ধ্রুব ডেস্ক
পবিত্র ঈদুল আজহায় পশু কোরবানির পাশাপাশি অনেক মুসলমানকে সন্তানের আকিকাও একসঙ্গে আদায় করতে দেখা যায়। বিশেষ করে যারা আর্থিক অভাব বা নানা প্রতিকূলতার কারণে সন্তান জন্মের পর নির্দিষ্ট সময়ে আকিকা সম্পন্ন করতে পারেননি, তারা কোরবানির ঈদের সুযোগটি কাজে লাগিয়ে একই পশুর মাধ্যমে দুটি ইবাদত সম্পন্ন করতে চান। আকিকা হলো সন্তান জন্মের পর মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও নবজাতকের কল্যাণে তাঁর নামে পশু উৎসর্গ করা। ইসলামের বিধান অনুযায়ী, সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা করা সবচেয়ে উত্তম; তবে সেদিন সম্ভব না হলে চতুর্দশ (১৪তম) বা একুশতম দিনেও করা যায়। এর পরেও যদি কেউ আকিকা দিতে না পারেন, তবে পরবর্তী সময়ে এমনকি সন্তানের বয়স ১০ বা ২০ বছর পার হওয়ার পরও তা আদায় করা সম্ভব। আকিকার ক্ষেত্রে ছেলে সন্তানের জন্য দুটি এবং মেয়ে সন্তানের জন্য একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা জবাই করার নিয়ম রয়েছে। যদিও ছাগল বা খাসি দিয়ে আকিকা করাই সর্বোত্তম এবং সুন্নাহসম্মত, তবে উট বা গরুর মাধ্যমেও এটি করা যায়। আকিকার মাংস নিজে, পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের খাওয়ার ব্যাপারে ধর্মে কোনো বিধিনিষেধ নেই।
কোরবানির পশুর সাথে সন্তানের আকিকা দেওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে ইসলামের বিভিন্ন মাজহাব বা চিন্তাধারার মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, মাজহাব হলো কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিধানগুলোর প্রায়োগিক ব্যাখ্যা ও চিন্তাধারার নির্দিষ্ট পদ্ধতি। কোনো কোনো মাজহাবের মতে কোরবানির সাথে আকিকা করা জায়েজ নেই, আবার কোনো কোনো মাজহাব অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ বৈধ। ইসলাম বিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ এ প্রসঙ্গে জানান, ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী আকিকা হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত, যা আর্থিক সচ্ছলতার সাথে সম্পর্কিত; অন্যদিকে কোরবানি হলো একটি ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক ইবাদত। জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যদি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিস্কের মুসলমান নিসাব পরিমাণ সম্পদের (সাড়ে সাত ভরি সোনা, সাড়ে ৫২ ভরি রুপা বা সমমূল্যের নগদ অর্থ বা ব্যবসার পণ্য) মালিক হন, তবে তার ওপর কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মুহা আব্দুর রশীদ জানান, যে পরিমাণ সম্পদ থাকলে কোনো ব্যক্তির ওপর জাকাত ফরজ হয়, সেই একই ধরনের উদ্বৃত্ত সম্পদ থাকলে তিনি অবশ্যই কোরবানি দেবেন এবং ওয়াজিব ইবাদত হিসেবে এটি আদায় করা বাধ্যতামূলক।
কোরবানি ও আকিকা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি প্রেক্ষাপটের ইবাদত হলেও একই পশুতে এ দুটিকে যুক্ত করার ব্যাপারে ইসলামি গবেষকেরা স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ জানান, হানাফি মাজহাবের মতানুসারে কোরবানির পশুর সাথে সন্তানের আকিকা দেওয়া সম্পূর্ণ জায়েজ এবং অনুমোদিত। তবে আহলে হাদিসের অনুসারীরা এই নিয়মের বিরোধিতা করেন। হানাফি বিধান অনুযায়ী, যেসব বড় পশুতে (যেমন গরু, মহিষ ও উট) সর্বোচ্চ সাতটি ভাগ বা অংশ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেখানে নিজের কোরবানির ভাগের পাশাপাশি এক বা একাধিক ভাগ সন্তানের আকিকার নিয়তে বরাদ্দ করা যায়। তবে ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা যেহেতু একজনের পক্ষ থেকেই উৎসর্গ করতে হয়, তাই এ ধরনের ছোট পশু দিয়ে কোরবানি ও আকিকা একসঙ্গে দেওয়া সম্ভব নয়।
কোরবানির সময় পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি বলে মনে করেন ইসলামি বিশ্লেষকেরা। মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ উল্লেখ করেন, ঈদের দিন কোনো ব্যক্তি যদি নিজে কোরবানি না দিয়ে বা দেওয়ার সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও কেবল সন্তানের আকিকার পশু জবাই করেন, তবে তা শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তম সিদ্ধান্ত নয়। কারণ ওয়াজিব ইবাদতের গুরুত্ব সুন্নতের চেয়ে অনেক বেশি। সামর্থ্য অনুযায়ী সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হলো—বড় পশুর (যেমন গরু) একটি অংশ কোরবানির জন্য রাখা এবং আকিকার জন্য আলাদাভাবে ছাগল বা খাসি জবাই করা। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলে একই গরুর এক ভাগ কোরবানি এবং অন্য ভাগ আকিকার নিয়তে দিলেও কোনো সমস্যা নেই এবং এর মাধ্যমে ওয়াজিব ও সুন্নত—উভয় ইবাদতই সহিহভাবে আদায় হয়ে যাবে।