Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
বুধবার, ২০ মে ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

বিশ্ব মৌমাছি দিবস আজ

ধ্রুব ডেস্ক ধ্রুব ডেস্ক
প্রকাশ : বুধবার, ২০ মে,২০২৬, ০৬:৩২ এ এম
বিশ্ব মৌমাছি দিবস আজ

ছবি: বাসস

আজ ২০ মে, বিশ্ব মৌমাছি দিবস। পৃথিবীর খাদ্যশৃঙ্খল ও কৃষিব্যবস্থার এক-তৃতীয়াংশ পরাগায়ন সরাসরি নির্ভর করে মৌমাছির ওপর। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, ক্ষতিকর পরজীবী 'ভ্যারোয়া মাইট', ক্ষতিকর ভাইরাস এবং যত্রতত্র কীটনাশক ব্যবহারের কারণে বিশ্বব্যাপী আশঙ্কাজনক হারে কমছে মৌমাছির সংখ্যা। পরিবেশের এই চরম সংকটের দিনে সুন্দরবন সংলগ্ন খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় মৌ-বক্স ভিত্তিক আধুনিক মধু চাষে এক বিশাল অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

একসময় সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে বাঘ, কুমির আর জলদস্যুর ঝুঁকি নিয়ে মৌয়ালরা প্রাকৃতিকভাবে মধু সংগ্রহ করতেন। এখন সেই প্রথাগত ও ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি বদলে যাচ্ছে। বনের ওপর চাপ কমিয়ে স্থানীয় নদী তীরবর্তী বিভিন্ন জমি ও বেড়িবাঁধে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মৌবাক্স বসিয়ে নিরাপদ ও টেকসই উপায়ে মধু উৎপাদনে ঝুঁকছেন উপকূলের স্থানীয় যুব ও কৃষক উদ্যোক্তারা।

কয়রা উপজেলার নদী তীরবর্তী বেশ কয়েকটি গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক নতুন কর্মযজ্ঞ। বনে না গিয়েও আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে ঘরে বসেই সংগৃহীত হচ্ছে সুন্দরবনের খাঁটি মধু।

উপকূলীয় শাকবাড়িয়া ও কপোতাক্ষ নদের তীরে সারি সারি কাঠের মৌবাক্স বসিয়ে কাজ করছেন চাষিরা। সাতক্ষীরা থেকে আসা একদল মৌচাষি বর্তমানে কয়রার বানিয়াখালী গ্রামের নদীপাড়ে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করছেন। তাদের মোট ৪০০টি মৌবাক্সের মধ্যে ১২০টি বাক্স পরীক্ষামূলকভাবে এই জোনে রাখা হয়েছে। মে মাসের তীব্র রোদ থেকে মৌমাছিদের বাঁচাতে বাক্সগুলোর ওপর খড় ও চটের ভেজা বস্তা দিয়ে ছায়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

মৌচাষিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই আধুনিক চাষে ব্যবহৃত হয় মূলত ‘এপিস মেলিফেরা’ (Apis mellifera) জাতের শান্ত স্বভাবের মৌমাছি। এরা নদী পেরিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে অন্তত তিন কিলোমিটার পর্যন্ত উড়ে গিয়ে খলসি, গরান ও কেওড়া ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে আবার বাক্সে ফিরে আসে। দিনকয়েক আগেই চাষিরা এই জোন থেকে প্রায় তিন মণ মধু সংগ্রহ করেছেন। বর্তমানে সুন্দরবনে কেওড়া ফুল ফোটার প্রধান মৌসুম শুরু হওয়ায় মধুর উৎপাদন ও গুণগত মান আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।

শাকবাড়িয়া নদীর তীরের মঠবাড়ি গ্রামে দেখা যায়, একটি বাড়ির আঙিনায় মৌচাকের ফ্রেম ঘিরে স্থানীয় নারী ও পুরুষেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। বিশেষ এক ধরণের সেন্ট্রিফিউগাল এক্সট্রাক্টর মেশিনের সাহায্যে মৌচাকের ফ্রেমগুলো ঘুরিয়ে সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্সের মাধ্যমে মধু আলাদা করা হচ্ছে। এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, মধু নিষ্কাশনের পর অক্ষত ফ্রেমটি আবারও বাক্সে ফিরিয়ে দেওয়া যায়। ফলে মৌমাছিদের নতুন করে চাক তৈরি করতে হয় না, তারা সরাসরি নতুন মধু জমা করার কাজে লেগে যেতে পারে। এতে উৎপাদন সময় ও খরচ অনেকটাই কমে আসে।

মৌচাষি রিফাত হোসেন বলেন, ‘এগুলোই আমাদের মৌমাছির কৃত্রিম ঘর। সুন্দরবনের বিভিন্ন ফুল থেকে ওরা মধু এনে এখানে জমা করছে। এখন আর আমাদের বনের ভেতরে গিয়ে জীবন বাজি রাখতে হয় না। বনের পাশে বসেই আমরা নিরাপদ উপায়ে মধু পাচ্ছি।’

ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতির হিসাব দিয়ে রিফাত জানান, ৪০০টি মৌবাক্স বছরজুড়ে পরিচালনা, মৌমাছি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবহনে তাদের বছরে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়। তবে গত বছর সব খরচ বাদ দিয়ে তাদের নেট আয় হয়েছিল প্রায় ১৪ লাখ টাকা। তবে এটি একটি বার্ষিক চক্র। যখন সুন্দরবনে ফুলের মৌসুম থাকে না (বর্ষা ও কার্তিক মাসে), তখন মৌমাছিদের কৃত্রিম উপায়ে চিনি ও পানির দ্রবণ খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। এছাড়া প্রতিটি বাক্সে একটি করে সুস্থ ‘রানী মৌমাছি’ থাকা বাধ্যতামূলক। রানী মৌমাছি মারা গেলে বা কোনো কারণে চলে গেলে পুরো বাক্সের শ্রমিক মৌমাছিরা ছত্রভঙ্গ হয়ে অন্যত্র চলে যায়।

কয়রায় অবস্থিত বন বিভাগের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দীন বলেন, ‘এটি পরিবেশ ও বন রক্ষায় একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও যুগান্তকারী উদ্যোগ। এর ফলে সুন্দরবনের ভেতরের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর মানুষের অতিরিক্ত চাপ কমছে এবং মৌয়ালদের জীবনহানির ঝুঁকিও শূন্যের কোঠায় নেমে আসছে।’

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, ‘আধুনিক মৌচাষ স্থানীয় জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য একটি চমৎকার বিকল্প কর্মসংস্থান ও নতুন আয়ের উৎস তৈরি করছে। বনে না গিয়েও সুন্দরবনের মধু আহরণের এই টেকসই মডেলটিকে টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিয়ে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।’

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সুন্দরবনের অনন্য ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ ও বনাঞ্চলের কারণে এই অঞ্চলের মধুর স্বাদ, ঔষধি গুণ ও সুবাস বিশ্বসেরা। কৃত্রিম উপায়ে সংগৃহীত হলেও সুন্দরবনের ফুলের নির্যাস থাকার কারণে এই মধুর বাণিজ্যিক মূল্য অনেক বেশি। আর এই কারণেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পেশাদার মৌচাষিরা সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রা উপকূলকেই মধু উৎপাদনের সবচেয়ে সুবিধাজনক এবং লাভজনক জোন হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। মৌমাছি দিবসের বৈশ্বিক উদ্বেগের মাঝে কয়রার এই মধু বিপ্লব দেশের কৃষি ও অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করছে।

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)