হাবিবুল্লাহ বিলালী তুহিন
অনানুষ্ঠানিক খাত/ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত (Informal Sector) মূলত এমন সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কভার করে যা সরকারের কোনো সংস্থায় নিবন্ধিত নয় এবং যেখানে শ্রম আইনের প্রচলিত নিয়ম কানুন কঠোরভাবে মানা হয় না। আশির ও নব্বই দশকের তুলনায় বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক (ইনফরমাল) খাত আকার, প্রযুক্তিগত ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে অভাবনীয়ভাবে এগিয়েছে।
তবে চার দশক পার হলেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই খাতের ওপর নির্ভরশীলতা প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ৪৩ থেকে ৪৯ শতাংশ এবং মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ থেকে ৮৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতের নিয়ন্ত্রণে। অর্থাৎ, অর্থনীতির আকার বাড়লেও এই খাতের বিশালত্ব কমেনি, বরং এর অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর ঘটেছে। মোদ্দাকথা, আশির বা নব্বই দশকে অনানুষ্ঠানিক খাত যেখানে ছিল কেবলই "টিকে থাকার লড়াই" (Survival Economy), বর্তমানে তা প্রযুক্তির ছোঁয়ায় একটি "গতিশীল ও বিকাশমান অর্থনীতিতে" (Dynamic Economy) রূপান্তরিত হয়েছে।দেশের সাম্প্রতিক উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের এই সময়ে অনানুষ্ঠানিক খাতই সাধারণ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে টিকে আছে।
অপরপক্ষে বাংলাদেশের জিডিপির সিংহভাগ (প্রায় ৫৭%) আসে মাত্র ১৩-১৬% আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান থেকে। সত্য বলতে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের বাজেট, বরাদ্ধ, নীতিমালা, প্রণোদনা, পরিকল্পনা, প্রযুক্তি, বিন্যাস,ব্যবস্হাপণা সহ অন্যান্য উন্নয়ন অগ্রগতির সকল কর্মযজ্ঞই ১৩-১৬% আনুষ্ঠানিক খাতকে ঘিরে। বাংলাদেশের বর্তমান চব্বিশোত্তর প্রেক্ষাপটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এই মুহূর্তে কোনো একক খাতের ওপর নির্ভর না করে উভয় খাতের সমন্বিত কৌশল (Hybrid Approach) নিতে হবে, তবে স্বল্পমেয়াদে অনানুষ্ঠানিক খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া (Formalization) এবং দীর্ঘমেয়াদে আনুষ্ঠানিক খাতের পরিধি বাড়ানোতে সবচেয়ে বেশি জোর দিতে বলছেন সংশ্লিষ্ট সেক্টরের বিশেষজ্ঞ মহল।
এক্ষণে প্রধান প্রধান অনানুষ্ঠানিক খাত সম্পর্কে পরিচিত হয়-
১. কৃষি ও মৎস্য খাত
ক্ষুদ্র কৃষক ও বর্গাচাষী: যারা নিজের জমিতে বা অন্যের জমিতে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ করেন।
দিনমজুর: দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করা কৃষি শ্রমিক।
মৎস্যজীবী ও পশুপালনকারী: যারা একক বা পারিবারিক উদ্যোগে মাছ ধরেন বা গবাদি পশু লালন-পালন করেন।
২. খুচরা ব্যবসা ও হকার্স
ফুটপাতের দোকানদার ও হকার: রাস্তা বা ফুটপাতে পণ্য বিক্রয়কারী ভাসমান ব্যবসায়ী।
মুদি দোকান: পাড়া-মহল্লার অনিবন্ধিত ছোট ছোট দোকান।
কাঁচাবাজারের বিক্রেতা: শাকসবজি, মাছ-মাংস ও ফলমূলের খুচরা বিক্রেতা।
৩. পরিবহন খাত
রিকশা ও ভ্যান চালক: মানবচালিত বা ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যানের চালক ও মেকানিক।
