প্রয়োগ করতে পারবেন না। 

আরও পড়ুন-

প্রতারক চিনবেন যেভাবে... প্রতারক চিনবেন যেভাবে...

২. আড়ংয়ে...

আড়ংয়ের ঘটনা।এবার সিনমেকার আমি। যথারীতি কেনাকাটা শেষে বিলিং কাউটারে পে করতে অন্যান্যদের মতো আমিও প্রস্তুত। লাইন মাঝারি ভীড় সম্পন্ন মনে হলো। আমার সামনে এক বয়স্ক ভদ্রমহিলা বিল পে করতে গেলে কাউন্টারের ডিউটি পারসন তাকে ভাংতি কিছু টাকা রেডি করতে বললেন। সম্ভবত তাদের লাইফ স্টাইল মেম্বারশীপ কার্ডের পয়েন্ট সমন্বয় করে বিল পে করা হচ্ছিল। যাই হোক। টাকার এমাউন্টও খুব সামান্য। কিন্তু তাদের দুজনের কাছেই খুচরা টাকা নেই, আবার এত কম টাকা যে আড়ং সদস্যরা কার্ড থেকেও বিল রাখতে চাচ্ছিল না। আমি তাৎক্ষণিক ভাবে আন্টিকে অফার করি, আন্টি আমি দিয়ে দেই, তিনি অবাক হয়েও রাজী হলেন। আর আমার উদ্দেশ্য ছিল সময় বাঁচানো এবং ভীড় থেকে মুক্তি পাওয়া। তারপরে আমার বিল পে হওয়া পর্যন্ত আন্টি অপেক্ষা করে আমার কন্টাক্ট নম্বর নিলেন। বললেন, বাসায় গিয়েই তারা বিকাশে আমাকে শোধ করে দেবেন। যেই কথা সেই  কাজ, বিকাশ পাঠিয়ে আমাকে ফোন করে যেন শান্তি পোলেন।

তারপরে আমার পরিচয় জানতে চাইলে নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দিলাম। আন্টি অনেক কৃতজ্ঞতা এবং আনন্দযুক্ত গর্ব প্রকাশ করে ফোন রাখলেন।

এখানে আমি কী দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করেছিলাম? কীই বা উপলব্ধি করেছিলাম?

ভাইরাল হওয়ার সম্ভাবনাও তে উড়িয়ে দেয়া যায় না।না এরকম কিছু নয়।

আমার কাছে মনে হয়েছে আমি উদ্ভুত পরিস্থিতিতে আমার আন্তরিকতা প্রকাশের চেষ্টা করেছি মাত্র।তিনি রাজী না হলে তো আমি এ গল্প লিখতে পারতাম না।

আমি নিভৃতচারী মানুষ।ভাইরাল হবার বা সস্তা জনপ্রিয়তা আমার আরাধ্য নয় কখনো।

আমি দুধ কা দুধ,পানি কা পানি তেই বিশ্বাস করি এবং চর্চা করে সুখ পাই।

দৃষ্টিভংগি প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমার পরিপক্কতা বা পক্ষপাতমুক্ত আচরন প্রকাশ করেই যেন স্বস্তি বোধ করি।

আমি একটু এই ট্র্যাকের বাইরের মানুষ।উপকার করতে পারলে করবো না পারলে না।প্রতিদান শব্দটি পটভুমিতে রেখে আমি কোন কাজ করি না।

দৃষ্টিভঙ্গিকে সফলতার অন্যতম নিয়ামক বলা হয় যা কঠোর পরিশ্রম, সময়, টাকা এসব কিছুকেই হার মানায়।

কথায় আছে, দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টান, জীবন পাল্টে যাবে। একেবারেই প্রমাণিত সত্য। চলুন সত্যের পথেই থাকি।

আরও পড়ুন-

করিম তাঁতীর সততার কথা মনে পড়ে গেল করিম তাঁতীর সততার কথা মনে পড়ে গেল

৩. করোনা কালে...

করোনা কালের বিপন্ন দিনগুলোতে রীতিমতো  দায়িত্ব পালন করেই চলেছি।একদিন অফিস ফিরতি পথে জরুরি প্রয়োজনে বনানী এলাকায় মোবাইল ফোনের দোকানে প্রবেশ করি।

একটি বাটন ফোন জরুরি দরকার। কেনা হলো। ইতিমধ্যে তুমুল বৃষ্টি, বইয়ে পড়া কুকুর বিড়াল বৃষ্টির মতো। ডিউটি সহকর্মী গাড়ি থেকে ছাতা বের করে আমাকে কোনরকমে গাড়ি পর্যন্ত উঠতে সহযোগিতা করে।সে সময় ড্রাইভার অনুরোধ করে বলে,স্যার ওই যে দেখেন এক ভদ্র মহিলা খুব অনুরোধ করেছে,অনেক গাড়িকে বলেছে,কেউ নেয় নি,বাস পাচ্ছে না।আমাকে বলেছে আপনাকে বিষয়টি বলে বিবেচনা করতে।তিনি নাকি পুলিশ ছাতা দেখে বুঝতে পেরেছিলেন এটি পুলিশ গাড়ি।যাই হোক,তখনই মহিলা ভিজে কাক অবস্থা।আর অনেক মানুষও বৃষ্টিতে নাজেহাল। আমি নিজে দেখে তাকে আমাদের গাড়িতে উঠার অনুমতি দেই।

