❒ মহাসড়ক ও সড়কের মোড়ে মোড়ে তালের রস
❒ গ্লাস রস ২০ টাকা
এম জামান
মহাসড়ক ও সড়কের মোড়ে মোড়ে এখন দেখা যাচ্ছে তালের রস ছবি: এম জামান
দেশজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ ও ভ্যাপসা গরমে জনজীবন যখন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে, তখন পথচারী ও সাধারণ মানুষের কাছে স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে প্রাকৃতিক পানীয় তালের রস। যশোরের বিভিন্ন মহাসড়ক ও সড়কের মোড়ে মোড়ে এখন দেখা যাচ্ছে তালের রসের অস্থায়ী দোকান। গরমে ক্লান্ত মানুষ এক গ্লাস ঠান্ডা ও মিষ্টি তালের রস পান করে যেমন তৃষ্ণা মেটাচ্ছেন, তেমনি ফিরে পাচ্ছেন শরীর ও মনের প্রশান্তি।
বিশেষ করে যশোর-মনিরামপুর ও যশোর-মাগুরা মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সকাল থেকে শুরু হচ্ছে তালের রস বিক্রির ধুম। রাস্তার পাশে কয়েকটি গ্লাস, মাটির ভাঁড় ও রস ভরা ঠিলি নিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা। প্রতিগ্লাস রস বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা দরে। অনেক স্থানে লিটার হিসেবেও রস বিক্রি করা হচ্ছে। এক লিটার তালের রসের দাম রাখা হচ্ছে প্রায় ১০০ টাকা।
প্রচণ্ড রোদ আর গরমে পথচারীরা এসব দোকানে ভিড় করছেন। কেউ এক গ্লাস পান করে তৃষ্ণা মেটাচ্ছেন, আবার কেউ পরিবারের সদস্য বা অফিস সহকর্মীদের জন্য বোতল ও পাত্রে করে রস নিয়ে যাচ্ছেন। প্রাকৃতিকভাবে সংগৃহীত এই রসের প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, দুপুরের দিকে সূর্যের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রসের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড়ও বাড়তে থাকে। মোটরসাইকেল আরোহী, শ্রমিক, কৃষক, চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ কিছু সময়ের জন্য দাঁড়িয়ে তালের রস পান করছেন। অনেকেই বলছেন, বাজারে বিভিন্ন ধরনের কোমল পানীয় থাকলেও তালের রসের স্বাদ ও উপকারিতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
যশোর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে ফেরার পথে তালের রস পান করেন পথচারী মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, “সকাল থেকে প্রচণ্ড গরমে খুব কষ্ট হচ্ছিল। হাসপাতালে কাজ শেষ করে ফেরার সময় রাস্তার পাশে তালের রস বিক্রি করতে দেখি। এক গ্লাস রস খাওয়ার পর শরীর অনেকটা ঠান্ডা লাগছে। গরমে এই রস সত্যিই অনেক উপকার করে।”
আরেক পথচারী মনির হোসেন বলেন, “আমি বেশ দূর থেকে এসেছি। গরমে তালের রস খেতে খুব ভালো লাগে। শুধু নিজের জন্য নয়, অফিসে সহকর্মীদের জন্যও এক লিটার রস কিনে নিয়ে যাচ্ছি। রসের স্বাদ খুব ভালো এবং এটি একেবারেই ভেজালমুক্ত বলে মনে হয়েছে।”
মহিউদ্দিন জানান, “প্রাকৃতিক পানীয় হিসেবে তালের রসের তুলনা হয় না। এটি শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। আমরা যে রস পান করছি, সেটি একেবারে টাটকা বলে মনে হচ্ছে । গরমের দিনে এমন পানীয় মানুষের জন্য খুবই উপকারী।”
স্থানীয়দের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় তালের রসের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। আগে যেখানে সীমিত পরিসরে বিক্রি হতো, এখন অনেকেই মৌসুমি পেশা হিসেবে তালের রস সংগ্রহ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।
বড়বাইলডাঙ্গা গ্রামের রস সংগ্রহকারী ও বিক্রেতা আবুল কালাম জানান, তিনি তিনটি তালগাছ থেকে প্রতিদিন রস সংগ্রহ করেন। প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ৯ ভাঁড় রস পাওয়া যায়। সেই রস বিক্রি করেই সংসারের খরচের একটি বড় অংশ মেটানো সম্ভব হয়।
তিনি বলেন, “ভোররাত থেকে কাজ শুরু করতে হয়। তালগাছে উঠে রস সংগ্রহ করা সহজ কাজ নয়। অনেক পরিশ্রম করতে হয়। তবে গরমের সময়ে রসের ভালো চাহিদা থাকায় বিক্রিও ভালো হয়। প্রায় তিন মাস এই ব্যবসা চলে। প্রতিগ্লাস ২০ টাকা দরে রস বিক্রি করি। প্রতিদিন যা আয় হয়, তা দিয়ে পরিবারের খরচ চালানো সম্ভব হয়।”
তিনি আরও জানান, তালগাছের রস সংগ্রহের কাজটি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও দীর্ঘদিন ধরে তিনি এই পেশার সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে বাজারে কৃত্রিম পানীয়ের আধিক্য থাকলেও মানুষ আবারও প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যকর পানীয়ের দিকে ঝুঁকছে, যা তাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আশার আলো হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্যসচেতন ব্যক্তিদের মতে, টাটকা তালের রসে রয়েছে প্রাকৃতিক শর্করা, খনিজ উপাদান ও শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু পুষ্টিগুণ। এটি শরীরের পানিশূন্যতা দূর করতে সহায়তা করে এবং গরমে ক্লান্তি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। তবে রস সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সব মিলিয়ে, তীব্র গরমে মানুষের তৃষ্ণা নিবারণ ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে তালের রস এখন মহাসড়কপাড়ের এক জনপ্রিয় প্রাকৃতিক পানীয়। একদিকে যেমন পথচারীরা পাচ্ছেন প্রশান্তি, অন্যদিকে মৌসুমি এই ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ তৈরি হয়েছে অনেক গ্রামীণ পরিবারের জন্য। গ্রীষ্মের দাবদাহে তাই এক গ্লাস তালের রস যেন হয়ে উঠেছে স্বস্তি, প্রশান্তি ও প্রাকৃতিক সতেজতার প্রতীক।