অনুমোদনহীন গণপরিবহন শ্রমিক: লেগুনা, ইজিবাইক বা অনিবন্ধিত সিএনজি চালক।
লোডার ও কুলি: বাস টার্মিনাল, রেল স্টেশন বা ঘাটে পণ্য খালাসকারী শ্রমিক।
৪. গৃহস্থালি সেবা ও যত্ন (Domestic Work)
গৃহকর্মী: বাসাবাড়িতে রান্নাবান্না ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত কর্মী।
কেয়ারগিভার: শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি বা বয়স্কদের দেখাশোনার কাজে যুক্ত খণ্ডকালীন বা পূর্ণকালীন কর্মী।
৫. নির্মাণ খাত ও ম্যানুফ্যাকচারিং
রাজমিস্ত্রি ও জোগালি: নির্মাণ কাজের দৈনিক বা চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক।
ক্ষুদ্র কুটির শিল্প: বাড়িতে বসে হস্তশিল্প, বুটিক, মাটির তৈরি জিনিস বা কারুপণ্য তৈরি।
ভাঙারি বা স্ক্র্যাপ ব্যবসা: বর্জ্য সংগ্রহকারী এবং রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত ব্যক্তি।
৬. স্ব-কর্মসংস্থান ও ফ্রিল্যান্স সেবা
দক্ষ কারিগর: দর্জি, রাজমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার বা মেকানিক যারা স্বাধীনভাবে কাজ করেন।
টিউটর বা গৃহশিক্ষক: প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া টিউশনি বা কোচিং সেবা প্রদানকারী।
আরও পড়ুন-
মধ্যবিত্তের মনস্তত্ত্ব: দ্বান্দ্বিকতা ও জীবনের আখ্যান
বিপ্লব দাশগুপ্ত তাঁর ১৯৭৩ সালের প্রকাশনায় অনানুষ্ঠানিক খাতের কাজের শ্রেণীবিন্যাসে যে প্রধান তিন ধরনের কাজের উদাহরণ দেন তা হলো:
এক. ‘অদক্ষ’ ম্যানুয়াল শ্রমিক যার মধ্যে রয়েছে বাবুর্চি ও গৃহকর্মী, দারোয়ান ও পিয়ন, ঝাড়ুদার ও মেথর, রিকশাচালক ও ঠেলাগাড়ি, কুলি, ধোপা-নাপিত ও মুচি, মালী ও বর্জ্য কাগজ সংগ্রাহক, বিড়ি প্রস্তুতকারী;
দুই. দক্ষ ম্যানুয়াল কর্মী যার মধ্যে রয়েছে বিল্ডার, প্লাম্বার, রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি; টার্নারস, গ্রাইন্ডারস, ড্রিলারস, মুল্ডারস, স্মেল্টারস, স্মিথস; গাড়িচালক, কুমার, জুয়েলার্স, ঘড়ি মেরামত, বই বাঁধাই, রেডিও মেকানিক ও ইলেকট্রিশিয়ান, দর্জি ও কারখানা শ্রমিক;
তিন. হস্তশিল্পী যার মধ্যে রয়েছে খাদ্য, পানীয়, তামাক; টেক্সটাইল তৈরির পেশা; পোশাক তৈরি এবং বস্ত্রবয়ন; চামড়াজাত পণ্য; কাঠ-বেত-বাঁশ সংক্রান্ত পেশা; মুদ্রণ ও বাইন্ডিং সংক্রান্ত পেশা; মেটাল বা লোহা সংক্রান্ত পেশা; জাহাজ ও নৌকা তৈরি ইত্যাদি (Dasgupta, 1973, p. 67)।
এসব পেশা থেকে এটুকু সহজেই বিবেচনা করা যায় যে, অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমশক্তির অধিকাংশ তাদের আয়ের বা মজুরির মাধ্যমে কোনোক্রমে বেঁচে থাকার সুযোগ পান ঠিকই, কিন্তু তা দারিদ্র্য মোচনে, বিশেষ করে মৌলিক চাহিদা পূরণে তাদের সমর্থ করে তোলে না। খুব অল্প সংখ্যক উদ্যোক্তাই সফল হন ছোট উদ্যোক্তা থেকে নিজেদের ব্যবসা বা সেবা প্রদানকে বড় ও লাভবান করতে।
অনানুষ্ঠানিক খাতকে আনুষ্ঠানিক খাতের উপযোগী করতে দক্ষতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল লেনদেন ও আইনি নিবন্ধনের পাশাপাশি নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে, পারস্পরিক সহযোগিতা মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে কতিপয় সুপারিশ -
দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ: আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও কারিগরি প্রশিক্ষণ বাড়ানো।