গাড়িতে উঠেই তিনি প্রথমেই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করার ভাষা খুজে পাচ্ছিলেন না।বললেন যে তিনি পেশায় একজন উকিল।তিন কন্যা সন্তানের জননী।গনভবনে গিয়েছিলেন একটি জরুরী কাজে, সেখান থেকে ট্যাক্সি নিয়েছিলেন উত্তরা যাবেন বলে।প্রবল বৃষ্টির কারনে ড্রাইভার তাকে এখানেই নামিয়ে গন্তব্য পর্যন্ত যেতে অপারগতা প্রকাশ করে।তাই নিরুপায় হয়ে কাক ভেজা শরীরে সবাইকে অনুরোধ করে চলেছেন যেন তাকে একটু সহযোগিতা করা হয়।

আর আমাদের গাড়ির পুলিশ ছাতা দেখে তিনি বুঝেছিলেন যে এটা পুলিশ  গাড়ি হতে পারে।আমাকে আমার কর্মস্থল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে আমি বললাম, আমরা বাংলাদেশ পুলিশ সদস্য। একটি গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত সংস্থায় কর্মরত আছি। তিনি জেনে খুব খুশি এবং অবাক হলেন।বললেন,মহান আল্লাহ তায়ালা বুঝি এভাবেই ফেরেশতা পাঠিয়ে আমাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করেন এবংআজই বাসায় ফিরে তার আমেরিকা প্রবাসি বড় মেয়ের কাছে বাংলাদেশ পুলিশ সম্পর্কে  বলবেন। আরও বললেন, এদেশের সাধারন মানুষের পুলিশের ভালো দিকগুলো সম্পর্কে কোন ধারনাই নেই।তিনি কল্পনাও করতে পারছেন না যে, এই অসহায় বৃষ্টিভেজা রাতে তাকে পুলিশ গাড়িতে করে নিরাপদে পৌছানোর ব্যবস্থা  করা হবে।উত্তরা তিন নম্বর সেক্টরে বাসায় নামার সময় বিনীতভাবে আবারও ধন্যবাদ সহ আমাদের জন্য দোয়া করবেন বলে গেলেন।

জীবন বড়ই অদ্ভুত। এই ভদ্রমহিলার সাথে আমাদের হয়তো আর কখনোই দেখা হবে না। কিন্ত তার কাকভেজা শরীরে সেই মুহুর্তের বিপদে পাশে দাড়ানোর স্মৃতিটুকু আমাদের কালের সাক্ষী হয়ে থেকে যাবে।

আরও পড়ুন-

কী যে চায় এ মন, কী খোঁজে সারাক্ষণ কী যে চায় এ মন, কী খোঁজে সারাক্ষণ

৪. স্লীভলেস জামা...

এবার আসুন, স্লীভলেস জামা পরিহিতাদের অপরাধ খুঁজে বের করি।সমস্যা যদি স্লীভলেস জামাতেই হতো,তাহলে বোরখাওয়ালী,হিজাবীরা কেন সেইম সিচুয়েশন (ধর্ষণ) ফেস করবে?

তার যদি শরীর ঢেকে চলার আবশ্যকতা থাকে, তাহলে আপনারও তো নজর হেফাজত করার দায়িত্ব আছে না কি? পরিধেয় বস্ত্র যদি বুলিংয়ের অন্যতম কারন হয়ে থাকে,তাহলে চলুন মার্কেট বিশ্লেষণ করি। সেই মেয়েটি এই পোশাক পেল কোথা থেকে?

গার্মেন্টস তথা দর্জির দেশের বাজার থেকেই তো। আর তাকে ভালোমন্দ শেখানোর জন্য তার পরিবারই যথেষ্ঠ। আপনাকে তো কন্ট্রাকে দেওয়া হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে হলে খুব মজা করে শুনতাম-

একটা করে ব্রাজিল ধর্,

ধরে ধরে নিপাত কর্।

বুঝতেই পারছেন এটা আর্জেন্টিনা সাপোর্টারদের ডায়ালগ হতে পারে।

ঠিক সেভাবে আপনাকে তো বিশেষ একটি গোত্রকে নিপাত বা নির্যাতন করার জন্য কেউ নিয়োগ দেয় নি। তাহলে এত বড় সাহস আসে কোথা থেকে?

প্রয়োজন সঠিকভাবে চিহ্নিতপূর্বক আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং সর্বস্তরে সুশাসনের সমাহার। ফসিল ঘড়ি ছেলেদের না মেয়েদের, এরকম মানসিকতা নিয়ে আর যাই হোক, সভ্যতাকে এগিয়ে নেওয়া যায় না।

 

লেখক: কবি, গদ্যকার ও মোটিভেশনাল স্পিকার। অতিরিক্ত ডিআইজি হিসাবে সিআইডিতে কর্মরত।

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)