যশোর- মাগুরা সড়কে তোলের রসের অস্থায়ী দোকান। ছবি: ধ্রুব নিউজ
টানা দুই দিন মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত। কিন্তু বৃষ্টির পরেও কমেনি ভ্যাপসা গরমের তীব্রতা, বরং গুমোট আবহাওয়ায় জনজীবন আরও বেশি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এই অসহ্য গরমে একটু শীতলতার আশায় মানুষ যখন বিভিন্ন ধরনের পানীয় গ্রহণ করছেন, তখন তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে প্রাকৃতিক তালের রস। যশোরের বিভিন্ন মহাসড়ক ও মোড়ে মোড়ে এখন তালের রসের অস্থায়ী দোকানগুলোতে তৃষ্ণার্ত মানুষের ভিড় দেখা যাচ্ছে।
বিশেষ করে যশোর-মনিরামপুর ও যশোর-মাগুরা মহাসড়কের পাশে সকাল থেকেই শুরু হচ্ছে এই রস বিক্রির ধুম। প্রতি গ্লাস টাটকা রস বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা দরে। আর যারা বোতলে করে পরিবার বা বন্ধুদের জন্য নিয়ে যাচ্ছেন, তাদের জন্য প্রতি লিটারের দাম রাখা হচ্ছে ১০০ টাকা।
সরেজমিনে দেখা যায়, দুপুরের দিকে ভ্যাপসা গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহাসড়কের পাশের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ে। মোটরসাইকেল আরোহী, ভ্যানচালক, চাকরিজীবী থেকে শুরু করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়িয়ে তালের রস পান করেন। ক্রেতাদের মতে, বাজারে কৃত্রিম কোমল পানীয়ের চেয়ে প্রাকৃতিকভাবে সংগৃহীত এই রসের স্বাদ ও উপকারিতা অনেক বেশি।
যশোর সদর হাসপাতাল থেকে কাজ শেষে ফেরার পথে তালের রস পান করছিলেন পথচারী মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, "সকাল থেকে ভ্যাপসা গরমে খুব কষ্ট হচ্ছিল। এক গ্লাস রস খাওয়ার পর শরীরটা অনেক ঠাণ্ডা লাগছে।"
আরেক পথচারী মনির হোসেন নিজের পাশাপাশি অফিসের সহকর্মীদের জন্য এক লিটার রস কিনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি জানান, এই তীব্র গরমে তালের রস সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত এবং তাৎক্ষণিক ক্লান্তি দূর করতে দারুণ কার্যকর। একই মন্তব্য করেন স্থানীয় বাসিন্দা মমিন উদ্দিন। তার মতে, গ্রীষ্মের এই সময়ে শরীর ঠাণ্ডা রাখতে টাটকা তালের রসের কোনো বিকল্প নেই।
তীব্র গরমের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে তালের রসের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই এটিকে লাভজনক মৌসুমি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তবে এই রস সংগ্রহের কাজটি অত্যন্ত পরিশ্রমের ও ঝুঁকিপূর্ণ।
যশোরের বড়বাইলডাঙ্গা গ্রামের রস সংগ্রাহক ও বিক্রেতা আবুল কালাম জানান, তিনি প্রতিদিন ভোররাতে উঠে তিনটি তালগাছ থেকে রস সংগ্রহ করেন। প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ৯ ভাঁড় রস পান তিনি।
ব্যবসায়ী আবুল কালাম বলেন, "তালগাছে উঠে রস সংগ্রহ করা বেশ কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। তবে গরমের কারণে এখন ভালো চাহিদা আছে। প্রতিদিন যা বিক্রি হয়, তা দিয়ে এই তিন মাস সংসারের খরচের একটা বড় অংশ উঠে আসে। মানুষ এখন কৃত্রিম পানীয় ছেড়ে এই প্রাকৃতিক রসের দিকে ঝুঁকছে, এটা আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ভালো।"
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টাটকা তালের রসে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক শর্করা, প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান এবং পুষ্টিগুণ রয়েছে। এটি প্রচণ্ড গরমে শরীরের পানিশূন্যতা দ্রুত দূর করে এবং ক্লান্তি কমায়। তবে রস সংগ্রহ, ছাঁকন এবং সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যেন শতভাগ পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা হয়, সে বিষয়ে বিক্রেতাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
তীব্র ভ্যাপসা গরমে যখন সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, তখন মহাসড়কপাড়ের এই ২০ টাকার তালের রস কেবল তৃষ্ণাই মেটাচ্ছে না, বরং গ্রামীণ অনেক পরিবারের জীবিকার চাকা সচল রাখার পাশাপাশি পথচারীদের দিচ্ছে সতেজতার ছোঁয়া।