ডিজিটাল লেনদেন: নগদ লেনদেনের বদলে ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে বেতন প্রদান।
নিবন্ধন ও নিয়ম মেনে চলা: হকারদের জন্য সাধারণ ব্যবসার মতো জটিল ও ব্যয়বহুল ট্রেড লাইসেন্স প্রক্রিয়ার বদলে নামমাত্র ফিতে একটি "স্মার্ট মাইক্রো-ট্রেড লাইসেন্স" চালু করা। এটি তাদের ব্যবসাকে আইনি বৈধতা দেবে এবং উচ্ছেদ বা চাঁদাবাজির ঝুঁকি কমাবে।
মানসম্মত উৎপাদন: পণ্যের মান ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করা।
আনুষ্ঠানিক খাত কর্তৃক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
শ্রমিকদের সুরক্ষা: কাজের স্থানে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও দুর্ঘটনা বিমা চালু করা।
ন্যায্য পারিশ্রমিক: অনানুষ্ঠানিক খাতের সাব-কন্ট্রাক্ট শ্রমিকদের নির্দিষ্ট ও ন্যায্য মজুরি দেওয়া।
আইনি অধিকার: কাজের চুক্তিপত্র এবং শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
বাজার সংযোগ: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় বাজারের সাথে যুক্ত করে কাজের স্থায়ী সুযোগ তৈরি করা।
হকারদের ডাটাবেজ ও নিবন্ধন: জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে সকল হকার ও ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করে আইডি কার্ড প্রদান করা।
Holiday মার্কেট ও ডেজিগনেটেড জোন: নির্দিষ্ট দিন বা সময়ে (যেমন: ছুটির দিনে বা রাতে) নির্দিষ্ট রাস্তায় ব্যবসার অনুমতি দেওয়া, অথবা হকারদের জন্য স্থায়ী 'হকার্স মার্কেট' তৈরি করা।
ডিজিটাল মাইক্রো-ফাইন্যান্স: মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, রকেট, নগদ,এমক্যাশ) বা ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তাদের স্বল্প সুদে জামানতবিহীন ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়া।
আরও পড়ুন-
বাংলাদেশ ও মধ্যবিত্তের ক্ষমতায়ন: যে কথা বলার আছে
ডিজিটাল ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তি (Financial Inclusion)
বাংলা কিউআর (Bangla QR),উল্লেখ এক্ষেত্রে ব্যাপকভিত্তিক কাজ করছে বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংক,উল্লেখযোগ্য ভাবে ইসলামি ব্যাংক, ডাচ বাংলা, পূবালী, ব্যাংক এশিয়া ইত্যাদি এবং মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট: হকারদের জন্য সহজ শর্তে ক্ষুদ্র মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করা। এর মাধ্যমে কাস্টমাররা বিকাশ, নগদ বা ব্যাংকিং অ্যাপের 'Bangla QR' কোড স্ক্যান করে সরাসরি পেমেন্ট করতে পারবেন। এতে তাদের নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা কমবে এবং লেনদেনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রেকর্ড তৈরি হবে।
ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোরিং: হকারদের নিয়মিত ডিজিটাল লেনদেনের ট্র্যাক রেকর্ড দেখে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের 'ক্রেডিট স্কোর' নির্ধারণ করতে পারে। এর ওপর ভিত্তি করে কোনো জামানত ছাড়াই (Collateral-free) স্বল্প সুদে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ দেওয়া সম্ভব, যা তাদের দাদন ব্যবসায়ী বা চড়া সুদের এনজিওর হাত থেকে রক্ষা করবে।
নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্ট (No-Frill Accounts): বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নীতিমালার আওতায় মাত্র ১০ বা ১০০ টাকায় হকারদের জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধা দেওয়া, যা তাদের সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়াবে।
আইনি স্বীকৃতি ও একক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা (Micro-Licensing)
স্মার্ট আইডি কার্ডের স্থায়ী ব্যবহার:ঢাকা ও চট্টগ্রাম এই দুই সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান QR কোড সম্বলিত আইডি কার্ডের ডেটাবেজকে আরও উন্নত করা। এই আইডি কার্ডটিই যেন তাদের ব্যবসায়িক লাইসেন্স হিসেবে কাজ করে।
করপোরেট ও গ্লোবাল ব্র্যান্ডের সাথে সাব-কন্ট্রাক্টিং (Corporate Linkage)
ব্র্যান্ডেড কিয়স্ক (Branded Kiosks): দেশের বড় বড় প্লাস্টিক, টেক্সটাইল বা জুতো প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো হকারদের ফুটপাতে বসার জন্য আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব মোবাইল কিয়স্ক বা ভ্যান সরবরাহ করতে পারে। এতে কোম্পানির ব্র্যান্ডিং হবে এবং হকাররা আনুষ্ঠানিক সাপ্লাই চেইনের অংশ হতে পারবে।
ই-কমার্স ও লজিস্টিকস পার্টনারশিপ: বড় বড় ই-কমার্স বা গ্রোসারি ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলো হকারদের তাদের লোকাল ডেলিভারি হাব বা 'পিক-আপ পয়েন্ট' হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এতে হকারদের আয়ের ফরমাল একটি উৎস তৈরি হবে।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী (Social Safety Net):
ক্ষুদ্র বিমা (Micro-Insurance): রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বা বীমা কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে হকারদের জন্য নামমাত্র প্রিমিয়ামে স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনা বিমা চালু করা। ব্যবসা চলাকালীন কোনো দুর্ঘটনা বা বড় অসুস্থতা হলে এই বিমা তাদের আর্থিক নিরাপত্তা দেবে।
পেনশন স্কিম: সরকারের সর্বজনীন পেনশন স্কিমের (যেমন: 'প্রগতি' বা 'সুরক্ষা' প্যাকেজ) আওতায় হকারদের বাধ্যতামূলক বা উৎসাহমূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে প্রবীণ বয়সে তারা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা পান।
অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা ও কর প্রদান (Infrastructure & Tax Co-existence)
পরিচ্ছন্নতা ও ইউটিলিটি ফি: সিটি কর্পোরেশনের নির্ধারিত জোনগুলোতে হকারদের জন্য বিদ্যুৎ, পানি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুবিধা দেওয়া। বিনিময়ে হকাররা প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট "ইউটিলিটি ও টোল ফি" ডিজিটাল মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেবে। এটি তাদের এক প্রকার করদাতা হিসেবে পরোক্ষভাবে ফরমাল সেক্টরে রূপান্তর করবে।
এই পদ্ধতিগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সহ সারা বাংলাদেশের ছোট বড় যে কোন শহরের হকার থেকে শুরু করে অনানুস্ঠানিক খাতের যে কোন এনটিটি আর শহরের জন্য "বোঝা" বা "অনুপ্রবেশকারী" থাকবেন না, বরং তারা ট্যাক্স ও জিডিপিতে অবদান রাখা একটি সুশৃঙ্খল অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবেন।
সত্য এটাই যে অনানুষ্ঠানিক খাতের অনেক বেশির ভাগ জায়গা কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, পুঁজির নিরাপত্তা, আয়ের নিরাপত্তা ভঙ্গুর ও ক্ষণস্থায়ী। অনেক ক্ষেত্রে জীবনীশক্তি তথা শরীর বিনাশী। আর দৃশ্যমান অনেক ক্ষেত্রে তো হকার পুলিশের ইদুর বিড়াল খেলা চলতেই থাকে। এক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করায় ধর্তব্য। আর তার কারণ সহজে উল্লেখ করেছেন প্রাবন্ধিক আহমেদ শরীফ-
'জীবন-জীবিকার নিরুপদ্রব নিরাপত্তাই সব ভালোর উৎস ও ভিত্তি’
–প্রাবন্ধিক আহমেদ শরীফ (শরিফ, ২০১১, পৃ. ৮১)
প্রসঙ্গত বাংলাদেশে অনানুষ্ঠানিক খাত, বেকারত্ব, কর্মসংস্থান ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণার পুরোধা ব্যক্তি এটিএম নুরুল আমিন স্যারের একটি লেখায় রেফারেন্স এনেছেন -
'স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামব্যবস্থা ভেঙে পড়া, শিল্পবিপ্লব ও নগরভিত্তিক শিল্পায়ন ও বিনিময় বা বাণিজ্যিক অর্থনীতির প্রসারের ফলে জীবন-জীবিকার জন্য ‘চাকরি’ (জব বা এমপ্লয়মেন্ট) কতটা জরুরি হয়ে উঠেছে, তা বোঝানোর জন্য জন মেনার্ড কেইনস (১৮৮৩-১৯৪৬) ও অস্কার ল্যাঞ্জ-এর (১৯০৪-১৯৬৫) বক্তব্য স্মর্তব্য। কেইনসের মতে, লোক নিয়োগের কোনো প্রয়োজন না থাকলেও চাকরি দেওয়ার জন্য গাছের সবুজ পাতাকে প্রথমে কালো রং এবং পরে তা পরিষ্কার করার জন্য হলেও চাকরিপ্রার্থীদের নিয়োগ দাও।'
পরিশেষ
আমাদের দেশে অনানুষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ব্যাপকতার মূলে রয়েছে দারিদ্র্যতা ও বেকারত্ব। আর এই দারিদ্র্যতা ও বেকারত্ব যেনতেন ভাবে ঢাকতে যত্রতত্র মানুষ তার সামান্য ক্যাপাসিটির নিজস্ব উপায় উপকরণ ব্যবহার করে জীবন জীবিকার যুদ্ধ চালিয়ে নিচ্ছে প্রতিদিন, চিরদিন। যা অনেক উন্নত, নিরাপদ জীবন তো নয়ই, বরং এ সামান্য রুটি রুজির পেশাকে বহন করে নিতে হচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে। কথিত আছে একজন ব্যক্তির তিন দিনের বেশি বেকার থাকা সম্ভব না। কারণ তাহলে তাকে পরিবার সহ অভুক্ত থাকতে হবে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাবলম্বী হওয়া এবং শ্রমের মর্যাদা রক্ষায় রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত জোরালো ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। ইসলামে বেকারত্বকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং হালাল উপার্জনের জন্য কায়িক শ্রম ও কর্মের সুযোগ তৈরি করাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কোরো। মন্দ কর্ম ও সীমা লঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা কোরো না। ( সুরা: মায়েদা, আয়াত-২)। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, যে ব্যক্তি মানুষের উপকারে নিয়োজিত থাকে সে আল্লাহর কাছে অধিক উত্তম।
(মুজামুল আউসাত : ৬/১৩৯)
তাই সুযোগ থাকলে মানুষের উপকার করার চেষ্টা করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব। মানুষের উপকার করার অন্যতম মাধ্যম হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টির চেষ্টা করা।
লেখক: কৃষিবিদ ও বিশ্লেষক। একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত